কবিগানের সঙ্গীত শৈলী [Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan, Music Genre ] সূচি

কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি - স্বরোচিষ সরকার

কবিগানের সঙ্গীত শৈলী ,কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি [ Definition & Nature of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]  নিয়ে এই আর্টিকেলটি উন্নয়ন করা হয়েছে। সূচি ছাড়াও কিছু বিষয়ের বিস্তারিত এই আর্টিকেলে পাবেন। বাকি বিষয়গুলোর লিংক আর্টিকেলের মধ্যে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

কবিগানের সঙ্গীত শৈলী [Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan, Music Genre ] সূচি

Table of Contents

কবিগানের সঙ্গীত শৈলী – কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি [ Definition & Nature of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

কবিগান বা কবি গান – সঙ্গীত শৈলীর সূচনা :

একাধিক শতাব্দী বিস্তৃত যে কোনো শিল্পমাধ্যমের স্বরূপ ও প্রকৃতি অভিন্ন হবে, এমন প্রত্যাশা করা যায় না। এক্ষেত্রে তা অধিকতর সত্য। একই কারণে উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কবিগানের যে রূপের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটান, একুশ শতকের সূচনায় প্রচলিত কবিগান তার চেয়ে অনেক দিক দিয়ে আলাদা হয়ে যায়। কোনো কোনো বৈশিষ্ট্যে এই দুই কালপর্বের কবিগানকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের শিল্পমাধ্যম বলেও মনে হতে পারে।

তবে গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করলে বোঝা যায় যে, একাধিক শতাব্দী ধরে প্রচলিত এই গানের সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য সব সময়ে মোটামুটি এক রকম। স্থানকালভেদে এর মধ্যকার কোনো কোনো বৈশিষ্ট্য কখনো প্রধান হয়ে ওঠে, আবার কখনো গৌণ হয়ে যায়। প্রধানত এইসব বৈশিষ্ট্যের উপরে ভিত্তি করে বর্তমান অধ্যায়ে কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি স্পষ্ট করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

কবিগানের সঙ্গীত শৈলী [Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan, Music Genre ] সূচি

 

কবিগানের সংজ্ঞা [ Definition of Kabigan ] :

এ গানের এমন এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক গান, যা তাৎক্ষণিকভাবে রচিত ছড়া ও গানের মাধ্যমে দুই দল গায়ককে প্রথমে পালাক্রমে এবং শেষে সম্মিলিতভাবে পরিবেশন করতে হয়। এ গানের একটি জনপ্রিয় প্রতিশব্দ ‘কবির লড়াই’। দলের দলপতিকে বলে সরকার বা কবিয়াল। দলের সঙ্গীত-সহযোগীদের নাম দোহার। দলের যন্ত্রসঙ্গতকারীদের মধ্যে ঢুলি প্রধান অন্যান্য যন্ত্রসঙ্গতকারীদের মধ্যে রয়েছে কাঁসিবাদক, বাঁশিবাদক, বেহালাবাদক, দোতারাবাদক, হারমোনিয়ম-বাদক প্রমুখ।

কমবেশি দশ জন সদস্য নিয়ে এক একটি দল গঠিত হয়। বিভিন্ন অনুষঙ্গ বিবেচনা করে মনে হয়, বিশ শতকের প্রথম দিকে এ গানের  বাংলাভাষী প্রায় সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং কবিগানের একটি সর্ববঙ্গীয় রূপ গড়ে ওঠে। সেই রূপের সঙ্গে পূর্ববর্তী শতাব্দীর রূপের সঙ্গে যেমন, তেমনি পরবর্তী কালের রূপের নানা রকম তফাত তৈরি হয়।

বিশেষভাবে যা লক্ষণীয়, তা হলো, এই সর্ববঙ্গীয় কালপর্বে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কালের কবিগানের প্রায় সকল অঙ্গই অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কবিগানের সংজ্ঞা প্রদান অংশে বিশ শতকের প্রথম দিকে পরিবেশিত কবিগানকে আদর্শ গণ্য করা হলো—তাতে পূর্ববর্তী কালের কবিগান বুঝতে সুবিধা হবে; আবার একুশ শতকের কবিগান বুঝতেও অসুবিধা হবে না।

কবিগান  বা কবি গান - সঙ্গীত শৈলী [Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan, Music Genre ]
কবিগান – সুন্দরবন কৃষ্টি মেলা ও লোক সংস্কৃতি উৎসব

কবিগানের বিভাগ [ Part of Kabigan ] :

আলোচ্য কালপর্বের কবিগানকে মোটামুটি চারটি ভাগে ভাগ করে বর্ণনা করা যায়।

প্রথম ভাগে থাকে প্রতিযোগিতাহীন গান যার মধ্যে রয়েছে বন্দনা জাতীয় ডাক, মালশি, ভবানীবিষয়, আগমনী, গৌরবন্দনা, দেশবন্দনা প্রভৃতি নামের গান, এবং কালনির্দেশক ভোর, গোষ্ঠ প্রভৃতি নামের গান।

দ্বিতীয় ভাগে থাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা। যার মধ্যে রয়েছে সখীসংবাদ, বিরহ, বসন্ত, কবি বা লহর কবি প্রভৃতি শ্রেণির গান। এই দ্বিতীয় ভাগের গানের অভ্যন্তরে প্রশ্ন থাকে, তাৎক্ষণিকভাবে সেইসব প্রশ্নের জবাব রচনা করে প্রতিপক্ষকে তা পরিবেশন করতে হয়।

তৃতীয় ভাগে থাকে মূল পর্ব—এই পর্বে টপ্পা জাতীয় গানের মধ্য দিয়ে দ্বন্দ্ব্বপূর্ণ কাল্পনিক চরিত্রে কবিয়ালদ্বয় নিজেদের আরোপিত করান এবং ধুয়া গান ও ছড়া কাটা পাঁচালির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তাঁরা প্রশ্নোত্তর বা বতর্ক চালিয়ে যান।

সবশেষ ভাগটি হলো বিরোধ মিলনাত্মক জোটের পাল্লা, জোটক বা মিলনগীতি—এই অংশে কবিয়ালদ্বয় সামনা সামনি দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট গানের সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ছড়া কাটার মাধ্যমে প্রশ্নোত্তর ও বিতর্ক চালিয়ে যান ।

প্রথমে একটি দল আসরে দাঁড়িয়ে আসর-বন্দনা রূপে পূর্বরচিত একটি ‘ডাক’ বা সমজাতীয় গান দিয়ে কবিগানের সূচনা করে। এ সময়ে সাধারণত একাধিক দোহার আসরে দাঁড়ান এবং দোহারগণ কমপক্ষে একবার করে প্রত্যেকে প্রতিটি কলি গেয়ে থাকেন। প্রায় ক্ষেত্রেই এইসব ডাক গান দোহারদের মুখস্থ থাকে। তাই ডাক গান গাওয়ার সময়ে কবিয়ালকে আসরে না দাঁড়ালে চলে। তবে ডাক গানটি দোহারদের মুখস্থ না থাকলে অথবা একেবারেই নতুন গান হলে কবিয়াল আসরে উঠে পর্যায়ক্রমে দোহারদের পেছনে দাঁড়িয়ে গানের কথা বলে দেন এবং দোহারগণ তাতে সুরসংযোগ করে পরিবেশন করেন।

১৯৭৮ ডাক গান পরিবেশনের পর প্রায় একই নিয়মে একটি মালশি গান পরিবেশন করা হয়। মালশি গানগুলো ডাক গানের চেয়ে দীর্ঘতর হয়। এই গান পরিবেশনের সময়ে কবিয়ালকে দোহারদের পেছনে দাঁড়াতে হয় এবং গানের কলি বলে দিতে হয়। পূর্বনির্ধারিত সুরে দোহারগণ তা পরিবেশন করেন। তাছাড়া কলিগুলো উচ্চারণের ঝোঁক ও ভঙ্গি থেকে দোহারগণ সংশ্লিষ্ট কলির সুর বুঝে নেন।

প্রথম দলের ডাক গান ও মালশি গান গাওয়া শেষ হওয়ার পরে দ্বিতীয় দল আসরে আসে এবং একইভাবে প্রথমে একটি ডাক গান এবং পরে একটি মালশি গান পরিবেশন করে। কোনো কোনো অঞ্চলে ডাক ও মালশি গান গাওয়ার পর কালনির্দেশক ভোর, গোষ্ঠ প্রভৃতি নামের গান পরিবেশিত হয়। মালশি গানের মতো এগুলো প্রশ্নোত্তরমূলক নয়। তাই প্রথম দল এ ধরনের গান পরিবেশন করলে দ্বিতীয় দলকে প্রায় অনুরূপ গান পরিবেশন না করলেও চলে।

এই ভাগ শেষ হতে না হতেই কবিগানের প্রতিযোগিতামূলক মূল ভাগ শুরু হয়। প্রথম দলের কবিয়াল প্রথমে দোহারদের মাধ্যমে রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক সখীসংবাদ পর্যায়ের একটি চাপান গান পরিবেশন করেন। এই গানের কথাবস্তু এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যাতে রাধা অথবা কৃষ্ণ সখীদের প্রতি অথবা বিপরীতভাবে সখীরা রাধা বা কৃষ্ণের প্রতি অভিযোগ বা প্রশ্ন করে। দ্বিতীয় দলের কবিয়ালকে এইসব অভিযোগ বা প্রশ্নের জবাব সংবলিত কথাবস্তু দিয়ে গান রচনা করে পরের আসরে পরিবেশন করতে হয়।

