ঠুমরী [ Thumri ] বা ঠুংরি বা ঠুমরি গান – সঙ্গীত শৈলী Music Genre ]

ঠুমরী বা ঠুংরি বা ঠুমরি গান - সঙ্গীত শৈলী [ Thumri, Music Genre ]

ঠুমরী, ঠুংরি বা ঠুমরি [ Thumri, Music Genre ] : ভাবপ্রধান ও শৃঙ্গার রসাত্মক কিন্তু চপলতাবর্জিত ক্ষুদ্র আকারের একধরনের গায়নশৈলী  বা গানকে বলা হয় ঠুংরি বা ঠুমরি। সেমি-ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের জনরা হিসেবে এই ধারা অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাই আমাদের সঙ্গীতের প্রকারভেদ বা জনরা পরিচয় করানোর সিরিজের অংশ হিসেবে এই আর্টিকেলটি দেয়া হলো।

আলোচনা শুরুর আগে চলুন এই ঠুমরী টি শুনে নেয়া যাক:

 

এই ধারার গানের মূল উদ্দেশ্য, বিধিবদ্ধ নিয়মের শাস্ত্রীয় সংগীতের মধ্য থেকে মাঝে মধ্যে একটু ছুট নেয়া। কঠোর নিয়মের মাঝে কিছুটা শৈথিল্যকে প্রশ্রয় দিয়ে মনোরঞ্জন করা। আগের যুগে ওস্তাদ-পণ্ডিতেরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর শেষে ২/১ টি ঠুমরী গেয়ে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করতেন। এখনও রয়েছে সেই রেয়াজ।

এই ধারার গানে ব্যবহৃত সাহিত্যে, ব্রজ বা অবধী ভাষা ব্যবহৃত হয়। বাংলাতেও কিছু ঠুমরি রচিত হয়েছে। ঠুমরীর সাহিত্য বা কথা খুব ছোট। সচরাচর শৃঙ্গার রসাত্মক ভাষা দিয়ে রচিত হয়। সেই ছোট্ট কথাটি বারবার বিভিন্ন আন্দাজে বা দৃষ্টিভঙ্গিতে গেয়ে প্রতিষ্ঠা করাই মূলত ঠুমরী গায়কী।

ঠুমরী গান কে দুই ভাবে ভাগ করা হয় – পূর্বী অঙ্গের ঠুমরী এবং পাঞ্জা অঙ্গের ঠুমরী। পূর্বী অঙ্গের ঠুমরীতে সাহিত্য তথা বানি এবং সুর সমান গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ বানি এবং সুর একে অন্যের অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে পাঞ্জাবী অঙ্গের ঠুমরীর মুল গুরুত্ব সুরে। লক্ষ্ণৌ ও বারানসির (বেনারস) ঠুংরি গানকে বলা হয় পূর্বি এবং পাঞ্জাব অঞ্চলের ঠুংরি গানকে বলা হয় পাঞ্জাবি। লক্ষ্ণৌ ও বারানসির ঠুংরি গান অর্থাৎ পূর্বি অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ও লোকপ্রিয়। পাঞ্জাবি ঠুংরিতে টপ্পা গানের প্রভাব অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়।

এই শৈলীর গানের উদ্ভাবক সম্পর্কে নানা মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো সংগীতগুণীজন লক্ষ্ণৌর সংগীতরত্ন ওস্তাদ সাদিক আলী খাঁ সাহেবকে ঠুংরি গানের আবিষ্কারক বলে থাকেন। আবার কেউ কেউ বলেন, লক্ষ্ণৌর নবাব আসাফউদ্দৌলার (১৭৪২-৯২) সভাসংগীতজ্ঞ গোলাম নবী ওরফে শৌরি মিয়ার সংগীত ঘরানার শিল্পীরাই ঠুমরিশৈলীর গান উদ্ভাবন করেছেন।

ঠুমরী গায়ক পদ্ম-ভিভুশন পন্ডিত ছান্নুলাল মিশ্রা, ভারতের বানারসের বিখ্যাত [ কিরানা ঘরানা ], Pandit Chhannulal Mishra, Thumri Singer, Source-Wikipedia, Creative Commons Reuse License
পদ্ম-ভিভুশন পন্ডিত ছান্নুলাল মিশ্রা, ভারতের বানারসের বিখ্যাত ঠুমরি গায়ক [ কিরানা ঘরানা ]
ভিন্নমতানুসারী সংগীতগুণীজনেরা মনে করেন, লক্ষ্ণৌর নবাবদের দরবারেই ঠুমরি গান জন্মলাভ করে। তবে একথা ধ্রুব সত্য যে, ঠুমরি গানের পরিচর্যা, প্রচার ও প্রসারে লক্ষ্ণৌর নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ কিংবদন্তি। আর নবাব বাহাদুরের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতা সংগীত ইতিহাসে হয়ে। আছে চিরউজ্জ্বল। তিনি স্বয়ং ‘অখতর পিয়া’ ছদ্মনামে বহু ঠুংরি গান রচনা করেছেন।

এছাড়া কদম পিয়া, কদর পিয়া, গুলাব পিয়া, লালন পিয়া ইত্যাদি ছদ্মনামে তৎকালীন ও পরবর্তী সময়ের বেশ কজন সংগীতপ্রতিভার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।

ঠুংরি গানে রাগের বিশুদ্ধতার চেয়ে ভাবের মহত্ব বেশি দেওয়া হয়। বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞবৃন্দ ধারণা করেন, খেয়াল গানের বিস্তারকালে নানা প্রকার সুললিত স্বরসংযোগ ও অলংকারের ব্যবহার হতে ঠুংরি গান সৃষ্টি হয়েছে। তথাপি খেয়ালের মতো ঠুংরি গান রাগের যথাযথ নিয়ম মেনে চলে না। সেজন্য বিশেষ কয়েকটি রাগ ছাড়া সকল রাগেই ঠুংরি গান রচিত হয় না।

কেননা ঠুংরি গানকে বিশেষ রাগের কঠিন নিয়মকানুনের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে এর ভাবসমৃদ্ধির জন্য মোটামুটিভাবে রাগরূপ বজায় রেখে বেশ কিছুটা স্বাধীনতা প্রদান করা হয়ে থাকে। এই শৈলীর গানে রাগের বিশুদ্ধতা সঠিকভাবে বজায় থাকে না বলে শাস্ত্রমতে একে আখ্যায়িত করা হয় ‘ধুন’ নামে।

ঠুংরিশৈলীর গান পরিবেশন করা খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। হালকা রাগে আবদ্ধ হলেও এর গভীরতা হৃদয়কে বিশেষভাবে আন্দোলিত করে তোলে। তাই কুশলী ও দক্ষ শিল্পী ব্যতীত ঠুংরি গানের বৈশিষ্ট্য ও কারুকাজের সূক্ষ্মতা ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব ব্যাপার। উত্তর-পূর্ব ভারতজুড়ে এই শৈলীর গান বর্তমানে বেশ প্রচলিত ও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ঠুমরী বা ঠুংরি গানের বৈশিষ্ট্য [ Features of Thumri song ] :

  • রাগের বিশুদ্ধতা অপেক্ষা ভাবের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় বেশি। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঠুংরি গানে রাগ মিশ্রণ ঘটে থাকে।
  • ঠুংরি গানের দুটি বিভাগ, যথাক্রমে স্থায়ী ও অন্তরা।
  • তে বাণী অল্প এবং গৌণ ভাবই প্রধান।
  • এই শৈলীর গানে খটকা ও মুর্কীর্জাতীয় প্রচুর ছোট ছোট কাজ থাকে, যেগুলো বিশেষ তৈরি কণ্ঠ না হলে প্রয়োগ করা অসম্ভব ব্যাপার।
  • রাগ মিশ্রণ ঘটলেও ঠুংরি গানে চপলতা নেই।
  • ঠুংরিশৈলীর গান শৃঙ্গারপ্রধান।
  • বিশেষ কয়েকটি রাগ, যেমন – কাফি, খাম্বাজ, ঝিঝিট, তিলোককামোদ, তিলং, দেশ, পিলু, বারোয়া, ভৈরবী ইত্যাদিতে ঠুংরি গান আবদ্ধ করা হয়ে থাকে।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঠুংরি গানের বাণী রচিত হয় প্রেম কিংবা বিরহ বিষয় নিয়ে।
  • বিশেষ কয়েকটি তালে ঠুংরি বেশি গাওয়া হয়ে থাকে। যেমন – কাহারবা, ঠুংরি ঠেকা, ত্রিতাল, দাদরা, দীপচন্দী, পাঞ্জাবি ঠেকা, যৎ ইত্যাদি।
  • ঠুংরি গান প্রথমে বিলম্বিত লয়ে শুরু করে শেষের দিকে দ্রুত কাহারবা অথবা ত্রিতালে গাওয়া হয়ে থাকে।
  • পাঞ্জাবি ঠুংরি ছাড়া পূর্বি অঙ্গের ঠুংরিতে তালের প্রয়োগ করা হয় না।

এগুলো ছাড়াও খটকা, মুড়কি, গিটকিরি ও পুকারের প্রয়োগের অনেক কারিগরি বিষয় আছে। আমরা সেগুলো নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

এয়সো নিডর মোরে
মন নাহি বাতিয়া
রাড় কড়ত মোসে
বিতি সারা রাতিয়া ॥

ন্যায় রাঙ পিয়া তুঝে
লাজ না আওয়ে
হাট ছোড়ে বাইয়া মোরে
লাগ নাহি ছাতিয়া ॥

[ঠাট : ভৈরবী, রাগ ভৈরবী, বাদীস্বর : মধ্যম (ম), সমবাদীস্বর : ষড়জ (স), অঙ্গ উত্তরাঙ্গ প্রধান, জাতি : সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ, গায়ন সময় প্রাতঃকাল/সব সময় আরোহী স ঋ জ্ঞ ম প দ ণ র্স, অবরোহী : র্স ণ দ প মজ্ঞ ঋ স, তাল: ত্রিতাল (১৬ মাত্রা)।]

ঠুমরীতে রাগের শুদ্ধতার বিষয়ে অতটা বাধ্য বাধ্যকতা নেই বটে, তবে ঠুমরী মোটেই সহজ গান নয়। ঠুমরী এখন অনেকটা পুরনো একটি পরিশীলিত গায়নরীতি। শস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা ছাড়াও ঠুমরী গায়কীর আলাদা করে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভাব ও রসের অনেক গভীর অনুভব দরকার। দরকার হয় নান রকম দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপ্তির। ভালো ঠুমরী গাওয়া মানে সুর দিয়ে অভিনয় করে একটি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা।

ঠুমরী বা ঠুংরি বা ঠুমরি গান - সঙ্গীত শৈলী [ Thumri, Music Genre ]
ঠুমরী বা ঠুংরি বা ঠুমরি গান – সঙ্গীত শৈলী [ Thumri, Music Genre ]

ঠুমরি সম্পর্কে আরও পড়ুন:

About the Author: নটরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।