বিভাগের আর্কাইভঃ সঙ্গীতের ঘরানা

সঙ্গীতের ঘরানা নিয়ে এই সেকশনের যত আয়োজন।

পাতিয়ালা ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

পাতিয়ালা ঘরানা [ Patiala Gharana ]: বিদগ্ধ ও প্রসিদ্ধ সংগীতজ্ঞ আলী বখস এবং ফতেহ আলী খা এই দুই ভাইকে বলা হয় ‘পাতিয়ালা ঘরানা’র জনক। বড় মিয়া কালু খাঁ এবং কালে খাঁ এই ঘরানার আদি পুরুষ। বড় মিয়া কালু খাঁ সাহেবের দুই পুত্র আলী বখস ও ফতেহ আলী খাঁ প্রথমে জয়পুর ঘরানার উত্তরসূরি গোরখি বাঈ এবং পরে দিল্লি ঘরানার প্রবর্তক সংগীতজ্ঞ তানরস খাঁ সাহেবের কাছে সংগীতশিক্ষা লাভ করেন। ফলে তাঁদের গায়নরীতিতে জয়পুর ও দিল্লি উভয় ঘরানার প্রভাব বিস্তৃত হয় এবং নতুন এক গায়নশৈলীর উদ্ভব ঘটে।

Ustad Bade Fateh Ali Khan of Patiala

ওস্তাদ আলী বখস সাহেবের পুত্র বড়ে গুলাম আলী খাঁ আধুনিককালে পাতিয়ালা ঘরানার নাম সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল করেছেন। এই ঘরানার সর্বোচ্চ খ্যাতিমান এই গায়ক সংগীতশিক্ষা লাভ করেন ওস্তাদ কালে খাঁ সাহেবের কাছে। পাতিয়ালা ঘরানার বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দের মধ্যে বড় মিয়া কালু খাঁ, ওস্তাদ আলী বখসের পুত্র বড়ে গুলাম আলী খাঁ, তাঁর পুত্র ওস্তাদ মুনাব্বার খাঁ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ঘরানার ঠুংরিতে টপ্পার ভাব বেশি পরিলক্ষিত হয় এবং এ ধরনের সংগীতকে বর্তমানে বলা হয় পাঞ্জাবি ঠুংরি।

পাতিয়ালা ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Patiala Gharana ] :

  • খেয়ালের চলন লঘু প্রকৃতির
  • তানগুলোর প্রয়োগনৈপুণ্য অসাধারণ
  • ঠুংরি গায়নে বিশেষ প্রবণতা ও দক্ষতা
  • দ্রুতলয়ে সপাট তান
  • অতি ‘তার’ সপ্তকে সহজেই কণ্ঠ চালনা

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

দিল্লি ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

দিল্লি ঘরানা [ Delhi Gharana ]: মুঘল সাম্রাজ্যের শেষভাগে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ কাদির বখসকে ‘তানরস’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। সংগীত ইতিহাসের ভিত্তিতে এই প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ তানরস খাঁ ‘দিল্লি-ঘরানা’র প্রবর্তন করেন বলে জানা যায়। কথিত রয়েছে, ওস্তাদ হসু ও হদ্দু এবং হাপুড় ঘরানার ইউসুফ খাঁ ও দিল্লির ওস্তাদ চাঁদ খাঁ এই ঘরানার ধারক ও বাহক।

কোনো কোনো সংগীতগুণীজনের মতে, সংগীতজ্ঞ সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ এই ঘরানার সৃষ্টি করেছেন। আবার ভিন্নমতে শোনা যায়, দিল্লি নগরীর অধিবাসী সাবন্ত ও বুলা নামে দুই ভাই এই ঘরানার প্রবর্তক। তাঁরা কওয়াল বংশোদ্ভূত বলে পরিচিত ছিলেন এবং এই বংশে অপচল নামের দিল্লি ঘরানার একজন প্রসিদ্ধ গায়ক ছিলেন।

Delhi Gharana maestro Ustad Iqbal Ahmed Khan

ওস্তাদ তানরস খাঁ সাহেবের সুযোগ্য পুত্র ওস্তাদ উমরাও খাঁ দিল্লি-ঘরানার প্রচার ও প্রসারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রচেষ্টায় এই ঘরানা সংগীতপিপাসুদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে চমৎকারিত্বের সঙ্গে। দিল্লি ঘরানার ধারক ও বাহকদের মধ্যে ওস্তাদ মোজাফ্ফর খাঁ, ওস্তাদ আলী বখস, মম্মন খাঁ, বুন্দু খাঁ (সারেঙ্গিশিল্পী), ওস্তাদ ফতেহ আলী খাঁ এবং বাংলার প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ গিরিজাশংকর চক্রবর্তী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

দিল্লি ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Delhi Gharana ] :

  • তান প্রয়োগে অসাধারণ কুশলতা
  • গমকের প্রাধান্য
  • বোলতানের বৈচিত্র্য
  • খেয়ালের কলাপূর্ণ বন্দিশ
  • কঠিন লয়কারী।

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

ডাগর ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

ডাগর ঘরানা [ Dagar Gharana ]: ‘ডাগর ঘরানা’ হচ্ছে একটি প্রাচীন ধ্রুপদিয়া ঘরানা। কথিত রয়েছে ডাগর গ্রাম নিবাসী ধ্রুপদ গায়ক বৃজচন্দ্র ও হরিদাস হচ্ছেন এই ঘরানার প্রবর্তক। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ বহরম খাঁ এবং তাঁর পিতার গায়নশৈলীতেই এই ধারা পরিলক্ষিত হয়। সংগীত-গবেষক ও গুণীজনদের অনেকেই বলেন, বর্তমানে ডাগর-ঘরানা বলতে যা বোঝায় প্রকৃতপক্ষে তার শুভসূচনা হয় ওস্তাদ বহরম খাঁ সাহেবের সংগীতনৈপুণ্য থেকেই। এই ঘরানার সংগীতশৈলী প্রথমে জয়পুর এবং পরে উদয়পুরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

ডাগর ঘরানার ধ্রুপদ গায়ক ওস্তাদ হুসেইন সাইদুদ্দিন ডাগর

প্রাচীন ‘শুদ্ধাগীতি’র গায়কি এবং ধারার সঙ্গে ডাগর-ঘরানার বিশেষ মিল পরিলক্ষিত হয়। এই ঘরানার শ্রেষ্ঠ ধারক ও বাহক ছিলেন তৎকালীন সংগীতসমাজের অন্যতম কলাকার ওস্তাদ নাসিরউদ্দিন। ডাগর-ঘরানার ধ্রুপদ অত্যন্ত শাস্ত্রবদ্ধ, ভক্তিপূর্ণ ও গভীর রসাপুত। এতে বায়ান্ন প্রকার অলংকারের ব্যবহার রয়েছে বলে জানা যায়। এই ঘরানায় বীণাবাদন ও ধ্রুপদ গানের যুগলবন্দি পরিবেশন অত্যন্ত প্রচলিত একটি রীতি।

ওস্তাদ নাসিরউদ্দিনের মাধ্যমেই বাংলা গানের আসরে ডাগর-ঘরানার সূত্রপাত ও প্রচলন শুরু হয়। তাঁর স্বনামধন্য দুই পুত্র নাসির মঈনউদ্দিন ডাগর ও নাসির আমিনউদ্দিন ডাগর এই ঘরানার বিশেষ খ্যাতিমান শিল্পী। নিজস্ব সংগীতপ্রতিভা আর ডাগর-ঘরানার গায়নশৈলীর গুণে বিশ্বের সংগীতপ্রেমী দর্শক-শ্রোতার কাছে তাঁরা ‘ডাগর ব্রাদার্স’ নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের অসাধারণ সংগীতনৈপুণ্যের কারণে এই ঘরানার প্রতি সংগীতরসিক ও গুণীজনদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।