দ্বিতীয় কবিয়াল সখীসংবাদের জবাব পরিবেশন করার পরে সাধারণত প্রথম কবিয়ালের উদ্দেশে আর একটি চাপান গান পরিবেশন করে থাকেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের এই চাপান গানের নাম ‘কবি’ বা ‘লহর কবি’, যা পৌরাণিক থেকে শুরু করে সমকালীন যে কোনো দ্বন্দ্বপূর্ণ বিষয়ে রচিত হয়ে থাকে। পরবর্তী আসরে প্রথম কবিয়ালকে এই গানের জবাব-গান পরিবেশন করতে হয়।

সখীসংবাদ ও কবি নামক গান পরিবেশনের পরে শুরু হয় কবির টপ্পা ও পাঁচালি ভাগ। প্রথম কবিয়াল ‘কবি’ গানের জবাব-গান শেষ করার পরপরই একটি টপ্পা গান পরিবেশন করেন। এই টপ্পা গানের মাধ্যমে কবিয়াল কোনো একটি চরিত্রে নিজেকে এবং দ্বিতীয় কবিয়ালকে তাঁর বিপরীতধর্মী একটি চরিত্রে আরোপ করান।

টপ্পা গানের শেষ অংশে থাকে দ্বিতীয় কবিয়ালের প্রতি এক বা একাধিক প্রশ্ন। টপ্পা গানটি গাওয়া শেষ হওয়ামাত্র দোহারগণ আসরে বসে পড়েন। প্রথম কবিয়াল তখন একা দাঁড়িয়ে প্রথমে একটি ধুয়া বা ধুয়া গান পরিবেশন করেন। পরে ধুয়ার সুরে বা ধুয়া গানের চিতানের সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ছড়ার আকারে প্রথমে আসর-বন্দনা করেন এবং পরে টপ্পায় উপস্থাপিত বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে চেষ্টা করেন। এই জাতীয় ছড়াকাটার নাম পাঁচালি

পাঁচালির মধ্যে আরো এক বা একাধিক ধুয়া গান গেয়ে ছড়ার ছন্দের পরিবর্তন করে উপস্থাপনার সুরে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করা হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুর যাই হোক না কেন, পয়ার, ত্রিপদী ও চৌপদীই হয় পাঁচালির ছন্দবন্ধ। প্রথম কবিয়ালের আসর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় কবিয়াল আসরে দাঁড়িয়ে প্রায় অভিন্নভাবে টপ্পা পরিবেশন করেন। টপ্পা শেষ করে তিনিও পূর্ববর্তী কবিয়ালের মতো একটি ধুয়া গান গেয়ে পাঁচালির মধ্যে প্রবেশ করেন।

পাঁচালির মাধ্যমেই তিনি পূর্ববর্তী কবিয়ালের প্রশ্নের জবাব দেন, ভিন্নমত থাকলে তা ব্যক্ত করেন, নতুন বিতর্কের অবতারণা করেন, আবার কখনো নতুন প্রশ্নের মাধ্যমে প্রথম কবিয়ালকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একাধিক আসরে পাঁচালি অংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারের আসরে পুনরায় কোনো টপ্পার দরকার হয় না। কবিয়ালদ্বয় আসরে এসেই ধুয়া বা ধুয়া গানের সুরে পাঁচালি চালিয়ে যেতে থাকেন।

কবিয়ালদের এই আসা যাওয়ার এক পর্যায়ে যখন গান শেষ করার তাগিদ আসে, তখন যে কবিয়াল আসরে থাকেন তাঁকেই জোটের পাল্লা নামক অন্ত্য ভাগের সূচনা করতে হয়। সাধারণত একটি ধুয়া বা ধুয়া গান দিয়ে জোটের পাল্লা অংশ সূচিত হয়ে থাকে। ধুয়ার কলি বা কোনো ধুয়া গানের একটি চিতান (স্থায়ী) গাওয়া শেষ হতে না হতেই উভয় কবিয়াল আসরে দাঁড়িয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হন। এক্ষেত্রে প্রথম জন নির্দিষ্ট সুর-তালের পাঁচালির মাধ্যমে দ্বিতীয় সরকারকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, দ্বিতীয় জন একইভাবে প্রথম জনের প্রশ্নের জবাব দেন এবং/অথবা পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।

এই পর্যায়ে প্রশ্নোত্তর ও ছড়াকাটার লয় ক্রমে দ্রুততর হতে থাকে এবং অবশেষে কবিগানের সমাপ্তি ঘটে। এই পর্যায়বিন্যাসে উল্লেখ করা এ গানের অঙ্গসমূহের (ডাক-মালশি থেকে জোটের পাল্লা পর্যন্ত) পরিচয় দান করা দরকার, তাতে এ গানের সামগ্রিকতা সম্পর্কে ধারণা স্পষ্টতা পাবে। এই বিবেচনায় প্রাসঙ্গিক অঙ্গসমূহকে একে একে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলো।

কবিগানের সঙ্গীত শৈলী [Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan, Music Genre ] সূচি

ডাক গান [ বা কবিগানের সূচনা সঙ্গীত ] Daak Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan

ডাক গান [ Daak Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] : কবিগানের সূচনা-সঙ্গীত হলো ডাক গান। এই গান কোথাও কোথাও ডাকসুর, বন্দনা, ও নান্দী নামে পরিচিত। বিশ শতকের সূচনায় কবিগান সাধারণত গভীর রাত বা ভোর রাতে শুরু হতো। ডাক গানের উচ্চ সুর বাদ্যযন্ত্রের ঐকতানের সঙ্গে মিলে যে উচ্চরব সৃষ্টি করে, কবিগানের আসরে তা শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে।

এভাবে ডেকে আনার কাজ করার মধ্য দিয়ে ডাক গান তার নামকরণের সার্থকতা পায়। ডাক গান সাধারণত চিতান এবং অন্তরা—এই দুই তুক দিয়ে তৈরি। কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে ‘অন্তরা’ নামের তুক ‘ঝুমুর’ নামে এবং বাগেরহাট অঞ্চলে ‘অন্তরা’ নামের তুক ‘চালক’ নামেও চিহ্নিত হয়ে থাকে। প্রতিটি তুকে যে কয়টি চরণ থাকে, তার প্রতিটির শেষ ধ্বনিতে মিল থাকে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ গানটির অন্ত্যমিল দুই ধরনের একজাতীয় মিল চিতানের চরণগুলির শেষের মিল, আর একজাতীয় মিল অন্তরার প্রতিটি চরণের শেষের মিল।

উনিশ শতকের দিকে এই গানগুলো স্বল্পপরিসর ছিলো, বিশ শতক নাগাদ তা দীর্ঘতর হয়ে উঠতে থাকে।

যেমন উনিশ শতকে রচিত কলকাতার চিন্তামণি ময়রা রচিত এই ডাক গান টি:

জয়ন্তী মঙ্গলা জয়া তুমি গো যোগেশ্বরী যোগাদ্যে।

ত্রিতাপহারিণী ত্রিগুণধারিণী ত্রিদিবারাধ্যে ॥

তুমি তারা পরাৎপরা কঙ্কালী

কালরূপধরা অসীতে রূপধারিণী

তন্ত্রে মন্ত্রে অধিষ্ঠাত্রী শিবানী

বিশ্বজয়ী বিশ্বরূপ দৈত্যদল দুর্গারূপ (আবার)

কমলে কামিনী রূপ হও গো জননী’

এর সঙ্গে তুলনা করা যায় বিশ শতকে রচিত বাগেরহাটের কবিয়াল রাজেন্দ্রনাথ সরকারের এই ডাক গানটি:

বিভু তুমি সর্বাধার,

সাকার নিরাকার যিশু আল্লা বুদ্ধ হরি।

অনন্ত ভাবেতে ভাবিতে ভাবিতে জন্মিয়া যেন মরি।

আমি ক্ষুদ্র সংস্কারে গড়ায়ে আমারে সেই অনুতাপ করি ॥

তুমি অনাদির আদি অনস্ত উপাধি,

অনন্ত ব্যাধি অনস্ত ঔষধি অনন্ত নদী অনন্ত জলধি,

তাতে অনন্ত লহরি।

আমার প্রাণটি লও মিলায়ে অনন্ত নিলয়ে যেন সর্বত্রনেত্র তোমায় হেরি । তুমি শিবলিঙ্গ, শালগ্রামের প্রস্তর, অশ্বথ তুলসী বৃক্ষ রূপ ধরো। কালী কৃষ্ণ রবি ব্রহ্মা বিষ্ণু হর, তুমি গজানন গৌরী। তুমি সকল নামেতে সকল প্রেমেতে, শুধু বলবো কেন গৌরহরি ॥ চিন্ময় মৃন্ময় তুমি হিরণ্ময়, অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে তোমার জয় জয় জয়। তুমি অসীম সসীম এক অনন্ত সর্ব সমন্বয়। তুমি দেশকালপাত্রভেদে কোরান বাইবেল বেদে ধর্ম প্রচারিছ দয়াময়। তুমি সকলের সকল, আবার কারো কিছু নয় । তুমি জটিল কুটিল সরল, স্বর্গ-নরক, সুধা-গরল, এই যেন সদা মনে রয়। [ * সংকলিত, নিরঞ্জন অধিকারী, ঊনবিংশ শতাব্দীর কবিওয়ালা ও বাংলা সাহিত্য (কলকাতা: ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং, ১৯৫৮), পৃ. ২৮০। ]

