পণ্ডিত শিব কুমার শর্মা চলে গেলেন

পণ্ডিত শিব কুমার শর্মা চলে গেলেন।
নেপাল থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত যারাই সাফ-সুতরা গান বাজনা শোনেন, তাদের মনে পণ্ডিতজীর জন্য আছে গভীর শ্রদ্ধা।

পন্ডিতজীর আগে সন্তুর (Santoor) একটা সাদামাটা ফোক ইন্সট্রুমেন্ট ছিল। যন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধতাও ছিল অনেক। যেমন ঢেও খেলানো সুরা বাজানো যেত না, সুরের আন্দোলন করার রেয়াজ ছিল না। তাই মূল যন্ত্র হিসেবে শাস্ত্রীয় সংগীত তো দূরে থাক, সাধারণ গানও করা যেত না। সহযোগী যন্ত্র হিসেবেই বাজত।

পন্ডিতজীর হাতেই যন্ত্রটি একক যন্ত্র হিসেবে শাস্ত্রীয় সংগীতের অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছিলো। তিনি যন্ত্রটির কারিগরি উন্নয়ন করেছে, মীড় সহ শুদ্ধ সঙ্গীত বাজাবার জন্য প্রয়োজনীয় গায়কী অঙ্গের কায়দা গুলো আবিষ্কার করেছেন। বাজিয়ে, জমিয়ে দেখিয়েছেন মিয়া মালহারের মত গম্ভীর-জলদগম্ভীর রাগ।

সঙ্গীতের ইতিহাসে তার নাম উজ্জ্বল থাকবে।
বারবার মনে আসতে থাকবে।
তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

পাতিয়ালা ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

পাতিয়ালা ঘরানা [ Patiala Gharana ]: বিদগ্ধ ও প্রসিদ্ধ সংগীতজ্ঞ আলী বখস এবং ফতেহ আলী খা এই দুই ভাইকে বলা হয় ‘পাতিয়ালা ঘরানা’র জনক। বড় মিয়া কালু খাঁ এবং কালে খাঁ এই ঘরানার আদি পুরুষ। বড় মিয়া কালু খাঁ সাহেবের দুই পুত্র আলী বখস ও ফতেহ আলী খাঁ প্রথমে জয়পুর ঘরানার উত্তরসূরি গোরখি বাঈ এবং পরে দিল্লি ঘরানার প্রবর্তক সংগীতজ্ঞ তানরস খাঁ সাহেবের কাছে সংগীতশিক্ষা লাভ করেন। ফলে তাঁদের গায়নরীতিতে জয়পুর ও দিল্লি উভয় ঘরানার প্রভাব বিস্তৃত হয় এবং নতুন এক গায়নশৈলীর উদ্ভব ঘটে।

Ustad Bade Fateh Ali Khan of Patiala

ওস্তাদ আলী বখস সাহেবের পুত্র বড়ে গুলাম আলী খাঁ আধুনিককালে পাতিয়ালা ঘরানার নাম সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল করেছেন। এই ঘরানার সর্বোচ্চ খ্যাতিমান এই গায়ক সংগীতশিক্ষা লাভ করেন ওস্তাদ কালে খাঁ সাহেবের কাছে। পাতিয়ালা ঘরানার বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দের মধ্যে বড় মিয়া কালু খাঁ, ওস্তাদ আলী বখসের পুত্র বড়ে গুলাম আলী খাঁ, তাঁর পুত্র ওস্তাদ মুনাব্বার খাঁ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ঘরানার ঠুংরিতে টপ্পার ভাব বেশি পরিলক্ষিত হয় এবং এ ধরনের সংগীতকে বর্তমানে বলা হয় পাঞ্জাবি ঠুংরি।

পাতিয়ালা ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Patiala Gharana ] :

  • খেয়ালের চলন লঘু প্রকৃতির
  • তানগুলোর প্রয়োগনৈপুণ্য অসাধারণ
  • ঠুংরি গায়নে বিশেষ প্রবণতা ও দক্ষতা
  • দ্রুতলয়ে সপাট তান
  • অতি ‘তার’ সপ্তকে সহজেই কণ্ঠ চালনা