পিতার মাধ্যমে ডাগর ঘরানার যেমন প্রচার ও প্রসার ঘটে, ঠিক তেমনি পুত্র নাসির আমিনউদ্দিন ডাগরের মাধ্যমে তা আরো বেশি সম্প্রসারিত হয়।

ডাগর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Dagar Gharana ]:

  • আড়ম্বরবিহীন তবে মধুর রূপে গান পরিবেশন
  • অলংকার, মিড় ও গমকের ব্যবহার না করা এবং
  • গানের চলনে সরলতা

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

জয়পুর ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

জয়পুর ঘরানা [ Jaipur Gharana ]: সংগীতাকাশের অন্যতম জ্যোতিষ্ক সংগীতজ্ঞ শাহ সদারঙ্গের দ্বিতীয় পুত্র মহারঙ্গ নামে খ্যাত সংগীতজ্ঞ ভুপত খাঁ ওরফে মহম্মদ আলীকে ‘জয়পুর ঘরানা’র প্রবর্তক বলা হয়। সংগীত-গবেষক ও ঐতিহাসিক গুণীজনদের মতানুসারে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে খ্যাতিমান এই সংগীতজ্ঞের জন্ম হয়। পিতা এবং বড় ভাইয়ের পথ অনুসরণ করে তিনিও রাজাধিরাজ মহম্মদ শাহের রাজদরবার অলংকৃত করেছিলেন। সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেনের দৌহিত্র বংশের একাদশতম সংগীত নক্ষত্ররাজির অন্যতম মহারঙ্গ ছিলেন ধামার ও খেয়াল গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী।

Jal Mahal in Man Sagar Lake, Jaipur

বংশের ধারানুযায়ী বীণাশিল্পী হিসেবে তিনি এতটাই প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন যে, সংগীত ইতিহাসে ‘শাহ বীণকার’ নামেও হয়ে ওঠেন খ্যাতিমান। তাঁর প্রবর্তিত জয়পুর-ঘরানার গায়নশৈলী সংগীতপিপাসু মহলে ছিল উচ্চ প্রশংসিত। এই ঘরানার শিল্পীদের মধ্যে আশিক আলী খাঁ, গোরখি বাঈ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জয়পুর-ঘরানার তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। হয়তো সে কারণেই জয়পুর-ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে অনেক সংগীতগুণীজন বলেন, পাতিয়ালা ও আল্লাদিয়া খাঁ ঘরানা জয়পুর ঘরানারই উত্তর বাহক।

জয়পুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Jaipur Gharana] :

  • গীতের সংক্ষিপ্ত বন্দিশ
  • বক্রতান ও ছুটতানের প্রয়োগ
  • খোলা আওয়াজের প্রয়োগ।

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

গোয়ালিয়র ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

গোয়ালিয়র ঘরানা [ Gwalior Gharana ]: বিদগ্ধ গুণীজন ওস্তাদ নখন পীর বখস সংগীতভুবনে একটি সুপরিচিত নাম। লক্ষ্ণৌ থেকে গোয়ালিয়রে এসে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সংগীতজ্ঞ নখন পীর বখস সাহেবের সংগীতশৈলী ‘গোয়ালিয়র ঘরানা’ নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঘরানা প্রবর্তনের উৎপত্তিস্থলের নামানুসারেই তিনি নিজ উদ্ভাবিত সংগীতশৈলীর এমন নামকরণ করেন। গোয়ালিয়র ঘরানার ধারক ও বাহক সংগীতজ্ঞদের মধ্যে তাঁর দুই পুত্র কদর বখস এবং পীর বখস হলেন অন্যতম। কদর বখসের তিন পুত্র যথাক্রমে হসু খাঁ, হদ্দু খাঁ ও নথু খাঁ ছিলেন এই ঘরানার সুবিখ্যাত সংগীতশিল্পী।

Pandit Vishnu Digambar Paluskar

সংগীতজ্ঞ হসু খাঁ সাহেবের শিষ্যপরম্পরায় গুলে ইমাম, মেহেদি হুসেন, বালকৃষ্ণ বুয়া, বাবা দীক্ষিত, বাসুদেব যোশি প্রমুখ খ্যাতিমান শিল্পী গোয়ালিয়র-ঘরানার ঐতিহ্যকে সমুজ্জ্বল করে তোলেন। সংগীতগুরু বালকৃষ্ণ বুয়ার অন্যতম শিষ্য পণ্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পালুসকার সংগীতাকাশের উজ্জ্বল তারকা হিসেবে প্রতীয়মান। পণ্ডিতজির খ্যাতনামা শিষ্যদের মধ্যে বি এ কুশলকার, পণ্ডিত ওংকারনাথ ঠাকুর, পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন প্রমুখ সংগীতগুণীজন গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতশৈলীর প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

সংগীতজ্ঞ হদ্দু খাঁ সাহেবের পুত্র রহমত খাঁ ও মুহম্মদ খাঁ ছিলেন এই ঘরানার বিখ্যাত গায়ক। হদ্দু খাঁর জামাতা ওস্তাদ ইনায়েত খাঁ এবং তাঁর জামাতা ও শিষ্য রামপুরের মুস্তাক হোসেন কলাবন্ত হিসেবে যারপরনাই খ্যাতি লাভ করেন। ওস্তাদ মুস্তাক হোসেন বহু শিষ্য তৈরি করেন এবং গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতধারায় শিষ্যদের তালিম প্রদান করেন। হদ্দু খাঁ সাহেবের অপর শিষ্য ইমদাদ হোসেন এবং তাঁর পুত্র ও শিষ্য ওয়াজিদ হোসেন গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতশৈলী রপ্ত করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। এই ধারায় সংগীত পরিবেশন করে তিনি ভূয়সী প্রশংসা ও ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এলাহাবাদ নিবাসী হন এবং গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতশৈলী শিষ্যদের মাঝে বিলাতে থাকেন।

সংগীতজ্ঞ নথু খাঁ সাহেবের প্রধান শিষ্য ছিলেন তাঁর দত্তক পুত্র নিসার হুসেন খাঁ। তাঁর প্রধান শিষ্য শংকর পণ্ডিত এবং শংকর পণ্ডিতের প্রধান শিষ্য ছিলেন কৃষ্ণরাও পণ্ডিত। এই সংগীতগুণীজনেরা বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ নখন পীর বখস প্রবর্তিত গোয়ালিয়র ঘরানার সংগীতশৈলীকে শীর্ষচূড়ায় প্রতিষ্ঠিত করে হয়ে আছেন খ্যাতিমান ও চির অম্লান।

গোয়ালিয়র ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Gwalior gharana ] :

  • আ-কারন্ত আলাপ
  • উদাত্ত কণ্ঠস্বর অর্থাৎ খোলা আওয়াজের প্রয়োগ
  • লয়কারী ও সপাট তানের দক্ষতা
  • স্বরবিস্তারে কুশলতা
  • বৈচিত্র্যমান বোলতান