ডাক গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার
ডাক গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

ডাক গানের সুর অনেক সময়ে রাগ-রাগিণী নির্ভর হয়। যেমন রাজেন্দ্রনাথ সরকার তাঁর গানগুলোকে ইমন-কল্যাণী, কল্যাণী, কামোদ, ঝিঁঝিট, ঝিঁঝিট খাম্বাজ, পঞ্চম, বিভাস, মালসী, লগনী প্রভৃতি রাগিণীতে পরিবেশন করতেন।

ডাক গানের তাল চিতান তুকের জন্য এক রকম এবং অন্তরা তুকের জন্য এক রকম। যেমন চিতান যদি আড়খেমটা তালে হয়, অন্তরা হয় কাহারবায়; চিতান যদি হয় কাশ্মীরি তালে, অন্তরা হয় ঠুংরি বা তেলেনায়; চিতান যদি কাওয়ালিতে হয়, অন্তরা হয় তেলেনায়; চিতান যদি কাহারবা বা মাস্টার আড়ায় হয়, অন্তরা হয় তেলেনায়; আবার চিতান যদি আড়খেমটা বা একতালায় হয়, অন্তরা হয় ঠুংরিতে বা কাওয়ালিতে। ‘ডাক’ শব্দের অর্থ আহ্বান। এই জাতীয় গানের কথাবস্তুতে আরাধ্যের প্রতি আহ্বানমূলক বা আবাহনমূলক বাক্য থাকে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে কালী অথবা দুর্গা এই গানের আরাধ্য। তবে বিশ শতকের সূচনায় অন্যান্য আরাধ্য দেবদেবীকে নিয়ে এবং কখনো কখনো ঈশ্বরকে নিয়েও ডাক গান রচিত হয়। উপরে উদ্ধৃত দ্বিতীয় ডাক গানটি এর উদাহরণ। [ ** ২ সংকলিত, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, হারামণি, ১০ম খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৪), পৃ. ২৪৬। ৩ রাজেন্দ্রনাথ সরকার তার ডাক গানগুলোর রাগ এবং তালের নাম নির্দেশ করতেন। দীনেশচন্দ্র সিংহ, পূর্ববঙ্গের কবিগান সংগ্রহ ও পর্যালোচনা (কলকাতা: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৭), পৃ. ২৫–৩৮ । ৪ নমুনা অংশে উদ্ধৃত গানগুলোর অধিকাংশই কালীবন্দনা বিষয়ক।

মালশি গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

ভোর – গোষ্ঠ গান [ Bhor or Gostho Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] :

ভোর - গোষ্ঠ গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার
ভোর – গোষ্ঠ গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

গোষ্ঠ গান গঠন ও উপস্থাপনগত দিক দিয়ে ভোর ও গোষ্ঠ নামাঙ্কিত গানগুলো মালশি গানের অনুরূপ। মালশি গানের মতো এগুলোও একতরফা গান। অর্থাৎ প্রথম পক্ষ এ ধরনের কোনো গান পরিবেশন করলেও দ্বিতীয় পক্ষকে তার পাল্টা গান গাওয়ার বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়তে হয় না। একমাত্র বিষয়বস্তুগত তফাত থাকার কারণে গানগুলো মালশি গানের থেকে আলাদা নামে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

মালশি গানের বিষয় যেমন শাক্ত, তেমনি ভোর ও গোষ্ঠ গানের বিষয় বৈষ্ণবীয় ভোর নামে পরিচিত গানগুলোতে সাধারণত রাধাকৃষ্ণের মিলন, বিরহ, বিলাপ প্রভৃতি প্রসঙ্গ স্থান পায়; অন্যদিকে গোষ্ঠ নামে পরিচিত গানগুলোতে সাধারণত রাখালদের সঙ্গে কৃষ্ণের গোচারণ এবং কৃষ্ণের প্রতি মা যশোদার স্নেহের বিষয় প্রাধান্য পায়। কোনো কোনো ভোর-গোষ্ঠ গান চৈতন্যদেব ও বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীকে নিয়ে, আবার কখনো তা রাম-লক্ষ্মণ-সীতাকে নিয়ে রচিত হয়ে থাকে।

বিশ শতকের একাধিক কবিয়াল পৌরাণিক প্রসঙ্গ ছেড়ে একেবারে সমকালীন বিষয় নিয়ে ভোর নামের গান পরিবেশন করেন। উদাহরণ হিসেবে নরসিংদীর হরিচরণ আচার্যের ‘স্বদেশি ভোর’ নামের গানটির কথা স্মরণ করা যায়। সঙ্গত কারণে সেখানে পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর বিরহ-মিলনের পরিবর্তে ব্রিটিশ বিরোধিতা ও দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা মুখ্য হয়ে ওঠে।

গানটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:

চিতান [ Chitan ] গেলো ভারতের তামসী নিশি দুঃখের শেষ সীমায়।

পাড়ন [ Paron ] ঘোর বিলাসী শশী, শশী মুখে মেখে মসী নিশি অন্তে অস্তাচলে যায় ।

১ম ফুকার [1st Phukar ] ঊষা ভক্তি নবশক্তি ভারতে উদিল, অসার আমোদ কুমুদ মুদিল ছুটল জ্ঞান সরোজের কি সুগন্ধ উঠল সূর্য সদানন্দ যতো ভারতের পাপ-পেচক মন্দ, অন্ধ হয়ে তারা লুকালো ॥

মিশ [ Mish ] তোমরা জন্মেছ স্বর্গতুল্য ভারতভূমে কুম্ভকর্ণের ন্যায় এতো ঘুমে বলো কতো রবে।

মুখ [ Mukh ] জাগো ভারতবাসী, স্মরণ করো আর্য ঋষি, কার্যক্ষেত্রে চলো সবে ॥

প্যাঁচ [ Patch ] ব্রাহ্ম মুহূর্তে ভ্রাতৃবর্গ শিখ ধ্যানের নিয়ম জপো অন্তরে মূল মন্ত্র—বন্দে মাতরম্ ফুল তুলে নানা জাতি জ্বালো ধূপ ও ঘৃতের বাতি ভারতমাতার মঙ্গল আরতি করো ভক্তিভাবে।

খোচ [ Khoch ] যতো কর্মী সব কর্ম করো ধর্ম লোভে ॥

২য় ফুকার [ 2nd Phukar ] পড়ো ছাত্রগণ সূত্র ব্যাকরণ, পড়ো স্মৃতি বেদ ছাড়ো অন্য বিদ্যা অসার ক্লেদ ছাড়ো এন্ট্রান্স এলএ বিএ এমএ, প্রণাম দাও গোলামির নামে। আছে গীতা ভাগবত ভারতভূমে, জ্যোতির্বেদের অঙ্গ আয়ুর্বেদ ॥

মিশ [ Mish ] কেন স্বদেশের উচ্চ শিক্ষা তুচ্ছ করো সংস্কৃত টোল অলকৃত করো অকৈতবে।

খোচ [ Khoch ] যতো কর্মী সব কর্ম করো ধর্ম লোভে ॥

অন্তরা [ Antora ] জাগো পৃথিবীর যতো কর্মবীর, স্থির করো নন-কোপারেশন। প্রাতঃস্নান করে দেশি বস্ত্র পরে পবিত্র করো অন্তঃকরণ। ভোরে পড়ো নিতাইগৌরাঙ্গচরিত কেমন ত্যাগ স্বীকার করে করলো দেশের হিত। যৌবনে যোগিনী বিষ্ণুপ্রিয়া ধনী স্মরো সেসব কুললক্ষ্মীগণ ॥

পরচিতান [ Parchitan ] ছাড়ো অলসতা বিলাসিতা উঠো ভ্রাতৃগণ ।

পরপাড়ন [ Parparon ] মাতৃস্নেহ পাবে কর্ম করো ধর্ম ভেবে আর কতোকাল রবে অচেতন।

শেষ ফুকার [ Last Phukar ] ছাড়ো হিংসা দ্বেষ জাগাও নিজের দেশ দেশের দেশিগণ। হবে দুর্দিনের পরিবর্তন। ছেড়ে প্রতিষ্ঠা শূকরের বিষ্ঠা সত্যধর্মে রাখো নিষ্ঠা কিন্তু সকল ধর্মের প্রাণপ্রতিষ্ঠা, যুগধর্ম নামসংকীর্তন ।।

ছুট্টি [ Chutti ] পাবে সদাত্মা মহাত্মাদের সৎ সাহায্য অসার ভোগ ত্যেজে ত্যাগের রাজ্যে কার্যে চলো সবে ॥৭

[ হরিচরণ আচার্য, কবির ঝঙ্কার, ১ম খণ্ড (নরসিংদী: জিতেন্দ্র কিশোর মৌলিক, ১৯২৯), পৃ ৩০। ]

 