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

দিল্লি ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

দিল্লি ঘরানা [ Delhi Gharana ]: মুঘল সাম্রাজ্যের শেষভাগে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ কাদির বখসকে ‘তানরস’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। সংগীত ইতিহাসের ভিত্তিতে এই প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ তানরস খাঁ ‘দিল্লি-ঘরানা’র প্রবর্তন করেন বলে জানা যায়। কথিত রয়েছে, ওস্তাদ হসু ও হদ্দু এবং হাপুড় ঘরানার ইউসুফ খাঁ ও দিল্লির ওস্তাদ চাঁদ খাঁ এই ঘরানার ধারক ও বাহক।

কোনো কোনো সংগীতগুণীজনের মতে, সংগীতজ্ঞ সদারঙ্গ ও অদারঙ্গ এই ঘরানার সৃষ্টি করেছেন। আবার ভিন্নমতে শোনা যায়, দিল্লি নগরীর অধিবাসী সাবন্ত ও বুলা নামে দুই ভাই এই ঘরানার প্রবর্তক। তাঁরা কওয়াল বংশোদ্ভূত বলে পরিচিত ছিলেন এবং এই বংশে অপচল নামের দিল্লি ঘরানার একজন প্রসিদ্ধ গায়ক ছিলেন।

Delhi Gharana maestro Ustad Iqbal Ahmed Khan

ওস্তাদ তানরস খাঁ সাহেবের সুযোগ্য পুত্র ওস্তাদ উমরাও খাঁ দিল্লি-ঘরানার প্রচার ও প্রসারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রচেষ্টায় এই ঘরানা সংগীতপিপাসুদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে চমৎকারিত্বের সঙ্গে। দিল্লি ঘরানার ধারক ও বাহকদের মধ্যে ওস্তাদ মোজাফ্ফর খাঁ, ওস্তাদ আলী বখস, মম্মন খাঁ, বুন্দু খাঁ (সারেঙ্গিশিল্পী), ওস্তাদ ফতেহ আলী খাঁ এবং বাংলার প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ গিরিজাশংকর চক্রবর্তী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

দিল্লি ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Delhi Gharana ] :

  • তান প্রয়োগে অসাধারণ কুশলতা
  • গমকের প্রাধান্য
  • বোলতানের বৈচিত্র্য
  • খেয়ালের কলাপূর্ণ বন্দিশ
  • কঠিন লয়কারী।

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

তানসেন ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

তানসেন ঘরানা [Tansen Gharana ]: মুঘল সম্রাট আকবরের রাজদরবারে ১৫৬৮ খ্রিষ্টাব্দে নবরত্নের শ্রেষ্ঠ রত্ন হিসেবে অধিষ্ঠিত হন সংগীতজ্ঞ মোহাম্মদ আতা আলী খান। রাজদরবারের এক জলসায় তাঁর অভূতপূর্ব সংগীতপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে সম্রাট তাঁকে সম্মানের সঙ্গে প্রদান করেন ‘মিয়া তানসেন’ উপাধি। একই সঙ্গে তিনি ‘অতাই’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ গায়ক সম্মানে ভূষিত হন। শুধু শিল্পীই নন, বরং তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমানের একজন সংগীতস্রষ্টা, কবি ও সুদক্ষ বাদ্যযন্ত্র শিল্পী।

Ustad Dabir Khan Sahab, Binakar

চারটি তুকযুক্ত বহু ধ্রুপদ গান রচনাসহ ধ্রুপদকে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগে বিভক্ত করে নবরূপে রূপায়িত করেছেন। রাগে সপ্তস্বরের প্রয়োগ করে তিনি এনে দিয়েছেন নবীন অনুভূতি, অপূর্ব রস ও চমৎকার নান্দনিকতা। তাঁর নিজস্ব ও নতুন সংগীতশৈলী ‘তানসেন ঘরানা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সংগীতের বাদন স্রোতধারায় যুক্ত করতে ‘রবাব’ নামে একটি অভিনব বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করে সবাইকে মধুর সুরঝংকারে মুগ্ধ করে দেন। তাঁর রচিত সংগীতত্সার ও রাগমালা নামে সংগীতবিষয়ক দুটি গ্রন্থের কথা জানা যায়।