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

গয়া ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

গয়া ঘরানা [ Goya Gharana ] : খেয়াল গান ও এস্রাজ বাদনধারায় নিজস্ব ঢং বা সংগীতশৈলী প্রয়োগের মাধ্যমে উনিশ শতকের মধ্যভাগে শিল্পী হরি সিং এবং তাঁর পুত্র হনুমান দাস সিং প্রবর্তন করেন ‘গয়া ঘরানা’। এ শতকেরই শেষভাগে বিদগ্ধ সংগীতসাধক পিতা-পুত্রের একনিষ্ঠ ভক্ত ও শিষ্য এবং গয়া-ঘরানার ধারক ও বাহক কানাইলাল ঢেঁড়ির মাধ্যমে বাংলায় এই সংগীতশৈলী প্রচারিত হয়।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সংগীতগুরু হরি সিং ও হনুমান দাস সিংয়ের কাছে এস্রাজ বাদ্যযন্ত্রে তালিম গ্রহণ করে কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে অসাধারণ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন কানাইলাল ঢেঁড়ি। তিনি কলকাতার অমৃতলাল দত্ত, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরুণেন্দ্রনাথ প্রমুখ গুণীজনকে এই ঘরানার সংগীতশৈলী ও সমৃদ্ধ এস্রাজ বাদনের তালিম প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে সংগীতগুরু হনুমান দাস সিংয়ের পুত্র মোহন দাসের প্রচেষ্টায় গয়া-ঘরানায় ঠুংরি ও হারমোনিয়াম বাদন সংযোজিত হয়।

গয়া ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Specility of Goya Gharana ] :

  • খেয়াল গানের চমৎকার বন্দিশ
  • সুর মাধুর্যপূর্ণ সুস্পষ্ট বাণী এবং
  • এসাজে খেয়াল অঙ্গে জোড়, তান ও ঝালা সহযোগে বাদন

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

খুরজা ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

খুরজা ঘরানা [ Khurja Gharana ]: অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে তৎকালীন খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ যোধে খাঁ খুরজাতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর প্রবর্তিত সংগীতশৈলী ‘খুরজা ঘরানা’ নামে সমৃদ্ধি লাভ করে। ওস্তাদ যোধে খা সাহেবের পুত্র ওস্তাদ ইমাম খাঁ এবং নাতি ওস্তাদ গুলাম হোসেন খাঁর চৌকস ও নন্দিত গায়কির নৈপুণ্যে খুরজা ঘরানা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

ওস্তাদ আসলাম খান

ওস্তাদ গুলাম হোসেন খাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জহুর খাঁ এবং কনিষ্ঠ পুত্র গুলাম হায়দার খাঁ ওরফে মুন্সি গফুর বখস কুশলী সেতারশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ওস্তাদ জহুর খাঁ সাহেবের পুত্র ওস্তাদ আল্লাফ হোসেন খাঁ খুরজা-ঘরানার সুবিখ্যাত গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

তাঁর পুত্রদের মধ্যে শিল্পী মুহম্মদ ওয়াহিদ খাঁ এবং শিল্পী আহম্মদ খাঁ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এই ভ্রাতৃদ্বয় ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যান। পরবর্তীকালে তাঁরা সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন এবং খুরজা-ঘরানার প্রচার ও প্রসারে ব্রতী হন। বংশপরম্পরায় খুরজা-ঘরানার মূলধারা এগিয়ে গেলেও ওস্তাদ মুহম্মদ ওয়াহিদ খাঁ এবং ওস্তাদ আহম্মদ খাঁ সাহেবের মাধ্যমেও বহু শিষ্য ও প্রশিষ্য সৃষ্টি হয়। পূর্বপুরুষদের চলমান প্রবাহে এই ঘরানার সংগীতশৈলী এখনো স্বমহিমায় বহমান রয়েছে।

খুরজা ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Khurja Gharana ]:

  • অসাধারণ নৈপুণ্যে তান প্রয়োগ
  • রাগের প্রাণসঞ্চারে বিশেষ কুশলতা
  • তিন সপ্তকেই সহজ গমনাগমন
  • কাওয়ালির ঢঙের সুদক্ষ প্রয়োগ
  • উদাত্ত কণ্ঠস্বর

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

কিরানা ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা

কিরানা ঘরানা [ Kirana Gharana ] : বিখ্যাত বীণাশিল্পী ওস্তাদ বন্দে আলী খাঁ হলেন ‘কিরানা ঘরানা’র প্রবর্তক। ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তাঁর জন্ম হয় বলে অনেক সংগীতগুণীজন মনে করেন। এই ঘরানাকে সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় করে তোলেন খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ এবং ওস্তাদ আব্দুল বদিদ খাঁ। কিরানা ঘরানার অন্যতম শিল্পী ছিলেন ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ সাহেবের তিন খ্যাতিমান সহোদর আব্দুল হক, আব্দুল গনি ও আব্দুল মজিদ খাঁ। ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁর শিষ্য সওয়াই গন্ধর্ভ ও সুরেশ বাবু এই ঘরানার গায়ক হিসেবে অসামান্য সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ওস্তাদ আব্দুল করিম খান [ Ustad Abdul Karim Khan ]
এই ঘরানার শিল্পীবৃন্দের স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ গায়নশৈলীতে রাগরূপ প্রকাশে বিশেষ দক্ষতা পরিস্ফুটিত হয়। আলাপ প্রক্রিয়ায় এক একটি স্বর নিয়ে শিল্পীবৃন্দ রাগের ভাবরূপটি অত্যন্ত চমৎকারিত্বের সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন। কিরানা ঘরানার ধারক ও বাহক গুণীজনদের মধ্যে ওস্তাদ রজ্জব আলী খাঁ, ওস্তাদ আমির খা, ওস্তাদ ওয়াহেদ খাঁ, বহরে বুয়া, ভীমসেন যোশি, শ্রীমতি হীরা বাঈ বরোদকার, শ্রীমতি গাঙ্গু বাঈ হাঙ্গল, রোশনারা বেগম, শ্রীমতি সরস্বতী বাঈ রানে প্রমুখ সংগীতকুশলী বিশেষ নৈপুণ্যের মধ্য দিয়ে এর ঐতিহ্য রক্ষা করেছেন।

কিরানা ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Kirana Gharana ] :

  • রাগ-রূপ বিস্তারে অসামান্য দক্ষতা ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঠুংরি গায়ন
  • মনোরঞ্জক ‘সরগ’-এর প্রয়োগ
  • রাগের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা তথা প্রাণসঞ্চারে বিশেষ প্রবণতা
  • সুষম লয় ও পরিচ্ছন্ন বিস্তার
  • তিন সপ্তকেই সহজ যাতায়াত।

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music নিয়ে আজকের আলাপ। হিন্দুস্থানি সঙ্গীতে অনেক গুলো গীত বা গানের ঘরানা ছিল। রাজা মহারাজাদের পৃষ্ঠপোষকতার যুগ শেষ হবার পরে ঘরানাদার গান বাজনার প্রভাব কমতে শুরু করে। তাছাড়া বহু ঘরানার শিল্পীরা বাইরে প্রকাশ্যে গানবাজনা বা মেলামেশার কারণেও সঙ্গীতরীতি অনেক খানি মিশে গেছে। তবে এখনো কিছু ঘরানা জীবিত আছে এবং সেই ঘরানার ছাত্র খলিফাগন ঘরানার গানবাজনা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সেইসব ঘরানার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বিবর্তন নিয়ে আজকের আয়োজন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন ঘরানার মধ্যে মোটামুটিভাবে আটটি ঘরানার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে সংগীতগুণীজন ও গবেষকবৃন্দ মনে করেন। সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো। আশা করি আপনাদের কাজে লাগবে।