সখীসংবাদ [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

কবি বা লহর-কবি গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

টপ্পা গান [ Tappa Gaan – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

টপ্পা গান [ Tappa Gaan – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] : টপ্পা বা কবির টপ্পা গানের আয়তন মালশি, সখীসংবাদ, কবি প্রভৃতি গানের তুলনায় হ্রস্বতর। এই গানগুলো সাধারণত চারটি স্তবক বা তুকে বিন্যস্ত থাকে। কবি গানের টপ্পা ছাড়া টপ্পা গান একটি স্বাতন্ত্র্য গায়ন শৈলী আছে। সে বিষয়ে আমরা বিস্তারি আর্টিকেল প্রকাশ করবো।

টপ্পা গানের স্তবকগুলোর ক্রম:

  • চিতান [ Chitan ]
  • অন্তরা [ Antara ]
  • প্যাচ [ Patch ]
  • মুখ [Mukh ]

উনিশ শতকের ময়মনসিংহে স্তবকগুলোর নাম ছিলো যথাক্রমে চিতান, পারান, মিল, মহড়া, অন্তরা ও মিল। উনিশ শতকের কলকাতায় টপ্পা গান নামে আলাদা এক ধরনের গান অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো, নামের দিক দিয়ে প্রায় অভিন্ন হলেও এই গানগুলো তার থেকে আলাদা।

তবে কবিগানের টপ্পা অংশের নামকরণে ঐ টপ্পার প্রভাব থাকাটা বিচিত্র নয়। এমনিতেই টপ্পা শব্দের অর্থ হলো সংক্ষিপ্ত। ১২ রাগসঙ্গীতে ধ্রুপদ এবং খেয়ালের থেকে সংক্ষিপ্ত বলে ঐ শ্রেণির গানকে এই নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

রাগসঙ্গীত টপ্পার তুক মাত্র দুটি: একটি স্থায়ী এবং একটি অন্তরা। কবিগানের ডাক, মালশি, সখীসংবাদ, কবি প্রভৃতির তুলনায় কবির টপ্পাও সংক্ষিপ্ততর। এই সংক্ষিপ্ততার কারণে কবিগানের এই অংশের নাম হয়তো টপ্পা করা হয়েছে। তবে বিষয়ের দিক দিয়েও টপ্পা গানের সঙ্গে কবির টপ্পার সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়। টপ্পা গানের মূল মেজাজ ছিলো ‘লঘু আনন্দ ও শৃঙ্গার রসের সঙ্গে সম্পৃক্ত’। অন্যদিকে কবির টপ্পা গান রচিত হয় কবিয়ালদ্বয়ের তর্কযুদ্ধের সূচনাকারী বক্তব্য দিয়ে, স্বাভাবিক কারণেই যা হালকা মেজাজের হয়ে থাকে।

সুরের দিক দিয়েও উভয় টপ্পার মধ্যে কমবেশি মিল থাকাটা বিচিত্র নয় [ ১২ করুণাময় গোস্বামী, সঙ্গীতকোষ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫). পৃ. ২৮৭। ১০ তদেব। ]।

বিশ শতকের শেষার্ধে দক্ষিণবঙ্গের কবিগানগুলোতে টপ্পার গঠন কেমন ছিলো, তা নিম্নোদ্ধৃত টপ্পা থেকে বোঝা যাবে। এখানে একজন কবিয়াল শোভা দেবীর ভূমিকায় এবং অন্যজন গৌরাঙ্গের ভূমিকায় পাল্লা করতে মনস্থ করলে তখন তাঁদের এভাবে টপ্পা রচনা করতে হয়:

টপ্পা গান : শোভা দেবী (প্রশ্ন বা চাপান) :

আমি উপেন্দ্র মিশ্রের ঘরনী শোভা দেবী নাম বললে স্বপন মাঝে গোপীনাথ,

তোমার ঘরে হবে মোর সাক্ষাৎ ফিরিবে তোমার বরাত, পূরবে মনস্কাম ॥

ব্রজে গোপী নিয়ে যাহার খেলা, সেই নন্দলালা যদি তুমি হও বিষ্ণুপ্রিয়া আর মাকে কাঁদাইয়া কি-বা শান্তি পাও।

হাতে পড়ে শুক সারী, পড়িল যে শ্লোক চারি, এই চার শ্লোকের তাৎপর্য দেখাও।

যদি নারীরা সব নরকের দ্বার, শেষের শ্লোকে মাথায় কেন ঝাঁকি দাও।

বিষ্ণুপ্রিয়া আর মাকে কাঁদাইয়া কিবা শাস্তি পাও ||

টপ্পা গান : গৌরাঙ্গ (জবাব বা উতোর) :

আমি শোভা দেবীর কল্পনাতে হই শচীর নন্দন।

কতো বুদ্ধি মোর ঠাকুর মাতার, যুক্তি তর্কে যেন ক্ষুরধার।

মনে হয় ঠিক ব্যারিস্টার, আইনে বিচক্ষণ।

দেখ বিষ্ণুপ্রিয়া আর মাতাকে, কও দেখি কাঁদাইব কী কারণ স্বকর্মের ফলে কাঁদে, প্রারব্ধ কর্ম হয় না তা খণ্ডন।

হাতে পড়ে শুরু সারী পড়িল যে শ্লোক চারি বাস্তবতায় বিরুদ্ধাচরণ আমি করতে তা পারি না বলে, মস্তকে ঝুল হয়েছে সে কারণ স্বকর্মের ফলে কাঁদে প্রারব্ধ কর্ম হয় না তা খণ্ডন।।

[ উভয় অংশের রচয়িতা স্বরূপেন্দু সরকার।]

 

টপ্পা গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার
টপ্পা গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

টপ্পা বা কবির টপ্পা দিয়ে কবিগানের মূল লড়াই সূচিত হয়। ছড়া কেটে তর্কবিতর্ক করার যে দীর্ঘস্থায়ী আসরগুলো কবিগানের প্রধান অংশ, সেখানে এই ধরনের গানের মাধ্যমে কবিয়ালদ্বয় নিজেরা কোন কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন, তার ঘোষণা দেন। প্রায় ক্ষেত্রেই এই গানের এক বা একাধিক তুকে মূল প্রশ্ন ও জবাবের সারাংশ স্থান পায়। সখীসংবাদ, কবি প্রভৃতি গানের বেড় বা চাপান অংশ পরিবেশনের বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথম কবিয়ালের ইচ্ছা অনুযায়ী হয় বলে, সেগুলো পূর্বরচিত হতে বিশেষ কোনো বাধা থাকে না।

টপ্পাজাতীয় গানের চাপান অংশ সেই সুবিধা সব সময়ে পায় না। কারণ কবিয়ালগণ কে কার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন, প্রায় ক্ষেত্রেই তা আয়োজকদের ইচ্ছা ও অভিরুচি অনুযায়ী হয়ে থাকে। কবিয়ালদের সৃজনশীলতার উপরে টপ্পার কথা অংশের মান নির্ভর করে, তা বলাই বাহুল্য। তবে কথা যাই থাক, টপ্পার সুর সবক্ষেত্রে কমবেশি এক রকম। গঠনগত কারণে টপ্পার মধ্যে দুটি চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায়, যে চরিত্র দুটিতে কবিয়ালদ্বয় অভিনয় ও তর্কবিতর্ক করেন। স্বাভাবিকভাবেই স্থান, কাল ও কবিয়ালভেদে এই দ্বান্দ্বিক পটভূমি ও চরিত্র বিচিত্র ধরনের হয়ে থাকে।

 

মালফুকার বা মালফুকার টপ্পা গান [ Malfufar or Malphupar Tappa – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

মালফুকার বা মালফুকার টপ্পা গান [ Malfufar or Malphupar Tappa – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] : উনিশ ও বিশ শতকের বাংলাদেশের কোনো কোনো আসরে কমবেশি আক্রমণাত্মক অথবা ব্যঙ্গবিদ্রূপাত্মক সংক্ষিপ্ত গান পরিবেশিত হতো, যা গঠনের দিক দিয়ে টপ্পা গানের মতো হলেও টপ্পার মতো তাতে কোনো প্রশ্ন থাকতো না। সমকালীন কোনো বিষয় বা ঘটনাকে বিদ্রূপ করতে অথবা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে এই ধরনের টপ্পা রচিত হতো। এসব টপ্পা মালফুকার, রংফুকার, লালীগান প্রভৃতি নামে পরিচিত।

সাধারণত মালশি, সংখীসংবাদ বা টপ্পা-পাঁচালির প্রথমে বা শেষ দিকে এই ধরনের টপ্পা গাওয়ার রীতি ছিলো। কবিগানের পূর্ববঙ্গ পর্বে বিশেষত পদ্মার উত্তর অঞ্চলের কবিয়ালগণ উভয় ধরনের মালফুকার পরিবেশনে পটু ছিলেন। তাঁরা এটিকে ‘কবির দাঁড়া’ও বলতেন। তবে দক্ষিণবঙ্গের কবিগানেও আক্রমণাত্মক মালফুকার লক্ষ করা যায়।

কলকাতা পর্বের কবিগানে এই ধরনের মালফুকার ‘খেউড়’ বা লাল নামে পরিচিত ছিলো। সমকালের শ্রোতাদের একাংশ এই ধরনের গান শোনার জন্য কী ধরনের আগ্রহ প্রকাশ করতেন, সে ব্যাপারে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি মন্তব্য উদ্ধৃতযোগ্য।