মিয়া তানসেনের চার পুত্র – সুরত সেন, তরঙ্গ সেন, শরৎ সেন ও বিলাস খাঁ এবং একমাত্র কন্যা সরস্বতী সংগীতবিদ্যায় যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। এই গুণীজনেরা সবাই পিতৃ-ঘরানার ধারক ও বাহক হিসেবে তাঁদের বংশ এবং শিষ্যপরম্পরায় তানসেন ঘরানার প্রচার ও প্রসারে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। মিয়া তানসেনের জামাতা মিশ্র সিংহ ওরফে নৌবত খাঁ এই ঘরানার অসামান্য কুশলী বীণাশিল্পী ছিলেন।

বংশ ও শিষ্য পরম্পরায় তানসেনের পুত্র বংশীয় সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ বাহাদুর সেন খাঁ, রামপুরের উমরাও খাঁ খণ্ডারে, তাঁর পুত্র ওস্তাদ রহিম খাঁ ও আমির খাঁ (সরোদশিল্পী), ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেবের পুত্র ভারতবিখ্যাত ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ (বীণাশিল্পী), ওস্তাদ কাশেম আলী খাঁ (রবাবশিল্পী), রামপুরের নবাব হামিদ আলী খাঁ, ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সাহেবের নাতি ওস্তাদ দবির খা (বীণাশিল্পী), সংগীতাচার্য পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে, সংগীতরত্ন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ প্রমুখ খ্যাতিমান সংগীতগুণীজন তানসেন ঘরানার ধারাকে তাঁদের সংগীতশৈলীতে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন।

মিয়া তানসেনের সংগীতপ্রতিভা নিয়ে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। তাঁকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গায়ক ও বাদ্যশিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানসহ ‘সংগীতসম্রাট’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। মিয়া তানসেনের সমসাময়িকদের মধ্যে বৃজচন্দ, শ্রীচন্দ, বাবা মদন রায়, সদুল্লা খাঁ ছিলেন সুবিখ্যাত বীণাশিল্পী।

তানসেন ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Dagar Gharana ] :

  • চারতুক বিশিষ্ট ধ্রুপদ গায়নে বিশেষ দক্ষতা
  • তান ও বোলতানে অভূতপূর্ব কুশলতা
  • বীণ অঙ্গের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঢঙের নৈপুণ্য
  • সপ্তকের সকল অবস্থাতেই সহজ গমনাগমন
  • উদাত্ত ও গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বরের প্রয়োগ।

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

ডাগর ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

ডাগর ঘরানা [ Dagar Gharana ]: ‘ডাগর ঘরানা’ হচ্ছে একটি প্রাচীন ধ্রুপদিয়া ঘরানা। কথিত রয়েছে ডাগর গ্রাম নিবাসী ধ্রুপদ গায়ক বৃজচন্দ্র ও হরিদাস হচ্ছেন এই ঘরানার প্রবর্তক। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ বহরম খাঁ এবং তাঁর পিতার গায়নশৈলীতেই এই ধারা পরিলক্ষিত হয়। সংগীত-গবেষক ও গুণীজনদের অনেকেই বলেন, বর্তমানে ডাগর-ঘরানা বলতে যা বোঝায় প্রকৃতপক্ষে তার শুভসূচনা হয় ওস্তাদ বহরম খাঁ সাহেবের সংগীতনৈপুণ্য থেকেই। এই ঘরানার সংগীতশৈলী প্রথমে জয়পুর এবং পরে উদয়পুরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

