খেয়াল বা খেয়াল গান – সঙ্গীত শৈলী [ Kheyal, Music Genre ]

খেয়াল বা খেয়াল গান - সঙ্গীত শৈলী [ Kheyal, Music Genre ]

খেয়াল বা খেয়াল গান – সঙ্গীত শৈলী [ Kheyal, Music Genre ] ফারসি ভাষা ‘খ্যাল’ থেকে উদ্ভূত খেয়াল [ Kheyal ] শব্দের অর্থ হচ্ছে বিচার বা কল্পনা। সাংগীতিক পরিভাষায় খেয়াল হচ্ছে একধরনের শাস্ত্রীয় সংগীত যাকে উচ্চাঙ্গ বা রাগসংগীতও বলা হয়ে থাকে। নানাবিধ তান, বোলতান, আলাপ, বিস্তার, গায়কি, বো-বাঁট, সারগাম, তেহাই ইত্যাদি সহযোগে বিভিন্ন তালে আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করে রাগ গাওয়া হলে তাকে বলে খ্যয়াল বা খেয়াল। এর উৎপত্তি সম্পর্কে নানাবিধ মতবাদ প্রচলিত থাকলেও মূলত কাওয়ালি গান থেকেই খেয়াল গানের সৃষ্টি হয়েছে।

মুসলিম রাজত্বকালে পাঠান বংশোদ্ভূত দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির (১২৯৬-১৩১৬) রাজদরবারের উচ্চ পর্যায়ের সভাসদ ছিলেন সংগীতজ্ঞ হজরত আমির খসরু ওরফে আবুল হাসান। তিনি নিজ আবিষ্কৃত কাওয়ালি গানের সংস্কার করেন। অতঃপর নানাবিধ গবেষণা, সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে সংস্কারকৃত সেই কাওয়ালি গানে একটি প্রথাসিদ্ধ রূপদানের মাধ্যমে খেয়াল গানের উদ্ভব করেন।

এই গানের বিষয়বস্তু প্রধানত শৃঙ্গার রসাত্মক হলেও গানে ভক্তিরসের প্রাধান্যও পরিলক্ষিত হয় এবং সংগীতের শিল্প সৌন্দর্যের মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটে। হিন্দি, উর্দু পাঞ্জাবি এই তিন ভাষায় খেয়াল গান রচিত হলেও অনেক সময় একই গানে হিন্দি উর্দু উভয় ভাষারই সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। গাম্ভীর্য কম বলে খেয়াল গানের সঙ্গে তবলা-বাঁয়া সংগত করা হয়ে থাকে।

এই গানে একতাল, ত্রিতাল, আড়া চৌতাল, ঝুমরা ইত্যাদি তালের ব্যবহার বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। খেয়াল গান দুই প্রকারের হয়ে থাকে, যথা – দ্রুত বা ছোট খেয়াল এবং বিলম্বিত বা বড় খেয়াল।

খেয়াল বা খেয়াল গান – সঙ্গীত শৈলী [ Kheyal, Music Genre ]

 

খেয়াল পরিবেশন : Indian Classical Music Performance Sawai, Author -Tinkubasu, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 4.0 International license.
খেয়াল পরিবেশন

দ্রুত বা ছোট খেয়াল :

খেয়াল গানের আবিষ্কারক হজরত আমির খসরু ওরফে আবুল হাসান কাওয়ালি গানের সংস্কার করে উপহার দেন দ্রুত বা ছোট খেয়াল এর দুটি বিভাগ যথাক্রমে স্থায়ী এবং অন্তরা। প্রতিটি বিভাগে দুটি বা তিনটি করে চরণ থাকে। ছোট খেয়াল চপল গতির বলে এর ভাষা সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে।