অতরৌলি ঘরানা [Atrauli Gharana]:

অতরৌলি ঘরানা  সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের অতরৌলি ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

আগ্রা ঘরানা [ Agra Gharana ] :

আগ্রা ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের আগ্রা ঘরানার আর্টিকেলটি পড়ুন।

আমির খসরু ঘরানা [ Amir Khusro Gharana ]:

আমির খসরু ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের আমির খসরু ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

আল্লাদিয়া ঘরানা [ Alladiya Gharana ]:

আল্লাদিয়া ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের আল্লাদিয়া ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

কালপি ঘরানা [ Kalpi Gharana ]:

এই ঘরানার সুবিখ্যাত ধারক ও বাহকবৃন্দের মধ্যে ওস্তাদ আব্দুল গনি খাঁ সাহেবের শিষ্য লক্ষ্ণৌর বিদগ্ধ সাধকশিল্পী ওস্তাদ ইউসুফ আলী খাঁ স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তিনি জয়পুরের ওস্তাদ আবিদ হোসেনের কাছেও সংগীত বিষয়ে তালিম গ্রহণ করেন। ‘কালপি ঘরানা’র অন্যতম ধারক ওস্তাদ ইউসুফ আলী খাঁ সাহেবের শিষ্যবৃন্দের মধ্যে ইলিয়াস খাঁ, শশধর দত্ত, বিমল মুখোপাধ্যায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য নাম।

কিরানা ঘরানা [ Kirana Gharana ] :

কিরানা ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের কিরানা ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

খুরজা ঘরানা [ Khurja Gharana ]:

খুরজা ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের খুরজা ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

গয়া ঘরানা [ Goya Gharana ] :

গয়া ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের গয়া ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

গোয়ালিয়র ঘরানা [ Gwalior Gharana ]:

গোয়ালিয়র ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের গোয়ালিয়র ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

জয়পুর ঘরানা [ Jaipur Gharana ]:

জয়পুর ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের জয়পুর ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

ডাগর ঘরানা [ Dagar Gharana ]:

ডাগর ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের ডাগর ঘরানা’র আর্টিকেলটি পড়ুন।

তানসেন ঘরানা [Tansen Gharana ]:

তানসেন ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের তানসেন ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

দিল্লি ঘরানা [ Delhi Gharana ]:

দিল্লি ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের দিল্লি ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

পাতিয়ালা ঘরানা [ Patiala Gharana ]:

পাতিয়ালা ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের পাতিয়ালা ঘরানা‘র আর্টিকেলটি পড়ুন।

প্রসদ্দু-মনোহর ঘরানা [ Prashaddu Gharana ]:

সংগীতের পীঠস্থান বারানসিতে উনিশ শতকের প্রথম ভাগে তৎকালীন প্রসিদ্ধ ও কুশলী সংগীতপ্রতিভা হরিপ্রসাদ মিশ্র এবং মনোহর মিশ্র ভ্রাতৃদ্বয় প্রবর্তন করেন এই ঘরানা। প্রবর্তক দুই ভাইয়ের নামানুসারেই ঘরানাটির নামকরণ করা হয় ‘প্রসদ্দু-মনোহর ঘরানা’। তাল ও লয়ের প্রতি বিশেষ ঝোঁকসহ কণ্ঠ এবং যন্ত্র উভয় ক্ষেত্রেই অপূর্ব নান্দনিকতা প্রদর্শন প্রসদ্দু-মনোহর ঘরানা সংগীতশৈলীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল।

বারানসিতে উদ্ভব হলেও এই ঘরানার প্রবর্তক ভ্রাতৃদ্বয়ের মাধ্যমেই এর যথার্থ বিকাশ সাধিত হয় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। পরবর্তী সময়ে তাঁদের উত্তরসূরি শিষ্য ও প্রশিষ্যবৃন্দের মাধ্যমে প্রসদ্দু-মনোহর ঘরানার ঐতিহ্য সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘরানার বাঙালি সংগীতগুণীজনদের মধ্যে শিল্পী মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শিল্পী নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

প্রসদ্দু-মনোহর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Prashaddu Manahar Gharana ]:

  • উচ্চাঙ্গ ও লঘু প্রকৃতির গীত
  • লয়কারী ও সপাট তানের দক্ষতা
  • বৈচিত্র্যময় বোলতান
  • সুর মাধুর্যপূর্ণ খোলা আওয়াজ
  • জোরদার বোলের বাদনশৈলীর প্রয়োগ

বান্দা ঘরানা [ Banda Gharana ]:

‘বান্দা ঘরানা’র ধারক ও বাহক বিদগ্ধ সংগীতগুণীজন ওস্তাদ সাজ্জাদ মহম্মদের কাছে বিষ্ণুপুরের রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল চন্দ্র নাগ, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট সংগীতসাধকবৃন্দ তালিম গ্রহণ করেন। গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিষ্য হলেন সত্য কিংকর বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার গোপালচন্দ্র নাগের শিষ্য হলেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র স্বনামখ্যাত মনিলাল নাগ।

বান্দা ঘরানার বিশিষ্ট বাদক ওস্তাদ গুলাম মহম্মদের কাছে তালিম লাভ করেন মুহম্মদ খাঁ। ওস্তাদ মহম্মদ খাঁর শিষ্য বামাচরণ শিরোমণি নিজ পুত্র জিতেন্দ্রনাগ ভট্টাচার্যকে এই ঘরানার সংগীতশৈলীসমৃদ্ধ শিক্ষা প্রদান করেন। গুণী সেতারশিল্পী জিতেন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর অর্জিত সংগীতভাণ্ডার উজাড় করে পুত্র লক্ষ্মণ ভট্টাচার্যকে করে তোলেন পরিপূর্ণ।

স্বনামখ্যাত ও সুপ্রতিষ্ঠিত সেতারশিল্পী লক্ষ্মণ ভট্টাচার্যের কাছে তালিম গ্রহণ করেন অপরেশ চট্টোপাধ্যায়, অমিয়ভূষণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ খ্যাতনামা শিল্পী। এভাবেই গুরু-শিষ্য এবং বংশপরম্পরায় বান্দা ঘরানার সংগীতশৈলী তার উৎকর্ষ ও নান্দনিকতা প্রস্ফুটিত করতে থাকে।

বারানসি মিশ্র ঘরানা [ Banaras Gharana Mishra ]:

ঋদ্ধ সংগীতজ্ঞ বুদ্ধ মিশ্রকে বলা হয় ‘বারানসি মিশ্র ঘরানা’র প্রবর্তক। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে সংগীতের পীঠস্থান বারানসিতে তিনি এই ঘরানার প্রবর্তন করেন। টপ্পা ও খেয়াল গানের চমৎকার কুশলী গায়নশৈলীর সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র সারেঙ্গির অসাধারণ বাদননৈপুণ্যের অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়ে সৃষ্টি হয় বলেই এই ঘরানার নাম হয়েছে মিশ্র ঘরানা।