ডাগর ঘরানার ধ্রুপদ গায়ক ওস্তাদ হুসেইন সাইদুদ্দিন ডাগর

প্রাচীন ‘শুদ্ধাগীতি’র গায়কি এবং ধারার সঙ্গে ডাগর-ঘরানার বিশেষ মিল পরিলক্ষিত হয়। এই ঘরানার শ্রেষ্ঠ ধারক ও বাহক ছিলেন তৎকালীন সংগীতসমাজের অন্যতম কলাকার ওস্তাদ নাসিরউদ্দিন। ডাগর-ঘরানার ধ্রুপদ অত্যন্ত শাস্ত্রবদ্ধ, ভক্তিপূর্ণ ও গভীর রসাপুত। এতে বায়ান্ন প্রকার অলংকারের ব্যবহার রয়েছে বলে জানা যায়। এই ঘরানায় বীণাবাদন ও ধ্রুপদ গানের যুগলবন্দি পরিবেশন অত্যন্ত প্রচলিত একটি রীতি।

ওস্তাদ নাসিরউদ্দিনের মাধ্যমেই বাংলা গানের আসরে ডাগর-ঘরানার সূত্রপাত ও প্রচলন শুরু হয়। তাঁর স্বনামধন্য দুই পুত্র নাসির মঈনউদ্দিন ডাগর ও নাসির আমিনউদ্দিন ডাগর এই ঘরানার বিশেষ খ্যাতিমান শিল্পী। নিজস্ব সংগীতপ্রতিভা আর ডাগর-ঘরানার গায়নশৈলীর গুণে বিশ্বের সংগীতপ্রেমী দর্শক-শ্রোতার কাছে তাঁরা ‘ডাগর ব্রাদার্স’ নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের অসাধারণ সংগীতনৈপুণ্যের কারণে এই ঘরানার প্রতি সংগীতরসিক ও গুণীজনদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।

পিতার মাধ্যমে ডাগর ঘরানার যেমন প্রচার ও প্রসার ঘটে, ঠিক তেমনি পুত্র নাসির আমিনউদ্দিন ডাগরের মাধ্যমে তা আরো বেশি সম্প্রসারিত হয়।

ডাগর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Dagar Gharana ]:

  • আড়ম্বরবিহীন তবে মধুর রূপে গান পরিবেশন
  • অলংকার, মিড় ও গমকের ব্যবহার না করা এবং
  • গানের চলনে সরলতা

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

জয়পুর ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

জয়পুর ঘরানা [ Jaipur Gharana ]: সংগীতাকাশের অন্যতম জ্যোতিষ্ক সংগীতজ্ঞ শাহ সদারঙ্গের দ্বিতীয় পুত্র মহারঙ্গ নামে খ্যাত সংগীতজ্ঞ ভুপত খাঁ ওরফে মহম্মদ আলীকে ‘জয়পুর ঘরানা’র প্রবর্তক বলা হয়। সংগীত-গবেষক ও ঐতিহাসিক গুণীজনদের মতানুসারে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে খ্যাতিমান এই সংগীতজ্ঞের জন্ম হয়। পিতা এবং বড় ভাইয়ের পথ অনুসরণ করে তিনিও রাজাধিরাজ মহম্মদ শাহের রাজদরবার অলংকৃত করেছিলেন। সংগীতসম্রাট মিয়া তানসেনের দৌহিত্র বংশের একাদশতম সংগীত নক্ষত্ররাজির অন্যতম মহারঙ্গ ছিলেন ধামার ও খেয়াল গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী।

Jal Mahal in Man Sagar Lake, Jaipur

বংশের ধারানুযায়ী বীণাশিল্পী হিসেবে তিনি এতটাই প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন যে, সংগীত ইতিহাসে ‘শাহ বীণকার’ নামেও হয়ে ওঠেন খ্যাতিমান। তাঁর প্রবর্তিত জয়পুর-ঘরানার গায়নশৈলী সংগীতপিপাসু মহলে ছিল উচ্চ প্রশংসিত। এই ঘরানার শিল্পীদের মধ্যে আশিক আলী খাঁ, গোরখি বাঈ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জয়পুর-ঘরানার তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। হয়তো সে কারণেই জয়পুর-ঘরানা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে অনেক সংগীতগুণীজন বলেন, পাতিয়ালা ও আল্লাদিয়া খাঁ ঘরানা জয়পুর ঘরানারই উত্তর বাহক।