নিত্যানন্দ দাস বৈরাগীর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন: “বসন্তকালে কোন এক রজনীতে কোন স্থানে ইনি সখীসংবাদ ও বিরহ গাহিয়া আসর অত্যন্ত জমাট করিয়াছেন, তাবৎ ভদ্রেই মুগ্ধ হইয়া শুনিতেছেন ও পুনঃ পুনঃ বিরহ গাহিতেই অনুরোধ করিতেছেন, তাহার ভাবার্থ গ্রহণে অক্ষম হইয়া ছোটলোকেরা আসরে দাঁড়াইয়া চিৎকার পূর্বক কহিল, ‘হ্যাদ দেখ লেতাই, ফ্যার যদি কালকুকিলির গান ধল্লি, তো, দো, দেলাম, খাড় গা’।

নিতাই তচ্ছুরণে তৎক্ষণাৎ মোটা ভজনের খেউড় ধরিয়া তাহারদিগের অস্থির চিত্তকে সুস্থির করিলেন।”১৫ কলকাতা পর্বে আদিরসাত্মক এই ‘খেউড়’ গানের গঠন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। তবে পূর্ববঙ্গ পর্বে ব্যঙ্গবিদ্রূপাত্মক (হয়তো কখনো কখনো আদিরসাত্মকও) এইসব গানে সাধারণত একটি চিতান বা একটি ফুকার বা একটিমাত্র অন্তরা গাইতে হতো। কোথাও কোথাও এইসব ফুকার জোটক বা জোটের পাল্লার কায়দায়ও পরিবেশিত হতে দেখা যায়। নিম্নে ময়মনসিংহ অঞ্চলের একটি বিদ্রূপাত্মক মালফুকার এবং দক্ষিণবঙ্গের একটি আক্রমণাত্মক মালফুকার উদ্ধৃত হলো।

মালফুকার বা মালফুকার টপ্পা গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার
মালফুকার বা মালফুকার টপ্পা গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

রামগতি শীলের বিদ্রূপাত্মক মালফুকার:

আজগবি এক কাব্যকথা, মন দিয়া শুনো সে সকল। মরি হায় রে।

আষাঢ়ে নূতন ঢলে, সিং মাগুর কৈ কাতলে বেঁধেছে একদল ॥

ঘন্যা, পুঁটা, খাদে দুটা, গজার আর ঘাগটে গায় মুলতানে।

চান্দা, চেলা, ইচা, ঘুঙ্গিয়া, মলা, খৈলা আর চিতল চিতানে।

বোয়াল, লাডি, বাইম, লেডি পাব্যা, এই কয়টা মৈল ভাব্যা, ধরবে কোন স্থানে।

দলের নটুয়া, কড়ি কাটুয়া, মড়ার চাটুয়া কাছিম মাঝখানে ॥ [১৭]

মনোহর সরকারের আক্রমণাত্মক মালফুকার ও নকুলেশ্বর সরকারের জবাব:

মনোহর সরকার—

কুঞ্জবাবুর দল এসেছে তিনটি মেয়ে সভায় নাচে,

রূপে করে ঝলমল, ওরা মেয়ের বলে করে বল।

যে কয়েকটা পুরুষ আছে, থেকে মেয়ের পাছে পাছে ওদের পুরুষত্ব ঘুচে গেছে, সবাই বলে মেয়ে দল।

নকুলেশ্বর সরকার –

বললি মোদের দলে মেয়ে আছে,

আমরা থাকি মেয়ের পাছে চিরদিনই মেয়ের জয়, বিশ্ব মেয়ের গুণে সৃষ্টি হয়।

গৃহ হয় গৃহিণীর জন্য, একা সেই গৃহিণী ভিন্ন থাকতে ধনেরত্নে গৃহ পূর্ণ, তবু গৃহ শূন্য রয় ॥

বললে মেয়ে আছে মোদের দলে, আমরা চলি মেয়ের বলে জ্ঞানের কর্তা মৃত্যুঞ্জয়, সে মেয়ের পদে শরণ লয় শতস্কন্ধ বধের কালে, রাম চলেছেন মেয়ের বলে সেদিন সিতা না অসিতা হলে, শতস্কন্ধ হয় না ক্ষয় ॥

বললি মোদের দলে মেয়ে আছে, অঙ্গভঙ্গি করে নাচে তাই দেখি আজ করে রোষ, বুঝি দেখালি আজ মেয়ের দোষ।

মেয়ের পেটে জন্ম পেলি, মেয়ের দুগ্ধে প্রাণ বাঁচালি নইলে তুই কি বড়ো হয়েছিলি, চুষে বাপের [১৮]

[রেফারেন্স : ১৫ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, কবিজীবনী, ভবতোষ দত্ত সম্পা (কলকাতা: ক্যালকাটা বুক হাউস, ১৯৫৮), পৃ. ১৮২। ১৬ এই ধরনের একটি ঘটনার সাক্ষ্য দিয়েছেন হরিচরণ আচার্য। হরিচরণ আচার্য, বঙ্গের কবির লড়াই (পুনর্মুদ্রণ, নরসিংদী: দীপকচন্দ্র দাস, ২০০৬), পৃ. ১৫-১৬। ১৭ উদ্ধৃত, বিজয়নারায়ণ আচার্য, “রামগতির টপ্পা,” সৌরভ, নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯১৪ ১৮ উদ্ধৃত, দীনেশচন্দ্র সিংহ, কবিয়াল কবিগান (কলকাতা: সৌদামিনী সিংহ, ১৯৭৭), পৃ. ২৩৪–৩৫। চরণের শেষ শব্দটির বদলে দীনেশচন্দ্র সিংহ একটি ত্রিবিন্দু দিয়ে রেখেছেন। শব্দটি ‘লজেঞ্চুস’ বা ‘লজেঞ্চোস’ হওয়া সম্ভব।]

 

ধুয়া ও ধুয়া গান [ Dhua Gaan – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

ধুয়া ও ধুয়া গান [ Dhua Gaan – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] : কবিগানের টপ্পা গানের পরে এবং ছড়াকাটামূলক পাঁচালি অংশের মধ্যে এক ধরনের গান উভয়ের অংশের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে, এই গানের নাম ধুয়া। বিশ শতকের প্রথম দিকে বিশেষ কোনো সুরে একটিমাত্র কলি গেয়ে সেই কলির সুর ও তাল অনুসরণ করে কবিয়ালগণ পাঁচালি বলতেন। বিশেষ ঐ কলিটিকে তখন বলা হতো ধুয়া বা ডাক-ধুয়া বা দিশা। কিন্তু বিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ পুরো একটি গান ধুয়ার জায়গা দখল করে এবং এভাবে ধুয়া তখন ধুয়া গান হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে।

পাঁচালি অংশে কবিয়ালগণ যেহেতু দীর্ঘক্ষণ ধরে ছড়া কাটতে থাকেন, সেহেতু সুর-তালের একঘেয়েমি দূর করতে কবিয়ালকে মাঝে মাঝে নতুন নতুন ধুয়া গাইতে হয়। পাঁচালির ছড়ার ছন্দশৈলী পরিবর্তন করতেও এই ধরনের ধুয়া গান সংযোজনের প্রয়োজন হয়। আঙ্গিকগত দিক দিয়ে গানগুলো সাধারণত বাউল, ভাটিয়ালি প্রভৃতি গানের মতো। চিতান (ধরন ও পাড়ন) বা স্থায়ী এবং একাধিক অন্তরা দিয়ে গানগুলো রচিত হয়ে থাকে। তবে প্রায় ক্ষেত্রেই এর অন্তরার সংখ্যা তিনের অধিক।

ধুয়া গানগুলোর বিষয় সাধারণত চাপান-উতোরের বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এমনকি ধুয়া, দিশা বা ডাক-ধুয়ার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য । প্রশ্নকারী কবিয়াল তাঁর প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কোনো একটি ধুয়া গান করেন। এই সঙ্গতিকে আরো জোরালো করার জন্য গানের কিছু কিছু অস্তরা তাৎক্ষণিকভাবে রচিত হতে দেখা যায়। জবাব দানকারী কবিয়ালও একই ভাবে এমন ধুয়া গান করেন, যে গানের মধ্যে জবাবের উপাদান থাকে। জবাবের উপাদান কম থাকলে তিনিও গানের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে অন্তরা সংযোজন করে থাকেন।

বিশেষভাবে স্মরণীয় অধিকাংশ কবিয়াল তাঁদের পাঁচালির আসরগুলোতে এইসব ধুয়া গানের তাল অনুযায়ী ছড়া কেটে থাকেন। ধুয়া গানের অন্তরাকে অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক সময়ে ত্রিপদী ও চৌপদী ছন্দে কবিয়ালকে ছড়া কাটতে হয় এবং স্থায়ী বা চিতানের অন্ত্যমিলের সঙ্গে সেসব ছড়ার মিল রক্ষা করতে হয়। ধুয়া গান গাওয়ার পরে কবিয়ালগণ যে ছড়া কাটেন, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে সেটাকে পাঁচালি নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। পাঁচালির সুর যাতে ধুয়া গানের সুরকে অনুসরণ করতে পারে, সেজন্য যন্ত্রসঙ্গতকারীগণ তাঁদের যন্ত্রে ধুয়া গানের সুর ধরে রাখেন এবং ছড়া কাটার মধ্যে মধ্যে সেই সুর শুনে ধুয়ার স্থায়ীকে মনে পড়ে।