সেইসঙ্গে উৎপত্তিস্থলের নাম জুড়ে দিয়ে এই বিশেষ শৈলীটি বারানসি মিশ্র ঘরানা নামেই সংগীতভুবনে পরিচিতি লাভ করেছে। পরবর্তীকালে তবলাবাদনের বিশেষ সৌকর্য যুক্ত হয়ে এর নান্দনিকতা আরো বৃদ্ধি পায়। ঋদ্ধ সংগীতগুণীজন বুদ্ধ মিশ্রের সুযোগ্য পুত্র বেচু মিশ্রের মাধ্যমে এই ঘরানা বাংলায় প্রচার ও প্রসার লাভ করে। বারানসি মিশ্র ঘরানার বিশেষ খ্যাতিমান বাঙালি শিল্পীদের মধ্যে পণ্ডিত রামপ্রসাদ, শরৎ চট্টোপাধ্যায়, রামনারায়ণ চৌধুরী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বারানসি মিশ্র ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Banaras Mishra Gharana ]:

  • মিশ্র রাগের সৃষ্টি ও সুন্দর প্রয়োগ
  • উচ্চাঙ্গের লয়কারীর কাজ
  • টপ্পা ও ছোট খেয়ালে বিশেষ দক্ষতা
  • তান ও বোলতানে চমৎকার নৈপুণ্য
  • সুরেলা খোলা আওয়াজ ও জোরদার বোলের বাদন

বিষ্ণুপুর ঘরানা [ Bishnupur Gharana ]:

সংগীতজগতের মুকুটহীন নৃপতি মিয়া তানসেনের বংশধর ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ সাহেব নিজ নৈপুণ্যে যে নতুন গায়নশৈলী সৃষ্টি করেন তাকেই বলে ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’ । বিষ্ণুপুরের মল্লবংশীয় মহারাজ রঘুপতি সিংহ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ সাহেবকে সভাগায়কের পদ অলংকৃত করার জন্য নিমন্ত্রণ করে আনেন। তৎকালীন বাংলায় সংগীতচর্চার পীঠস্থান ছিল বিষ্ণুপুর। ওস্তাদজির কর্মস্থলের নামেই নতুন সংগীতশৈলীর প্রবর্তন হয় বিষ্ণুপুর ঘরানা নামে।

আবার কেউ কেউ বলেন, মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে সংগীতজীবীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বর্ণনাতীত দুর্দশা মোকাবিলা করতে হয়। সে সময় সেনি ঘরানার প্রসিদ্ধ ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ বিষ্ণুপুররাজ রঘুনাথ সিংহের দরবারে সভাগায়কের স্থান লাভ করেন। তখন থেকেই ওস্তাদজির শিষ্যপরম্পরা বিষ্ণুপুর ঘরানার জন্ম হয়। আর সেনি ঘরানার ওস্তাদ বিষ্ণুপুর ঘরানার উৎস হওয়ার কারণেই এ ঘরানায় সেনি ঘরানার বৈশিষ্ট্য ও প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়।

কিন্তু স্বামী প্রজ্ঞানন্দের তথ্যভিত্তিক যুক্তি মতে, অন্যতম সংগীতগুণীজন পণ্ডিত রামশংকর ভট্টাচার্য হচ্ছেন বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রথম ও প্রধান রূপকার। যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন যে, পণ্ডিত রামশংকর ভট্টাচার্য বাহাদুর খাঁ সাহেবের শিষ্য ছিলেন না এবং আগ্রা, মথুরা ও বৃন্দাবন অঞ্চলের অধিবাসী এক হিন্দু সংগীতগুণীজনের কাছ থেকে পাওয়া সংগীতসম্পদ হতেই বিষ্ণুপুর ঘরানার জন্ম। এই ঘরানার সূচনা ও সম্প্রসারণ বাংলার সংগীতজগতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর প্রভাবেই বাংলায় ধ্রুপদচর্চার প্রসার ঘটে। কেননা বিষ্ণুপুরে তখন প্রধানত ধ্রুপদসংগীতেরই সমধিক চর্চা হতো।

বাংলা ভাষায় ধ্রুপদচর্চার ইতিহাসে বিষ্ণুপুর ঘরানার সংগীতশৈলী এ অঞ্চলেই প্রথম এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদ ভাবগাম্ভীর্যে সমুন্নত এবং তালের ছন্দ বিভাগেও যথেষ্ট স্বকীয়তা রয়েছে। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সংগীতজ্ঞ গুণীজনেরা বিশেষ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং এই ঘরানা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

বিষ্ণুপুর ঘরানার ধারক ও বাহক সংগীতগুণীজনদের মধ্যে পণ্ডিত রামশংকর ভট্টাচার্য, গঙ্গাধর চক্রবর্তী, অনন্তলাল চক্রবর্তী, যদু ভট্ট, পণ্ডিত ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী, রাধিকা প্রসাদ গোস্বামী, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী এবং অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারপুত্র গোপেশ্বর, রামপ্রসন্ন, সুরেন্দ্রনাথ ও রামকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিককালে সৌরিন্দ্রমোহন ঠাকুর, জগৎ চাঁদ গোস্বামী, বিপিন বিহারী চক্রবর্তী, সত্য কিংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ গুণীজন এই ঘরানার যথেষ্ট সমৃদ্ধি সাধন করেছেন।

বিষ্ণুপুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Bishnupur Gharana ] :

  • ধ্রুপদ গায়নে বিশেষ দক্ষতা
  • ধ্রুপদাঙ্গ খেয়াল গায়নের প্রবণতা
  • তান ও বোলতানে পারঙ্গমতা
  • কঠিন লয়কারীর প্রাধান্য
  • ছন্দ প্রকরণে দক্ষতা

বেতিয়া ঘরানা  [ Betiya Gharana ]:

বিহারের বেতিয়া রাজ্যের রাজদরবারকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ‘বেতিয়া ঘরানা’ উদ্ভাবিত হয়। তখনকার সময়ে হিন্দু ও মুসলমান রাজন্যবর্গের মধ্যে বেতিয়া মহারাজ আনন্দকিশোর ধ্রুপদ গানের শিল্পী হিসেবে অসামান্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর সৃষ্ট ধ্রুপদ গান ছিল সৌকর্যগুণে নন্দিত ও শ্রুতিমধুর। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেনের পুত্রবংশীয় রবাব শিল্পীগণ নিজেদের ভাগ্যান্বেষণে কাশীধামে এসে বসবাস শুরু করেন।

সেনি ঘরানার প্রখ্যাত ওস্তাদ প্যারা খাঁ মহারাজা আনন্দকিশোরের রাজসংগীতগুরু এবং সভাসংগীতজ্ঞ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে বেতিয়ারাজের গায়নশৈলীতে সেনি ঘরানার ছায়া কমবেশি পরিলক্ষিত হতো। এজন্য অনেক সংগীতগুণীজন বেতিয়া ঘরানাকে মূলত সেনি ঘরানা থেকে উদ্ভূত এক বিশেষ সংগীতশৈলী বলে মনে করে থাকেন। সংগীতাচার্য রাজা বীরেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী তাঁর Hindusthani Music and Mian Tansen গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে,

‘লক্ষ্ণৌয়ের হায়দার খাঁ, সেনি ঘরানার শিষ্যবৃন্দ এই ঘরানার সৃষ্টিকর্তা। এই ঘরানার সহিত কল্লির মুসলমান ওস্তাদদের নামও জড়িত।’