জয়পুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Jaipur Gharana] :

  • গীতের সংক্ষিপ্ত বন্দিশ
  • বক্রতান ও ছুটতানের প্রয়োগ
  • খোলা আওয়াজের প্রয়োগ।

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

গোয়ালিয়র ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

গোয়ালিয়র ঘরানা [ Gwalior Gharana ]: বিদগ্ধ গুণীজন ওস্তাদ নখন পীর বখস সংগীতভুবনে একটি সুপরিচিত নাম। লক্ষ্ণৌ থেকে গোয়ালিয়রে এসে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সংগীতজ্ঞ নখন পীর বখস সাহেবের সংগীতশৈলী ‘গোয়ালিয়র ঘরানা’ নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঘরানা প্রবর্তনের উৎপত্তিস্থলের নামানুসারেই তিনি নিজ উদ্ভাবিত সংগীতশৈলীর এমন নামকরণ করেন। গোয়ালিয়র ঘরানার ধারক ও বাহক সংগীতজ্ঞদের মধ্যে তাঁর দুই পুত্র কদর বখস এবং পীর বখস হলেন অন্যতম। কদর বখসের তিন পুত্র যথাক্রমে হসু খাঁ, হদ্দু খাঁ ও নথু খাঁ ছিলেন এই ঘরানার সুবিখ্যাত সংগীতশিল্পী।

Pandit Vishnu Digambar Paluskar

সংগীতজ্ঞ হসু খাঁ সাহেবের শিষ্যপরম্পরায় গুলে ইমাম, মেহেদি হুসেন, বালকৃষ্ণ বুয়া, বাবা দীক্ষিত, বাসুদেব যোশি প্রমুখ খ্যাতিমান শিল্পী গোয়ালিয়র-ঘরানার ঐতিহ্যকে সমুজ্জ্বল করে তোলেন। সংগীতগুরু বালকৃষ্ণ বুয়ার অন্যতম শিষ্য পণ্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পালুসকার সংগীতাকাশের উজ্জ্বল তারকা হিসেবে প্রতীয়মান। পণ্ডিতজির খ্যাতনামা শিষ্যদের মধ্যে বি এ কুশলকার, পণ্ডিত ওংকারনাথ ঠাকুর, পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন প্রমুখ সংগীতগুণীজন গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতশৈলীর প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

সংগীতজ্ঞ হদ্দু খাঁ সাহেবের পুত্র রহমত খাঁ ও মুহম্মদ খাঁ ছিলেন এই ঘরানার বিখ্যাত গায়ক। হদ্দু খাঁর জামাতা ওস্তাদ ইনায়েত খাঁ এবং তাঁর জামাতা ও শিষ্য রামপুরের মুস্তাক হোসেন কলাবন্ত হিসেবে যারপরনাই খ্যাতি লাভ করেন। ওস্তাদ মুস্তাক হোসেন বহু শিষ্য তৈরি করেন এবং গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতধারায় শিষ্যদের তালিম প্রদান করেন। হদ্দু খাঁ সাহেবের অপর শিষ্য ইমদাদ হোসেন এবং তাঁর পুত্র ও শিষ্য ওয়াজিদ হোসেন গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতশৈলী রপ্ত করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। এই ধারায় সংগীত পরিবেশন করে তিনি ভূয়সী প্রশংসা ও ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এলাহাবাদ নিবাসী হন এবং গোয়ালিয়র-ঘরানার সংগীতশৈলী শিষ্যদের মাঝে বিলাতে থাকেন।