কবিগানের অন্য যাবতীয় গান, যেমন ডাক, মালশি, সখীসংবাদ, কবি, টপ্পা প্রভৃতি প্রধানত দোহারদের কণ্ঠে পরিবেশিত হয়। কিন্তু ধুয়া গান কবিগানের এমন অংশ যা শুধু কবিয়ালকে গাইতে হয়। মাঝে মাঝে ধুয়া টানা ছাড়া দোহারদের এখানে কিছু করার থাকে না। ধুয়া টানার মানে হলো মূল গানটি কবিয়াল কর্তৃক গাওয়ার সময়ে প্রথমবার স্থায়ীর শেষে এবং পরে অন্তরার শেষে স্থায়ীর সর্বশেষ কলি সমস্বরে গেয়ে ওঠা। এই গানের এমন ধুয়া-টানা বৈশিষ্ট্য থেকেই সম্ভবত গানগুলোর নাম ধুয়া গান।

ধুয়া গানের বিষয় ও সুর উভয়ই বৈচিত্র্যপূর্ণ। বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের যতোগুলো শাখা আছে, তার প্রতিটি শাখার গানই কবিগানের ধুয়া হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আধুনিক গান, যা লঘুসঙ্গীত হিসেবে পরিচিত, সেগুলোও যেমন ধুয়া গান হিসেবে পরিবেশনযোগ্য, আবার রাগসঙ্গীতের সঙ্গতিপূর্ণ শৈলীগুলোও এই অংশে ব্যবহার্য। অর্থাৎ সুরের দিক দিয়ে ধুয়া গানের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে সাধারণত বিভিন্ন এলাকার বাউল, কীর্তন, ভাটিয়ালি, প্রভৃতি সুরের গান ধুয়া হিসেবে পরিবেশিত হয়ে থাকে। বিষয়ের দিক দিয়েও ধুয়া সর্বভুক। নো গানে পাওয়া যায় দেহতত্ত্বের কথা, কোথাও পাওয়া যায় গুরুভক্তির নমুনা, কোথাও ঘটে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির প্রতিফলন, আবার কোনো গানের মধ্যে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের হাস্যরস সৃষ্টির প্রচেষ্টা।

গানগুলো পূর্বরচিত থাকার জন্য, এর গুণগত মান তাৎক্ষণিক রচিত গান ও ছড়া থেকে অনেকটা ভালো হয়। তাছাড়া বিশ শতকের শেষার্ধে কবিগানের এই অংশে যে কবিয়াল যতো বেশি দক্ষ ছিলেন, সেই কবিয়াল ততোটা জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে এগিয়ে ছিলেন।

নিম্নে দুটি ডাক-ধুয়া গান বা দিশা এবং একটি ধুয়া গান উদ্ধৃত করা হলো:

ধুয়া ও ধুয়া গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার
ধুয়া ও ধুয়া গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

ক. ডাক-ধুয়া বা দিশা

১. মন মাঝি মোর বৈঠা নে রে আমি আর বাইতে পারলাম না।

২. গোসাইরে নি দেখছো খাজুর গাছতলায়, গোঁসাই খাজুর খায় আর লেজ নাড়ায়।

খ. রসিকলাল সরকারের ধুয়া —

ননদী লো যা ফিরে যা ঘরে।

বলিস ডুবেছে রাই কলঙ্কিনী কৃষ্ণ প্রেম সাগরে ॥

ঘুচলো তোদের সকল জ্বালা মুছলো কুলের কালি কলঙ্কিনী রাই বলে আর কেউ দেবে না গালি।

ব্রজে আর হবে কৃষ্ণকালি গোপন বাসরে ॥

ঝুলন দোল আর নৌকাবিলাস সবই হলো শেষ প্রবাসে চলেছি আমি যেথায় বন্ধুর দেশ।

যেন দয়া করে শ্যাম হৃষীকেশ এই আশিস দিস মোরে ॥

ভুলে যা লো রাধা তোদের ছিলো কুলের বউ শ্যাম বিনে জীবনে মরণে আপন নাই আর কেউ।

যার প্রাণে ওঠে অকূলের ঢেউ, কুলে তার কী করে ॥

বিদায় বেলায় ননদী গো শেষ মিনতি নিয়ো আমার হয়ে শ্যামের কুঞ্জে সাঁঝের প্রদীপ দিয়ো।

এ দীন রসিক বলে আমায় রাখিয়ো চরণসেবার তরে ॥

 

জোটের পাল্লা গান [ Joter Palla Gaan – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]:

জোটের পাল্লা গান [ Joter Palla Gaan – Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] : জোটের পাল্লা হলো কবিগানের পাঁচালি অংশের উপসংহার। উনিশ শতকে কলকাতা পর্বে এর নাম ছিলো কবির লহর। দক্ষিণবঙ্গে এর একটি জনপ্রিয় প্রতিশব্দ মিলনগোষ্ঠ বা মিলনগীতি। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই অংশের নাম জোটক। পশ্চিমবঙ্গের অনেক স্থানে এটি বোল কাটাকাটি নামে পরিচিত।

২০ টাঙ্গাইল অঞ্চলে কবিগানের এই অংশ আলাদাভাবে ‘মালজুড়ি’ বা ‘মালজোড়া’ নাম গ্রহণ করে। ২১ এটি পাঁচালি অংশ থেকে যথেষ্ট আলাদা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অংশে পাঁচালি অংশের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তবে পাঁচালি অংশ থেকে এই অংশের তফাত উপস্থাপন কৌশলে।

জোটের পাল্লা গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার
জোটের পাল্লা গান – স্বরোচিষ সরকার

পাঁচালির আসরগুলোতে কবিয়াল বা সরকারগণ পালাক্রমে তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করে থাকেন। এক কবিয়ালের পালা শেষ হওয়ার পর অন্য কবিয়াল আসরে আসেন। কিন্তু জোটের পাল্লায় প্রথমে একজন কবিয়াল এসে একটি ধুয়া গান বা ডাক-ধুয়া গাওয়ার পরে সেই ধুয়া গানের সুরে পয়ার বা ত্রিপদীতে ছড়া কাটতে শুরু করার এক পর্যায়ে প্রথম কবিয়ালের আহ্বানে বিপক্ষের কবিয়াল আসরে দাঁড়ান এবং উভয় কবিয়াল সামনাসামনি দাঁড়িয়ে পরস্পরের সঙ্গে তর্কবিতর্ক চালিয়ে যেতে থাকেন।

https://youtu.be/dVchZMotmnM

প্রথম দিকে এই ছড়ার লয় খানিকটা ধীর থাকলেও উভয়ের যুক্তির তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়াকাটার লয় দ্রুততর হতে শুরু করে। এই দ্রুত ছড়া কাটার মধ্যে অনেক সময়ে আদিরসাত্মক প্রসঙ্গের অবতারণা হয়ে থাকে। প্রায় ক্ষেত্রে উভয় কবিয়াল শেষ পর্যন্ত তাদের বিতর্কিত বিষয়ের উপসংহারে পৌঁছতে সক্ষম হন, এবং সঙ্গত কারণে তা মিলনাত্মক হয়ে থাকে।

সাধারণত কবিয়ালগণ পরস্পরকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে কবিগান শেষ করেন। কবিয়াল মদন আচার্য রচিত একটি চমৎকার জোটের পাল্লা উদ্ধৃত করেছেন যতীন সরকার।

জোটের পাল্লা গান: কবিয়াল মদন আচার্য রচিত

ধুয়া
মান ছেড়ে দে ওগো রাধে আমি তোমার পায়ে পড়ি।
একবার ফিরে চাও না কিশোরী ॥

কৃষ্ণ
সরকার হে মনোরঙ্গে তোমার সঙ্গে গাইবো আজ মানের জুড়ি।
কর্তাপক্ষের আদেশ হইলে সেই ভাবেতেই কাজ করি।
রাধে বা কৃষ্ণ হবে যাও না সে রাস্তা ধরি।
বাক্যব্যয়ে সময় নষ্ট তাতে কষ্ট হয় ভারি ॥

রাধা
গত নিশি কষ্ট করে পোহাই শর্বরী।
তুমি সত্য বলো চিকন কালা কল্য ছিলে কার বাড়ি ॥

কৃষ্ণ
একটি নবীন বাছুর হারাইয়া আমি রাইতভর ঘোরাঘুরি
এই কারণে কুঞ্জে আসতে আজ হইয়াছে কিছু দেরি ॥

রাধা
তোমার বেণুর রবে ধেনু ফিরে তবে কি জন্য ঘোরাঘুরি।
আবার কপালেতে সিন্দূরের বিন্দু পরনেতে নীল শাড়ি।

কৃষ্ণ
বনে বনদুর্গা পূজা করছিলো কয়জন নাগরী।
আমায় কুঙ্কুম দিয়া আশীর্বাদ দিল সত্য আজ স্বীকার করি।

রাধা
বুঝলাম তোমার সব চাতুরী পরনে কেন নীল শাড়ি।
বাদুরচোষা আমের দশা কিজন্য তোমায় হেরি॥

কৃষ্ণ
আসবার সময় তোমার কুঞ্জে হঠাৎ কূপেতে পড়ি
ভিজা কাপড় বদলাইতে গিয়াছি ধোপার বাড়ি ॥

রাধা
শাড়ির অঞ্চলে আজ চন্দ্রাবলীর নাম হেরি।
কোথায় পাইলে এমন শাড়ি কেমন কেমন আজ হেরি॥