তবে যে যা-ই মনে করুন না কেন, স্বনামখ্যাত ধ্রুপদশিল্পী রাজা আনন্দকিশোরের উদ্যোগেই ‘বেতিয়া ঘরানা’ সৃষ্টি হয়। বেতিয়ারাজ স্বয়ং কথক ব্রাহ্মণদের সংগীতশিক্ষা প্রদান করতেন। বেতিয়া ঘরানার বিশিষ্ট ধারক ও বাহকগণ মহারাজার শিষ্যকুল হতেই এসেছে। প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ বখতাওরজি, শিবনারায়ণ মিশ্র, গুরুপ্রসাদ মিশ্র এই ঘরানার অন্যতম সংগীতগুণীজন। তাঁদের শিষ্যবৃন্দের মধ্যে কলকাতার খ্যাতিমান ধামারগায়ক বিশ্বনাথ রাও, শ্যামসুন্দর মিশ্র, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী প্রমুখ সংগীতগুণীজনের নাম উল্লেখযোগ্য।

বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ শিবনারায়ণ মিশ্র ও গুরুপ্রসাদ মিশ্র ভ্রাতৃদ্বয়ের মাধ্যমেই বেতিয়া ঘরানা বাংলাভূমিতে প্রচার ও প্রসার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে সংগীত স্রোতধারায় বাংলাই হয়ে ওঠে বেতিয়া ঘরানার ধারক ও বাহক। এই ঘরানার বিখ্যাত শিল্পীবৃন্দের মধ্যে লালচাঁদ বড়াল ও সতীশচন্দ্র দত্ত সংগীতভুবনে হয়ে আছেন নন্দিত।

বেতিয়া ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Betiya Gharana ] :

  • স্বরের সহজসাধ্য ও সুন্দর প্রয়োগ
  • সুর মাধুর্যপূর্ণ সুস্পষ্ট বাণী
  • রাগরূপ বিস্তারে চমৎকারিত্ব
  • ধ্রুপদী মেজাজের সঙ্গে শ্রুতিমাধুর্যের সমন্বয়
  • খোলা ও মধুর আওয়াজের প্রয়োগ

দ্বারভাঙ্গা ঘরানা [ Darbhanga Gharana ]:

অতীতে ধ্রুপদ গান যথেষ্ট শ্রোতানন্দিত হয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করায় একে কেন্দ্র করে বেশকিছু ঘরানার উদ্ভব হয়েছিল। অবশ্য কালের আবর্তে সেগুলোর মধ্য থেকে অনেকগুলো আবার হারিয়েও যায়। ধ্রুপদ গানের আসরে সে-সময় ‘দ্বারভাঙ্গা ঘরানা’ সংগীতরসিক মহলে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে স্বীকৃত ও আদৃত ছিল। এই ঘরানার ধারক ও বাহকদের মধ্যে শিল্পী রামেশ্বর পাঠক এবং শিল্পী বলরাম পাঠক তৎকালীন সময়ে বিশেষ খ্যাতিমান ছিলেন বলে জানা যায়।

রামপুর ঘরানা [ Rampur Gharana ]:

রামপুর রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় উনিশ শতকের মধ্যভাগে ‘রামপুর ঘরানা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাব বাহাদুর কলবে খাঁ নিজেও ছিলেন একজন সংগীতজ্ঞ এবং বহু বাদ্যযন্ত্র বাদনে বিশেষ পারদর্শী। বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আহমদ আলী খাঁ রামপুর ঘরানার সংগীতশিল্পী হিসেবে ছিলেন খ্যাতিমান। কোনো কোনো সংগীতগুণীজন রামপুর ঘরানার সংগীতশৈলীকে ‘আহমদ আলী খাঁ’ ঘরানা নামেও উল্লেখ করে থাকেন। তন্ত্রবাদ্যের ক্ষেত্রে এই ঘরানা যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিল।

সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেনের পুত্রবংশীয় ওস্তাদ বাহাদুর সেন খাঁ সাহেবের অন্যতম শিষ্য হলেন রামপুরাধিপতির ভাই সংগীতজ্ঞ নবাব হায়দার আলী খাঁ। গুরুজির কাছে তাঁর আপন ভাইয়ের নাতি ওয়াজির খাঁ ছোটবেলা থেকেই সংগীতের তালিম গ্রহণ করতেন। মাত্র বারো বছর বয়সে গুরুজি ইহলোক ত্যাগ করলে নিজ পিতা সুপ্রসিদ্ধ বীণাশিল্পী ওস্তাদ আমির খাঁর কাছে চলছিল ওয়াজিরের সংগীত সাধনা। এর কিছুদিন পর বাবার অকালপ্রয়াণ হলে নবাব হায়দার আলী খাঁ সাহেবের কাছে তিনি সংগীতশিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন।

ত্রিপুরা রাজ্যের সভাবাদক নিজ মামা বিখ্যাত রবাবশিল্পী কাসেম আলী খাঁ সাহেবের কাছে রবাব ও সুরশৃঙ্গার এবং পিতৃবংশীয় শ্রেষ্ঠ গায়ক ওস্তাদ বাকরালি খাঁর কাছে তিনি খেয়াল গানের শিক্ষা লাভ করেন। এভাবে সংগীতবিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ নিজেও একদিন হয়ে ওঠেন সে যুগের ভারতশ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ।

রামপুর রাজদরবারের এই সংগীতগুণীজনদের সকলেই ছিলেন তৎকালীন সময়ের সুপ্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ। রামপুর নবাবের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীতের নানা বিভাগে বহু শিষ্যকে শিক্ষা প্রদানের সুব্যবস্থা ছিল সেখানে।

প্রখ্যাত সরোদশিল্পী ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ, আব্দুর রহিম খাঁ, তারাপদ ঘোষ, নাসির আলী, মোহাম্মদ হোসেন, তারাপ্রসাদ রায়, প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে, যাদবেন্দ্র মহাপাত্র, সৈয়দ ইব্বন আলী, উপমহাদেশের অন্যতম গায়িকা শ্রীজ্ঞান এবং বাংলার গৌরবময় সংগীত পরিবারের অন্যতম দুই দিকপাল সংগীতরত্ন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ রামপুর ঘরানার সংগীতধারাকে হৃদয়ে লালন করে সংগীতশিক্ষা লাভ করেন।

রামপুর রাজদরবারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় স্বনামধন্য এই সংগীতগুণীজনদের মাধ্যমে রামপুর ঘরানা ভারতবর্ষ তথা সমগ্র সংগীতবিশ্বে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সংগীতরত্ন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের অভূতপূর্ব সংগীতনৈপুণ্য এবং তাঁর শিষ্য ও প্রশিষ্যবৃন্দের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি বিশ্বসংগীত দরবারে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। বিশ্বখ্যাত সরোদশিল্পী যিন্দা হোসেন ও সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করও ছিলেন রামপুর ঘরানার অনুসারী।

ওস্তাদ দবির খাঁ সাহেবের মাধ্যমেই বাংলার সংগীত আসরে এই ঘরানা প্রচলিত হয় এবং ব্যাপক প্রসার লাভ করে। অবশ্য সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেন বংশীয় সেরা গুণীজনদের বিশেষ অবদানে রামপুর ঘরানার উদ্ভব হয় বলেই অনেকে মনে করেন। হয়তো সেজন্যই কোনো কোনো গুণীজন রামপুর ঘরানাকে সেনি ঘরানার রূপান্তর বলে অভিহিত করে থাকেন।

রামপুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Rampur Gharana ] :