সংগীতজ্ঞ নথু খাঁ সাহেবের প্রধান শিষ্য ছিলেন তাঁর দত্তক পুত্র নিসার হুসেন খাঁ। তাঁর প্রধান শিষ্য শংকর পণ্ডিত এবং শংকর পণ্ডিতের প্রধান শিষ্য ছিলেন কৃষ্ণরাও পণ্ডিত। এই সংগীতগুণীজনেরা বিদগ্ধ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ নখন পীর বখস প্রবর্তিত গোয়ালিয়র ঘরানার সংগীতশৈলীকে শীর্ষচূড়ায় প্রতিষ্ঠিত করে হয়ে আছেন খ্যাতিমান ও চির অম্লান।

গোয়ালিয়র ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Gwalior gharana ] :

  • আ-কারন্ত আলাপ
  • উদাত্ত কণ্ঠস্বর অর্থাৎ খোলা আওয়াজের প্রয়োগ
  • লয়কারী ও সপাট তানের দক্ষতা
  • স্বরবিস্তারে কুশলতা
  • বৈচিত্র্যমান বোলতান

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

গয়া ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

গয়া ঘরানা [ Goya Gharana ] : খেয়াল গান ও এস্রাজ বাদনধারায় নিজস্ব ঢং বা সংগীতশৈলী প্রয়োগের মাধ্যমে উনিশ শতকের মধ্যভাগে শিল্পী হরি সিং এবং তাঁর পুত্র হনুমান দাস সিং প্রবর্তন করেন ‘গয়া ঘরানা’। এ শতকেরই শেষভাগে বিদগ্ধ সংগীতসাধক পিতা-পুত্রের একনিষ্ঠ ভক্ত ও শিষ্য এবং গয়া-ঘরানার ধারক ও বাহক কানাইলাল ঢেঁড়ির মাধ্যমে বাংলায় এই সংগীতশৈলী প্রচারিত হয়।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সংগীতগুরু হরি সিং ও হনুমান দাস সিংয়ের কাছে এস্রাজ বাদ্যযন্ত্রে তালিম গ্রহণ করে কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে অসাধারণ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন কানাইলাল ঢেঁড়ি। তিনি কলকাতার অমৃতলাল দত্ত, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরুণেন্দ্রনাথ প্রমুখ গুণীজনকে এই ঘরানার সংগীতশৈলী ও সমৃদ্ধ এস্রাজ বাদনের তালিম প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে সংগীতগুরু হনুমান দাস সিংয়ের পুত্র মোহন দাসের প্রচেষ্টায় গয়া-ঘরানায় ঠুংরি ও হারমোনিয়াম বাদন সংযোজিত হয়।

গয়া ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Specility of Goya Gharana ] :

  • খেয়াল গানের চমৎকার বন্দিশ
  • সুর মাধুর্যপূর্ণ সুস্পষ্ট বাণী এবং
  • এসাজে খেয়াল অঙ্গে জোড়, তান ও ঝালা সহযোগে বাদন

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

খুরজা ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

খুরজা ঘরানা [ Khurja Gharana ]: অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে তৎকালীন খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ যোধে খাঁ খুরজাতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর প্রবর্তিত সংগীতশৈলী ‘খুরজা ঘরানা’ নামে সমৃদ্ধি লাভ করে। ওস্তাদ যোধে খা সাহেবের পুত্র ওস্তাদ ইমাম খাঁ এবং নাতি ওস্তাদ গুলাম হোসেন খাঁর চৌকস ও নন্দিত গায়কির নৈপুণ্যে খুরজা ঘরানা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

ওস্তাদ আসলাম খান

ওস্তাদ গুলাম হোসেন খাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জহুর খাঁ এবং কনিষ্ঠ পুত্র গুলাম হায়দার খাঁ ওরফে মুন্সি গফুর বখস কুশলী সেতারশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ওস্তাদ জহুর খাঁ সাহেবের পুত্র ওস্তাদ আল্লাফ হোসেন খাঁ খুরজা-ঘরানার সুবিখ্যাত গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

তাঁর পুত্রদের মধ্যে শিল্পী মুহম্মদ ওয়াহিদ খাঁ এবং শিল্পী আহম্মদ খাঁ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এই ভ্রাতৃদ্বয় ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যান। পরবর্তীকালে তাঁরা সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন এবং খুরজা-ঘরানার প্রচার ও প্রসারে ব্রতী হন। বংশপরম্পরায় খুরজা-ঘরানার মূলধারা এগিয়ে গেলেও ওস্তাদ মুহম্মদ ওয়াহিদ খাঁ এবং ওস্তাদ আহম্মদ খাঁ সাহেবের মাধ্যমেও বহু শিষ্য ও প্রশিষ্য সৃষ্টি হয়। পূর্বপুরুষদের চলমান প্রবাহে এই ঘরানার সংগীতশৈলী এখনো স্বমহিমায় বহমান রয়েছে।

খুরজা ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Khurja Gharana ]:

  • অসাধারণ নৈপুণ্যে তান প্রয়োগ
  • রাগের প্রাণসঞ্চারে বিশেষ কুশলতা
  • তিন সপ্তকেই সহজ গমনাগমন
  • কাওয়ালির ঢঙের সুদক্ষ প্রয়োগ
  • উদাত্ত কণ্ঠস্বর

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

কিরানা ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা

কিরানা ঘরানা [ Kirana Gharana ] : বিখ্যাত বীণাশিল্পী ওস্তাদ বন্দে আলী খাঁ হলেন ‘কিরানা ঘরানা’র প্রবর্তক। ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তাঁর জন্ম হয় বলে অনেক সংগীতগুণীজন মনে করেন। এই ঘরানাকে সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় করে তোলেন খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ এবং ওস্তাদ আব্দুল বদিদ খাঁ। কিরানা ঘরানার অন্যতম শিল্পী ছিলেন ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ সাহেবের তিন খ্যাতিমান সহোদর আব্দুল হক, আব্দুল গনি ও আব্দুল মজিদ খাঁ। ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁর শিষ্য সওয়াই গন্ধর্ভ ও সুরেশ বাবু এই ঘরানার গায়ক হিসেবে অসামান্য সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ওস্তাদ আব্দুল করিম খান [ Ustad Abdul Karim Khan ]
এই ঘরানার শিল্পীবৃন্দের স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ গায়নশৈলীতে রাগরূপ প্রকাশে বিশেষ দক্ষতা পরিস্ফুটিত হয়। আলাপ প্রক্রিয়ায় এক একটি স্বর নিয়ে শিল্পীবৃন্দ রাগের ভাবরূপটি অত্যন্ত চমৎকারিত্বের সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন। কিরানা ঘরানার ধারক ও বাহক গুণীজনদের মধ্যে ওস্তাদ রজ্জব আলী খাঁ, ওস্তাদ আমির খা, ওস্তাদ ওয়াহেদ খাঁ, বহরে বুয়া, ভীমসেন যোশি, শ্রীমতি হীরা বাঈ বরোদকার, শ্রীমতি গাঙ্গু বাঈ হাঙ্গল, রোশনারা বেগম, শ্রীমতি সরস্বতী বাঈ রানে প্রমুখ সংগীতকুশলী বিশেষ নৈপুণ্যের মধ্য দিয়ে এর ঐতিহ্য রক্ষা করেছেন।

কিরানা ঘরানার বৈশিষ্ট্য [ Speciality of Kirana Gharana ] :

  • রাগ-রূপ বিস্তারে অসামান্য দক্ষতা ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঠুংরি গায়ন
  • মনোরঞ্জক ‘সরগ’-এর প্রয়োগ
  • রাগের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা তথা প্রাণসঞ্চারে বিশেষ প্রবণতা
  • সুষম লয় ও পরিচ্ছন্ন বিস্তার
  • তিন সপ্তকেই সহজ যাতায়াত।

 

আরও দেখুন:
গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা [ সঙ্গীতের ঘরানা ] Vocal Gharana of Music

Music School of GOLN

Exit mobile version