কৃষ্ণ
রাধে গো, বললে নাকি অঞ্চলেতে চন্দ্রাবলির নাম হেরি।
চন্দ্রা নামে একটা কোম্পানি খুলছে, দেখছো না চিন্তা করি ।
আসলে কুঞ্জে আসতাম পারি, দাও না, প্রতিজ্ঞা করি ॥

রাধা
চন্দ্রারে আজ মা ডাকিলে কুঞ্জেতে আসতে পারি।
তা না হলে যাও না চলে তুমি সে চন্দ্রার বাড়ি ॥

কৃষ্ণ
বললে নাকি মা ডাকিতেম, কিছুটা রক্ষা করি।
ষোলো আনা মা না ডাইক্যা মাসিমা ডাকতাম পারি ॥

রাধা
আরেক কথায় মরি ব্যথায় কোথায় যাই আর কি করি।
তোমার কপালে কঙ্কনের চিহ্ন কিজন্য আমি হেরি ॥

কৃষ্ণ
দ্রুত বেগে আসবার সময়ে রাস্তাতে গেলাম পড়ি।
একটা কলসের কান্ধার দাগ লাইগ্যাছে ভাবেতে বুঝতাম পারি ॥
রাধে গো তুমি আমার আমি তোমার এক রাজ্যেতে বসত করি।
মানটা আজি ছাইড়্যা দিলে কুঞ্জেতে ঢুকতাম পারি ॥

রাধা
নাথ গো, কতো কষ্ট দিলে আমায় কি করে আজ মান ছাড়ি।
পিরিতের বাক্সে জঙ্কার পড়ছে, বলো উপায় কি করি ॥

কৃষ্ণ
পিরিতের বাক্সে জং পইড়াছে বললে তুমি কিশোরী।
একটু প্রেম নারানের তৈল লাগাইয়া বাক্সটারে ঠিক করি ॥

রাধা
রাধা আয়ান ঘোষের খাশের বাড়ি কেমনে নেও দখল করি।
মামা থাকতে ভাইগ্না কভু হয় না তার অধিকারী ॥

কৃষ্ণ
ষোলো আনা চাই না আমি দুই আনা পাইতাম পারি।
মামা মরলে ষোলো আনার আমি তো হই অধিকারী ॥

রাধা
প্রতিজ্ঞা করো অদ্যাবধি যাইবে না অন্যের বাড়ি।
উপরোধে মনের খেদে আইজের মান দিলাম ছাড়ি।
হলো রাধাকৃষ্ণের যুগল মিলন পূর্ব স্মৃতি নেই ধরি ॥

কৃষ্ণ
জীবন থাকতে এ জীবনে যাইবো না অন্যের বাড়ি ॥

জোটের পাল্লা গান বিষয়ক [ রেফারেন্স:
২০ দীপক বিশ্বাস, কবিগান (কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ২০০৪), পৃ. ১০। মামুন তরফদার, টাঙ্গাইলের লোক-ঐতিহ্য (ঢাকা: ক্যাবকো পাবলিকেশন্স, ২০০৬), পৃ. ১৭৯।,
যতীন সরকার, বাংলাদেশের কবিগান, পৃ. ৪৫-৪৯। উদ্ধৃতি দেওয়ার সময়ে ধুয়ার পুনরুক্তি বাদ দেওয়া হয়েছে। ]

 

কবিগানের স্তবক ও সুর [ Stanza & Tune of Kabigan ]

কবিগানের স্তবক ও সুর বিষয়ে জানতে দেখুন আমাদের “কবিগানের স্তবক ও সুর [ Stanza & Tune of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] ” আর্টিকেলটি।

 

কবিগানের বিষয় [ Subjects of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] :

রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পৌরাণিক কাহিনিকে কবিগানের মূল বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। উনিশ শতকের সূচনায় প্রকাশিত ‘করুণানিধানবিলাস’ গ্রন্থে কবিগানের যে মুদ্রিত পাঠ পাওয়া যায়, সেটিই এ পর্যন্ত প্রকাশিত সবচেয়ে প্রাচীন কবিগানের পাঠ। এর পাঠে কবিগানের বিষয়বস্তু রাধা-কৃষ্ণ-চন্দ্রাবলির প্রেম।

যে ঝুমুর গানকে কবিগানের প্রধান উৎস হিসেবে দাবি করা হয়ে থাকে, সেটির আলোচ্য বিষয়ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় যেসব গান সংগ্রহ করেছেন, সেগুলোরও বড়ো একটি অংশ রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক।

তবে রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি উনিশ ও বিশ শতকের কবিগানের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হলেও, আরো নানা ধরনের জিনিস কবিগানের বিষয়ের মধ্যে অঙ্গীভূত হয়। শুধুমাত্র সখীসংবাদ নামক অংশ পর্যায়ে সরাসরি কবিগানের  বিষয় রাধাকৃষ্ণ প্রেমবিষয়ক। এছাড়া ভোর, গোষ্ঠ, বসন্ত, বিরহ, প্রভাস, জোটের পাল্লা প্রভৃতি অংশের মধ্যেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি ব্যক্ত হয়ে থাকে।

এছাড়া কবিগানের কবি, টপ্পা, পাঁচালি, ধুয়া প্রভৃতি অংশের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত কারণে ইহজাগতিক-পৌরাণিক নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই সেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রসঙ্গ দুর্লভ হয় না। রাধাকৃষ্ণ তথা কৃষ্ণলীলা বিষয় এভাবে কবিগানের প্রধান ও মূল বিষয়ে পরিণত হয়।

 

 

 

কবিগানের বিষয় আলোচ্য হিসেবে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কালী ও দুর্গাদেবী তথা চণ্ডী কেন্দ্রিক। কবিগানের ডাক, মালশি, ভবানীবিষয় প্রভৃতি অংশ এই কালী, দুর্গা বা চণ্ডীকে নিয়ে রচিত হয়ে থাকে।

বিশ শতকের সূচনা থেকে হরিচাঁদ ঠাকুরের মতুয়া ধর্মমত প্রবল হয়ে ওঠার পর থেকে মতুয়া বিষয় নিয়ে এই শ্রেণির গান রচিত ও গীত হতে শুরু করে। তবে গানগুলো যেহেতু মাহাত্ম্য বর্ণনা ও স্তুতিনির্ভর হয়, সেহেতু শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে এই গানের প্রভাব খুব একটা প্রবল হয় না, একই কারণে তা পর্যাপ্ত মনোযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়।

কবিগানের বিষয় কবিগানের কবি, টপ্পা, পাঁচালি, ধুয়া প্রভৃতি অংশ মোটামুটি ইহজাগতিকতা কেন্দ্রিক। তবে হিন্দু পুরাণ প্রসঙ্গ এখানে ব্যাপক জায়গা দখল করে থাকে। বিশেষত কবি অংশে কোনো একজন কবিয়াল পৌরাণিক, ঐতিহাসিক বা কাল্পনিক কোনো কাহিনির পটভূমিতে দু-একটি প্রশ্নের অবতারণা করেন। সেই প্রশ্নের জবাব প্রতি-জবাব প্রভৃতির মধ্য দিয়ে কবিগান অগ্রসর হতে থাকে।

এই প্রক্রিয়ায় কোনো পৌরাণিক প্রসঙ্গ নিয়ে শুরু হলেও আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোন বিষয়ে গিয়ে থামবে, আগে থেকে সে সম্পর্কে আঁচ করা সম্ভব হয় না।  অনেক সময়ে শ্রোতাদের অভিরুচি ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কবি অংশের বিষয় নির্ভর করে। টপ্পা-পাঁচালি প্রসঙ্গেও একই মন্তব্য করা যায়।

টপ্পাতে কবিয়ালদ্বয় যেহেতু দ্বান্দ্বিক সম্ভাবনাপূর্ণ দুটি চরিত্রে নিজেদের আরোপ করে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে থাকেন, সেখানেও তাই বিষয় নির্ভর করে আয়োজক ও শ্রোতাদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় অনুযায়ী। আসরভেদে কবিগানের এই কবি ও টপ্পা অংশ আলাদা হয়ে থাকে বলে এখানে বৈচিত্র্যের অবকাশ খানিকটা বেশি থাকে। কয়েকটি কবিগানের শিরোনাম এবং কয়েকটি টপ্পার চরিত্রদ্বয়ের উল্লেখ করা হলে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বৈচিত্র্য সম্পর্কে আঁচ করা সম্ভব হবে।

কবিগানের মধ্যকার কবি অংশের সাধারণ কিছু শিরোনাম, যেমন : রামু সরকারের ‘শরাঘাতের কবি,’ তারকচন্দ্র সরকারের ‘পাশাখেলার কবি,’ হরিচরণ আচার্যের ‘কাক কোকিলের কবি,’ রাজেন্দ্রনাথ সরকারের ‘গাজার কবি,’ নকুলেশ্বর সরকারের ‘জল ও কুম্ভের কবি,’ বিজয়কৃষ্ণ সরকারের ‘পঞ্চ পাণ্ডবের কবি, অনাদিজ্ঞান সরকারের ‘যোগতত্ত্বের কবি,’ স্বরূপেন্দু সরকারের ‘নারী স্বাধীনতার কবি,’ নারায়ণ সরকারের ‘যৌতুকের কবি,’ নিখিলচন্দ্র সরকারের ‘পরিবার পরিকল্পনার কবি‘ প্রভৃতি। [২৬]