  • পদ্ধতিগত সম্পূর্ণতা
  • খোলা আওয়াজের প্রয়োগ
  • তান প্রয়োগে অসাধারণ নৈপুণ্য
  • তিন সপ্তকেই সহজ যাতায়াত
  • ধ্রুপদী মেজাজের সঙ্গে শ্রুতিমাধুর্যের সমন্বয়

সহসবান ঘরানা [ Sahaswan Gharana ]:

স্বনামখ্যাত সংগীতগুরু ওস্তাদ নখন পীর বখস সাহেবের পুত্রবংশীয় নাতি এবং ওস্তাদ হদ্দু খাঁ সাহেবের জামাতা ওস্তাদ ইনায়েত খাঁ সাহেব ‘সহসবান ঘরানা’র ধারক ও বাহক হিসেবে অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করেন। সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেন বংশীয় উজ্জ্বল সংগীত নক্ষত্র ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ সাহেবের কাছেও তিনি সংগীতশিক্ষা লাভ করেন। ফলে তাঁর সংগীতশৈলীতে গোয়ালিয়র ও বিষ্ণুপুর ঘরানার মিলিত সৌন্দর্য অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে পরিলক্ষিত হতো।

ওস্তাদ ইনায়েত খা পরবর্তী শিষ্যপরম্পরায় সহসবান ঘরানার বিদগ্ধ শিল্পীবৃন্দের মধ্যে রামকৃষ্ণ বঝে বুয়া, মুস্তাক হোসেন খাঁ, কুমার গান্ধর্ব, বি আর দেওধর প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য নাম।

সহসবান ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Sahaswan Gharana ] :

  • তান ও বোলতানের পারঙ্গমতা
  • খোলা আওয়াজের প্রয়োগ
  • ধ্রুপদিয়া শৈলীর দক্ষতা
  • ছন্দ প্রকরণে নৈপুণ্য
  • স্বর বিস্তারে কুশলতা

সাহারানপুর ঘরানা [ Saharanpur Gharana ]:

বাহাদুর খা জাফরের দরবারি গায়ক সুফি সাধক ওস্তাদ মহম্মদ জমা ছিলেন ‘সাহারানপুর ঘরানা’র ধারক ও বাহকদের মধ্যে অন্যতম। সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেনের কন্যাবংশীয় সংগীতজ্ঞ নির্মল শাহের কাছে তিনি সংগীতশিক্ষা লাভ করেন। তবে এই ঘরানার প্রসঙ্গে প্রথমেই আসে ইন্দোর ঘরানার সংগীতজ্ঞ মুরাদ খাঁ সাহেবের অন্যতম শিষ্য ওস্তাদ বাবু খাঁ সাহেবের নাম।

সাহারানপুর ঘরানার সংগীতশৈলী প্রচার ও প্রসারে স্বনামখ্যাত ওস্তাদ মহম্মদ জমা, ওস্তাদ বাবু খাঁ এবং তাঁর শিষ্য ও প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আব্দুল হালিম জাফর খাঁ সাহেবের অবদান সর্বোচ্চ। এই ঘরানার প্রসিদ্ধ সংগীতশিল্পীবৃন্দের মধ্যে মৌলা বক্স, মিয়া কালু, বহরাম খাঁ, অলাবন্দে খাঁ, বন্দে আলী খাঁ, জাকিরুদ্দিন খাঁ এবং ধ্রুপদ গায়ক রহিমুদ্দীন খাঁ, আমিনুদ্দীন ও মৌজুদ্দীন ডাগর প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সাহারানপুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Saharanpur Gharana ] :

  • তৈয়ারী ও স্বরের রঢ়ত
  • লয়কারীর দক্ষতা
  • আলাপকারী ও বাদনশৈলীতে ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুংরি গানের প্রভাব

আরও পড়ুন:

আগ্রা ঘরানা, Agra Gharana [ কণ্ঠশিল্প বা গীত বা গানের ঘরানা, সঙ্গীতের ঘরানা ]

আগ্রা ঘরানা [ Agra Gharana ] : পরাক্রমশালী মুঘল সম্রাট আকবরের রাজদরবারের সভাগায়ক বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ হাজি সুজান খাঁ সাহেবকে ‘আগ্রা ঘরানা’র প্রবর্তক বলা হয়। সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেনের জামাতা বচ্চে খুদা বখস ওরফে ওস্তাদ হাজি সুজান খাঁ সংগীতশিক্ষা লাভ করেন ওস্তাদ নখন পীর বখস সাহেবের সান্নিধ্যে। তাই গোয়ালিয়র ও আগ্রা ঘরানার মধ্যে নিকট সম্বন্ধ পরিলক্ষিত হয়। ভিন্ন মতানুসারে সংগীতগুণীজন শিল্পী অলখ দাস ও মলুখ দাসকে আগ্রা ঘরানার প্রবর্তক বলে দাবি করলেও এর কোনো প্রামাণিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি।

দিল্লি ঘরানার বিখ্যাত শিল্পী আফতাব এ মৌসেকি ওস্তাদ ফৈয়াজ খান

সংগীতের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় জানা যায় যে, রাজপুত সুজান সিংহ নৌহার ওরফে সুজান দাস ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক সুজান খা নাম ধারণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করলে নামের সঙ্গে হাজি শব্দটি যুক্ত করে দেওয়া হয়। সুদক্ষ সংগীতশিল্পী এবং পারদর্শী সংগীত রচয়িতা হাজি সুজান খাঁ সাহেবের সংগীতনৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে বাদশাহ নামদার তাঁকে ‘দীপকজ্যোত’ উপাধিসহ আলওয়ারের নিকটবর্তী গৌনপুর নামক গ্রামটি উপহার দিয়েছিলেন।

বিদগ্ধ সংগীতগুণীজন ওস্তাদ হাজি সুজান খাঁর চার পুত্র — অলক, মলক, খলক ও লবঙ্গ সকলেই সংগীতবিদ্যায় যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে উঠলেও কেবলমাত্র মলকের বংশধারাতেই রক্ষিত হয়েছে আগ্রা ঘরানার পরম্পরা। সংগীতজ্ঞ মলকের দুই পুত্র সরসরঙ্গ ও শ্যামরঙ্গ ধ্রুপদ এবং ধামার গানে যথেষ্ট কুশলী ছিলেন। কাশীর রাজা বীরভদ্র সিংহের কাছে রাজবৃত্তিপ্রাপ্ত সংগীতজ্ঞ সরসরঙ্গ ও শ্যামরঙ্গের সময় পর্যন্ত আগ্রা ঘরানায় কেবলমাত্র ধ্রুপদ এবং ধামার গানেরই প্রচলন ছিল। গোয়ালিয়রের প্রখ্যাত সংগীতসাধক ও গুণীজন নখন পীর বখস তাঁদের কাছে বেশকিছু ধ্রুপদ এবং ধামার গান শিখেছিলেন বলে জানা যায়। সংগীতজ্ঞ সরসরঙ্গ রচিত কয়েকটি গান এখনো শোনা যায় কুশলী সংগীতশিল্পী মহলে।