এ গানের বন্দিশ সাধারণত ত্রিতাল, ত্রিমাত্রিক একতাল ঝাঁপতালে বাঁধা হয়। ছোট খেয়ালে বিস্তার করার সুযোগ নেই। প্রথমে মধ্যলয়ে এবং তারপর দ্রুতলয়ে গেয়ে ছোট খেয়াল পরিবেশন করা হয়। রাগের শুদ্ধতা বজায় রেখে স্বাধীনভাবে শিল্পী গিটকিরি, কণ, তান, বোলতান, সরগম ইত্যাদি অলংকরণে দ্রুতলয়ে গেয়ে থাকেন। এই গানে শৃঙ্গার ছাড়া অন্য রসেরও প্রাধান্য ঘটে এবং কিছু হালকা রাগ ছাড়া প্রায় সব রাগেই দ্রুত বা ছোট খেয়াল শুনতে পাওয়া যায়।

বিলম্বিত বা বড় খেয়াল :

বিলম্বিত বা বড় খেয়াল পঞ্চদশ শতাব্দীতে জৈনপুরের সুলতান হুসেন শাহ শর্কি কলাবন্ত খেয়াল প্রবর্তন করেন, যা বিলম্বিত বা বড় খেয়াল বলে সুপরিচিত। এই খেয়ালেরও স্থায়ী এবং অন্তরা নামে দুটি তুক বা বিভাগ বিদ্যমান। বিলম্বিত বা বড় খেয়ালের গতি-প্রকৃতি ধীরস্থির ও গম্ভীর হয়ে থাকে। এতে শৃঙ্গার রস ছাড়াও ভিন্ন প্রকৃতির আরো বহুবিধ রসের আবির্ভাব ঘটে।

বড় খেয়ালে বিলম্বিত লয়ে বিশেষ রীতিতে আলাপ করা হয়, যাকে বলে বিস্তার। গানের সঙ্গে আ-কার কিংবা গানের বাণী সহযোগে ধীর মন্থর গতিতে বিস্তার করা হয়। এর এবং ‘অন্তরা’ উভয় ভাগেই বিস্তার হবার পর চারগুণ ও আটগুণ লয়ে অধিকাংশ তান হয়। অবশ্য কোনো কোনো সময় বড় খেয়ালে অতিরিক্ত আরো দুটি বিভাগ ‘সঞ্চারী’ ও ‘আভোগ’ পরিলক্ষিত হলেও চারটি বিভাগের খেয়াল গানের সংখ্যা খুবই কম।

বড় খেয়ালের স্বরবিস্তারের প্রক্রিয়াটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হওয়ায় গানের মাধ্যমে শিল্পী রাগের ভাবরূপসহ নিজ শিল্পীসত্তাকে প্রস্ফুটিত করে তোলেন। স্বরবিস্তারের শৈলীর মাধ্যমেই শিল্পী কোন ঘরানার অনুসারী তা সংগীতরসিক শ্রোতারা বুঝতে পারেন। এতে বিভিন্ন প্রকারের মিড়, গমক, তান, বোলতান ইত্যাদি অলংকরণ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

গম্ভীর চলনের বিলম্বিত বা বড় খেয়ালে কণ বা স্পর্শস্বরের ব্যবহার গানের সৌন্দর্যকে আরো বেশি বৃদ্ধি করে। হালকা অঙ্গের রাগ ছাড়া অন্য সব রাগেই বড় খেয়াল গাওয়া হয়। এই গানে তবলা-বাঁয়া সহযোগে বিলম্বিত একতাল, আড়া চৌতাল, তিলোয়াড়া, ঝুমরা ইত্যাদি তালের সংগত প্রচলিত রয়েছে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে সর্বশেষ মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ রঙ্গিলের রাজদরবারের অন্যতম সভারত্ন এবং তৎকালীন স্বনামখ্যাত খেয়ালগায়ক ও বীণাশিল্পী ওস্তাদ নিয়ামত খাঁ (সদারঙ্গ) অজস্র খেয়াল গান রচনা করেন। এতে বিভিন্ন প্রকারের মিড়, গমক, তান, বোলতান, কণসহ বিভিন্ন অলংকারাদি প্রয়োগ করে তিনি নতুন ও আকর্ষণীয় রূপে খেয়াল গানের প্রচলন করেন।

শিষ্যদের তিনি যে খেয়ালরীতি শিক্ষা দেন, পরবর্তীকালে শিষ্যপরম্পরায় তাই প্রচার এবং প্রসার লাভ করে। যথাযথ তালে ও সঠিক নিয়মানুযায়ী পরিবেশন করতে পারলে খেয়াল গান শ্রোতা-দর্শক হৃদয়ে অপূর্ব আনন্দের সঞ্চার করে। পিতার পথ অনুসরণ করে ওস্তাদ ফিরোজ খাঁ ওরফে অদারঙ্গ খেয়াল গানের উন্নতিতে অসামান্য অবদান রাখেন।

বর্তমানে বেশিরভাগ খেয়ালশিল্পী প্রথমে বিলম্বিত এবং পরে ছোট খেয়াল পরিবেশন করে থাকেন। খেয়াল গানের বিষয়বস্তু হিসেবে প্রেম, প্রকৃতি ও ভক্তি (ঈশ্বরের স্তুতি) এই তিনটি বিষয়ের প্রাধান্য রয়েছে। তবে বেশিরভাগ রচনাতেই প্রেমের প্রাবল্য অধিক পরিলক্ষিত হয়। তাই সংগীতজগতে খেয়াল অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অধিক প্রচলিত একটি গীতধারা। শাস্ত্রীয় সংগীতের শাখাগুলোর মধ্যে খেয়াল গানই এখন সব থেকে এগিয়ে রয়েছে।

খেয়াল গানের বৈশিষ্ট্য :

• আ-কার, ই-কার, উ-কার ইত্যাদি সহযোগে খেয়াল আরম্ভের পূর্বে তালছাড়া এবং আরম্ভের পরে তালযুক্ত আলাপ (এ সময় শিল্পীর স্বকীয়তা, বিচক্ষণতা ও সৃজনীশক্তির উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। ফলে অধিক সময় আলাপ করলেও একঘেয়েমি লাগে না)।

• সরগম, বোলতান, তেহাই এবং তার পূর্বে গানের বাণী সহযোগে নতুনত্ব আনয়ন।

• রাগের ভাব ও রসের গভীরতা।

• ধ্রুপদ অপেক্ষা শব্দবিন্যাস কম।

সংগীতভুবনের সর্বকালের উজ্জ্বল নক্ষত্র ওস্তাদ নিয়ামত খা ওরফে সদারঙ্গ রচিত প্রচলিত একটি খেয়াল গান উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো –

১৩                              +

এরি মেরি পিয়া নাহি আয়া

উনা বিনা মোরা জীয়া ঘাবড়ায়ে ॥

১৩

যা যারে কাগাতু যা সদারঙ্গ

পিয়াকো লায়ে বুলায়ে ॥

[ ঠাট : খাম্বাজ, রাগ দেশ, বাদীস্বর : প/র, সমবাদীস্বর : র/প, অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ, জাতি : উড়ব-সম্পূর্ণ, গায়ন সময় রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর, তাল: ত্রিতাল (১৬ মাত্রা), আরোহণ: স র ম প ন র্স, অবরোহণ: স ন ধ প ম গ র স।]

ওস্তাদ আমির খানের বেহাগের খেয়াল:

খেয়াল বা খেয়াল গান - সঙ্গীত শৈলী [ Kheyal, Music Genre ] - খেয়াল বা খেয়াল গান - কী?
খেয়াল বা খেয়াল গান – কী?

খেয়াল [ Kheyal ] গান সম্পর্কে আরও পড়ুন:

অন্যান্য সঙ্গীতের ধারা সম্পর্কে জানতে:

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।