এই শিরোনামগুলো থেকেও দেখা যাচ্ছে কবিগানের বিষয় কখনো পৌরাণিক, কখনো কাল্পনিক, কখনো সামাজিক, আবার কখনো একেবারেই সমকালীন সমস্যানির্ভর।

কবিগানের টপ্পা ও পাচালি অংশের জন্য তুলনামূলক বেশি সময়ের দরকার হয়। কেননা এই অংশে কবিয়ালদ্বয় সত্যিকারের বিতর্কে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। বিতর্কের বিষয় নির্ভর করে কবিয়ালদ্বয় কে কোন চরিত্রে নিজেদের আরোপ করেন, তার উপরে।

কয়েকটি টপ্পার বিষয় উল্লেখ করলেও কবিগানের এই অংশের বিষয় সম্পর্কে আন্দাজ করা সম্ভব। যেমন: রূপ ও সনাতন, অর্জুন ও কৃষ্ণ, হনুমান ও রাম, পদ্মাবতী ও জয়দেব, মীরা বাঈ ও জীব গোস্বামী, বালি ও রামচন্দ্র, বৈশাম্পায়ন ও কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, শুক্রাচার্য ও কৃষ্ণ, নারদ ও নারায়ণ, জটায়ু ও রাবণ, যুধিষ্ঠির ও ধৃতরাষ্ট্র, দ্রোণাচার্য ও সাত্যকি, গান্ধারী ও কৃষ্ণ, নন্দী ও শিব, হরিদাস ও নিত্যানন্দ, চৈতন্যবালা ও তারকচাদ, আবুল কালাম ও জহরলাল; ধনঞ্জয় টিকাদার ও লুৎফর রহমান, চাষী ও বৈষ্ণব, ধন ও বিজ্ঞান, যুদ্ধ ও শান্তি, চাষী ও মজুতদার, কৃষক ও জমিদার, মহাজন ও খাতক, স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্র, ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রভৃতি ।

[ ২৬ উল্লিখিত কবিগুলোর জন্য পরিশিষ্ট ৫ দ্রষ্টব্য। ]

কবিগানের শিল্পী [ Artists of Kavigan]

কবিগানের শিল্পী সম্পর্কে বিস্তারি জানতে আমাদের “কবিগানের শিল্পী [ Artists of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

 

কবিগানের আসর [ Performace of Kabigan ] :

কবিগানের আসরের বিষয়ে আমাদের “কবিগানের আসর [ Performace of Kabigan ]” আর্টিকেলটি দেখুন।

কবিগানের কাল ও উপলক্ষ

কবিগানের কাল ও উপলক্ষ বিষয়ে এই আর্টিকেলটি পড়ুন : কবিগানের কাল ও উপলক্ষ

কবিগানের পৃষ্ঠপোষক ও শ্রোতা

সূচনা পর্বের কবিগান সম্পর্কে যতোটা জানা যায়, তাতে দেখা যায়, কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর তৎকালীন জমিদার ও বিত্তবান লোকজন এই জাতীয় গানের আয়োজন করতেন। কলকাতায় তখন যাঁরা কবিগানের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশেষভাবে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জমিদার নবকৃষ্ণ দেব, গোপীমোহন ঠাকুর, শোভাবাজারের কালীশঙ্কর ঘোষের পুত্রগণ ও রামদুলাল সরকারের পুত্রগণ, দরজিপাড়ার মিত্ররা, হাটখোলার দত্তরা, বাগবাজারের বসুরা, কলুটোলার শীলেরা, পাইকপাড়ারজমিদারবৃন্দ, কাশিমবাজারের হরিনাথ কুমার বাহাদুর, পাথুরেঘাটার ঠাকুররা, জোড়াসাঁকোর সিংহরা, গরানহাটার কৃষ্ণমোহন বসাক, শ্যামপুকুরের দিগম্বর মিত্র ও হলধর ঘোষ, পটলডাঙার রূপনারায়ণ ঘোষাল, দয়েহাটার গুরুচরণ মল্লিক, বড়বাজারের মল্লিকরা, এবং বিখ্যাত ধনী ছাতুবাবু ও লাটুবাবু।

এছাড়া তখন বর্ধমান, চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরের রাজারাও কবিগানের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এসেছিলেন।

পূর্ববঙ্গের কবিগান সম্পর্কে যতোটা জানা যায়, সেখানেও দেখা যায়, বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত জমিদারশ্রেণিই কবিগানের আয়োজন করেছেন। জমিদারি প্রথার অবসানের পরে প্রধানত বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ বা সংস্থা-সংগঠনের উদ্যোগে কবিগান চর্চা অব্যাহত থাকে। আর্থিক সচ্ছলতা থাকার কারণে জমিদারদের পক্ষে কোনো ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা খুব একটা কঠিন ছিলো না। একই কারণে অনেক জমিদার প্রতিবেশী ও প্রতিপক্ষ জমিদারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।

জমিদারি প্রথা লোপ পাওয়ার পরে গ্রাম ও শহরের বিত্তবান ব্যক্তি বা সংগঠন সংস্থা আয়োজকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একই প্রক্রিয়ায় এই ব্যক্তিবর্গ ও সংগঠন-সংস্থা নিজ নিজ এলাকার আঞ্চলিক ঐতিহ্যের অনুসরণ করতে গিয়ে কবিগান আয়োজন অব্যাহত রাখেন। বিশ শতকের শেষ দিকে সরকারি উদ্যোগে নানা ধরনের জাতীয় দিবস উপলক্ষে কবিগানের আয়োজন করা হয়। শহর ও নগরের প্রদর্শনীকে অধিকতর আকর্ষণীয় করে তুলতেও কবিগানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানাদি কবিগানের পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে।

আর্থিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্ক থাক বা না থাক, শ্রোতারাই যে কবিগানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শ্রোতাদের আগ্রহ, তাদের প্রাসঙ্গিক অনুরোধ-উপরোধ, সর্বোপরি শ্রোতাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কবিয়ালদের সৃজনশীলতা উৎসাহিত করে। শ্রোতাদের সঙ্গে এই চমৎকার মিথস্ক্রিয়ায় রচিত হতে পারে এমন সব গানের কলি, যা হয়তো অন্য কোনো সময়ে ঐ কবিয়ালের পক্ষে রচনা করাই সম্ভব নয়।

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ববঙ্গের কবিগানের এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন দীনেশচন্দ্র সিংহ, এ প্রসঙ্গে যা উদ্ধৃতিযোগ্য : “গানের মাধ্যমে একজনের কাছে একজনের মনোভাব প্রকাশ এবং কিয়ৎক্ষণের মধ্যে শ্রোতার পক্ষ অবলম্বন করে বিপক্ষ কবিয়াল কর্তৃক বক্তার বক্তব্যের ভাবরস বজায় রেখে বিপরীতধর্মী জবার দান–পূর্ববঙ্গের কবিগানের এক অপূর্ব বৈশিষ্ট্য। যারা প্রকৃত রসজ্ঞ শ্রোতা তাঁরা গানগুলির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একাগ্র মনে শ্রবণ করে ভাষান্তরালে লুক্কায়িত উত্তরদানযোগ্য ভাবগুলি স্মরণে রাখেন, এবং বিপক্ষ সরকারের কাছে ঐ জাতীয় পদগুলির সরস জবাব শোনবার জন্য উৎকর্ণ হয়ে বসে থাকেন।

এমন অনেক শ্রোতা ছিলেন যাঁরা গানের জবাবে এমন আত্মহারা হয়ে থাকতেন যে, সরকার মহাশয়েরা জবাবের ফুকারের ত্রিপদীটি বলবার সময়ে দুটি পদ বলতেই তাঁরা শেষ পদটি বলে নেচে উঠতেন। একি সামান্য অনুভূতি। কবির মনের ভাব গ্রহণ করে সে ভাবের অভিব্যক্তি যাদের মুখে বক্তার বক্তব্য প্রকাশের পূর্বেই ব্যক্ত হয়, তাঁদের শ্রোতা না বলে রসজ্ঞ কবি বললেও অত্যুক্তি হয় না।

সাক্ষাৎকার: উমা সরকার, মুক্তিপাড়া, বামুনগাছি, উত্তর চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ। সাক্ষাৎকারের স্থান ও তারিখ: মুক্তিপাড়া, ২৬ মে ২০০৮। ৫১
সাক্ষাৎকার: অনিল সরকার, মন্ত্রী, প্রদেশ সরকার, ত্রিপুরা, ভারত। সাক্ষাৎকারের স্থান ও তারিখ: ত্রিপুরা ভবন, কলকাতা, ২০শে মে ২০০৮।
৫২ তাদেব
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, গৌরবঙ্গ-সংস্কৃতি (কলকাতা: জিজ্ঞাসা, ১৯৭২), পৃ. ১৩২ প্রফুল্লচন্দ্র পাল, প্রাচীন কবিওয়ালার গান, পৃ. এগারো।

 

লেখক :
স্বরোচিষ সরকার [ Shorochish Sarkar]
বিশিষ্ট আভিধানিক ও বৈয়াকরণ
অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
লেখক : কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি

 

এ বিষয়ে অন্যান্য লিংক:

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

36 Comments to “কবিগানের সঙ্গীত শৈলী [Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan, Music Genre ] সূচি”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।