সংগীতজ্ঞ শ্যামরঙ্গের চার পুত্র হলেন – জংঘু খাঁ, সুসু খাঁ, গুলাব খাঁ ও ঘগঘে খুদা বখস। এঁদের মধ্যে প্রথম তিনজন চমৎকার কণ্ঠের অধিকারী এবং নিজেদের ঘরানার সংগীতে যথেষ্ট নৈপুণ্য অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সর্বকনিষ্ঠ ভাই ঘগঘে খুদা বখসের ক্ষেত্রে দেখা দেয় চরম সমস্যা। কণ্ঠস্বর ভালো না হওয়ায় তাঁকে বলা হতো ‘ঘগঘে’, যার অর্থ হলো ‘খারাপ কণ্ঠস্বরবিশিষ্ট’। ফলে সকলেই তাঁকে উপহাস করত, এমনকি আগ্রা ঘরানার প্রধান ওস্তাদবৃন্দও তাঁকে তালিম প্রদানে অস্বীকৃতি জানান।

https://youtu.be/_SibWobw4wo

মনের দুঃখে এবং সংগীতশিক্ষা লাভের প্রচণ্ড বাসনায় জেদি খুদা বখস অপরিসীম যাত্রাকষ্ট স্বীকার করে আগ্রা থেকে সুদূর গোয়ালিয়রে গমন করেন। কুশলী সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ নথন পীর বখস তখন গোয়ালিয়রের রাজা দৌলতরাও সিন্ধিয়ার সভাগায়ক পদ অলংকৃত করছিলেন। সরাসরি তাঁর সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত বর্ণনা করেন ঘগঘে খুদা বখস। ওস্তাদজির কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন:

‘ধ্রুপদ গান করা যদি আমার পক্ষে সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি খেয়াল গানেরই তালিম প্রদান করুন।’

অল্প বয়সী ছেলেটির এই আগ্রহে মুগ্ধ হয়ে ওস্তাদজি তাঁকে বারো বছর যাবৎ নিজ সংগীতভাণ্ডার উজাড় করে তালিম প্রদান করেন। কঠোর সাধনা আর একনিষ্ঠ অধ্যবসায়ের গুণে খেয়াল গানে এক আশ্চর্য নৈপুণ্য অর্জন করে ঘগঘে খুদা বখস পৌঁছে যান তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে। এক যুগ পর নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করে কণ্ঠমাধুর্যের জাদুতে মুগ্ধ করে দেন সকলকে। ধ্রুপদ ও ধামার গানের সঙ্গে বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ ঘগঘে খুদা বখসের ঐকান্তিক ভালোবাসায় আগ্রা ঘরানায় যুক্ত হয় এক নতুন গায়নশৈলী ‘খেয়াল’।

আগ্রা ঘরানার সংগীতনৈপুণ্য চারদিকে ছড়িয়ে দিতে সংগীত সফরে বেরিয়ে পড়েন সংগীতজ্ঞ ঘগঘে খুদা বখস। প্রথমেই আলওয়ার রাজ্যে গমন করে রাজা শিবদান সিংহের রাজসভায় খেয়াল গান পরিবেশনের মাধ্যমে মুগ্ধ করেন সকলকে। রাজা বাহাদুরের জীবদ্দশায় আলওয়ারের সভাগায়ক পদ অলংকৃত করে আগ্রা ঘরানার সংগীতশৈলী প্রচার ও প্রসারে মনোনিবেশ করেন। অসংখ্য শিষ্য তৈরি করে তাদের মধ্যে শুদ্ধ সংগীতের আলো প্রজ্বলিত করতে বিশেষ মনোযোগ দেন।

বেশ কিছুদিন পর রাজা শিবদান সিংহের দেহান্তর ঘটলে আবারো পথচলা শুরু করেন তিনি সংগীত নিয়ে। বিভিন্ন স্থানে আগ্রা ঘরানার সংগীত মাধুর্য ছড়িয়ে জয়পুরে গিয়ে উপস্থিত হন। জয়পুররাজ সওয়াই রামসিংহ ঋদ্ধ ওস্তাদ ঘগঘে খুদা বখস পরিবেশিত সংগীতনৈপুণ্যে চমৎকৃত হয়ে সসম্মানে তাঁকে রাজসভাগায়কের পদে অধিষ্ঠিত করেন। সেখানে অবস্থানকালে আগ্রা ঘরানার ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে শিষ্যমণ্ডলী তৈরিসহ এর প্রচার ও প্রসারে তিনি সদা সচেষ্ট থাকেন।

আগ্রা ঘরানার সংগীতশৈলীর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থেকেছে সংগীতজ্ঞ শ্যামরঙ্গের প্রথম পুত্র জংঘু খাঁ এবং চতুর্থ ও কনিষ্ঠ পুত্র ঘগঘে খুদা বখসের বংশ আর শিষ্যপরম্পরায়। এই ঘরানার শিষ্যদের তালিম প্রদানের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ রীতি প্রচলিত ছিল। সাধারণত ওস্তাদ জংঘু খাঁ সাহেবের বংশধরেরা তালিম প্রদান করতেন ওস্তাদ খুদা বখসের বংশধরদের এবং খুদা বখসের বংশধরেরা তালিম দিতেন জংঘু খাঁ সাহেবের বংশধরদের। এই ঘরানার শিল্পীবৃন্দকে খেয়াল ও ধ্রুপদ উভয় গায়নশৈলীতেই ঈর্ষণীয় নৈপুণ্য অর্জন করতে হতো।

আগ্রা ঘরানার স্বনামখ্যাত সংগীতগুণীজনদের নাম [ Rnowned Personalities of Agra Gharana ] :

  • ওস্তাদ গুলাম আব্বাস খাঁ
  • কল্পন খাঁ
  • ফৈয়াজ খাঁ [ আফতাব এ মৌসেকি ]
  • নখন খাঁ
  • মহম্মদ খাঁ
  • আব্দুল্লাহ খাঁ
  • বিলায়েত হোসেন খাঁ
  • বাবু খাঁ
  • ননহে খাঁ
  • খাদিম হোসেন খাঁ
  • আনওয়ার হোসেন খাঁ
  • ভাস্কর বুয়া বোখলে
  • বাবলি বাঈ
  • ওস্তাদ আলতাফ হোসেন
  • ওস্তাদ লতাফৎ হোসেন
  • গোলাম রসুল খাঁ
  • খুশি খাঁ
  • ড. এস এন রতনজংকর
  • ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়
  • জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী
  • ওস্তাদ শরাফৎ হোসেন
  • কে এল সায়গল
  • শ্রীমতি ড. চন্দ্ৰচূড়
  • মালকা বাঈ আগ্রাওয়ালি
  • ইউসুফ হোসেন
  • ইউনুস হোসেন
  • ইন্দরা ওয়াডকর
  • সরস্বতী বাঈ ফাতরপেকর
  • দুর্গা খোটে
  • গিরিজা বাঈ কেলকর
  • গজানন রাও যোশি
  • এ বি অভয়ংকর

হাজি সুজান খাঁ রচিত বেশকিছু ধ্রুপদ গান এখনো আগ্রা ঘরানার শিল্পীবৃন্দ পরিবেশন করে থাকেন। আগ্রা ঘরানার বর্তমান রূপটি গড়ে উঠতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন ও বিশেষ অবদান রেখেছেন :  ওস্তাদ নখন খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ এবং ওস্তাদ বিলায়েত হোসেন খাঁ।

আগ্রা ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Agra Gharana ] :

  • নোম তোম সংবলিত আলাপ
  • ধ্রুপদাঙ্গের খেয়াল গায়ন
  • উচ্চাঙ্গের লয়কারীর কাজ
  • কাওয়ালির ঢঙে বোল তৈরির নৈপুণ্য এবং
  • ধ্রুপদ ও ছোট খেয়ালে বিশেষ দক্ষতা।

আগ্রা ঘরানা সম্পর্কে আরও পড়ুন [ Read more about Agra Gharana ]: