সঙ্গীত কী, কেন, কীভাবে? [ Definition of Music & A Brief History ] অমল দাশশর্মা

সঙ্গীত প্রশস্তি - সঙ্গীত মনীষা - অমল দাশশর্মা

সঙ্গীত কী, কেন, কীভাবে? [ Definition of Music & A Brief History ] :
জপকোটিগুণং ধ্যানং ধ্যানকোটিগুণং লয়:।
লয়কোটিগুণং গানং গানাৎ পরতরং নহি ॥

এমন উচ্চতম প্রশংসা আর কোন বিষয়ে নেই। সঙ্গীত যে সর্বকালের সর্বদেশের সর্বজনের প্রেমভক্তি ও সম্মানের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যা, সর্বদেশের মনীষীগণ সে কথা স্বীকার করেন। গোড়ার দিকে পৃথিবীর সর্বত্রই সঙ্গীত ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু সমাজ, ধর্ম, লোকরুচি, জলবায়ু, ভাষা প্রভৃতি অনুসারে ক্রমে এর নানাবিধ রূপান্তর ঘটে। তবে ভারতীয় সংগীতের প্রধান উপাদান ও আধিপত্য চিরদিনই ধর্মভাবাপন্ন। সুরের আবেশে মুগ্ধ ভক্তেরা ছুটে চলেছে মুক্তির সন্ধানে, এমন অজস্র দৃষ্টাস্ত দেখা যায়। এ দেশের জয়দেব, শ্রীচৈতন্য, তুলসী, কবীর, ত্যাগরাজ, পুরন্দরদাস, সুরদাস, মীরা, রামপ্রসাদ প্রমুখ পরম ভক্তেরা এই প্রসঙ্গে চিরস্মরণীয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন :

নাহং তিষ্ঠামি বৈকুণ্ঠে যোগীনাং হৃদয়ে ন চ।
মদভক্ত যত্র গায়স্তি তত্র তিষ্ঠামি নারদঃ ॥

সঙ্গীত কী, কেন, কীভাবে? [ সঙ্গীত প্রশস্তি, সঙ্গীত মনীষা ] অমল দাশশর্মা , Indian Sitar Player, Anoushka Shankar, Author -audrey_sel, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 2.0 Generic license.
আনুশকা শঙ্করের সেতার বাদন

আমাদের দেশে সাধারণ লোকশিক্ষা থেকে উচ্চতম জ্ঞানের বাণী পর্যন্ত স্থরে প্রচারিত হয়েছে। এ দেশের চাষী, মজুর, মাঝি প্রভৃতি সকলেই গান গায়। ভিক্ষুকেরও প্রধান অবলম্বন হোল গান। পৃথিবীর আর কোথাও এমনটি দেখা যায় না। অর্থাৎ ভারতীয় সমাজজীবনের প্রাণের লক্ষণই হোল গান গাওয়া। আধুনিককালের বৈজ্ঞানিকেরা শস্যাদির উৎকর্ষসাধনেও সংগীতের উপযোগিতা প্রমাণ করেছেন। পশুপক্ষীরা যে সংগীতে মুগ্ধ হয়ে থাকে সে কথার পুনরুল্লেখ করাই বাহুল্য। সুতরাং সঙ্গীত প্রাণীমাত্রেরই জীবনে অমৃতধারা, এবং যে কোন প্রশংসাই এ বিষয়ে অকিঞ্চিৎকর। সংগীতের প্রশংসায় এবং এর মহত্ব বর্ণনায় দেশবিদেশের মনীষীগণ যে-সকল উক্তি করেছেন তার কয়েকটি এখানে দেওয়া হোল ।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “সঙ্গীত সর্বশ্রেষ্ঠ ললিতকলা এবং যারা তা বোঝেন তাদের নিকট উহা সর্বশ্রেষ্ঠ উপাসনা।”

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী স্থাপনকালে তার ভাষণে বলেছেন, “সঙ্গীত এবং ললিতকলাই যে জাতীয় আত্মবিকাশের প্রকৃষ্ট উপায় এ কথার পুনরুল্লেখ করাই বাহুল্য, যে জাতি এই দুটি বিঘা থেকে বঞ্চিত তারা চিরমৌন থেকে যায়।”

পাশ্চাত্য কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম কংগ্রেভ (William Congrave ) বলেছেন: “Music hath charms to soothe the Savage’s beast. To soften rocks, or bend a knotted oak… “

“জগদ্বিখ্যাত সেক্সপিয়ার বলেছেন :

“The man that hath no music in himself,
Nor is not mov’d with concord of sweet sounds,
Is fit for treasons, stratagems, and spoils;
The notions of his spirit are dull as night
And his affections dark as Erebus.
Let no such man be trusted, Mark the music.”

(Merchant of Venice-Act V-Scenel)

সংগীত যেন একটি আধ্যাত্মিক ভাষা, যার মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানব হৃদয়ের বিভিন্ন অভিব্যক্তি। সংগীতের মাধ্যমে আমরা পাই হৃদয়াবেগ প্রকাশের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র, যার প্রকাশ হয় সুর, ছন্দ ও কাব্যের ত্রিবেণী সঙ্গমে।

ভাবোদ্দীপনায় সংগীত :

ভাবোদ্দীপনায় সংগীতের মতো শক্তিশালী বোধ হয় আর কিছুই নেই। সুগায়কের কণ্ঠে নানাবিধ ভাবোদ্দীপক সংগীত সাধারণের অস্তরে যেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে তেমন বোধ করি আর কিছুই পারে না। ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে সংগীতের মোহিনীশক্তি সম্পর্কে শত শত কাহিনী প্রচলিত আছে। প্রাণীমাত্রের চিত্তবিনোদন তো বটেই এমন কি জড়পদার্থকেও যে সংগীত প্রভাবিত করতে পারে এমন কাহিনীও প্রচলিত আছে।

গ্রীসীয় পুরাণে আছে যে, সুকণ্ঠী গায়ক অর্ফিয়ুস তার প্রেয়সী ইউবিডাইসকে সংগীতের প্রভাবেই নাকি মৃত্যুরাঞ্জের কাছ থেকে উদ্ধার করেছিলেন।

আধুনিককালের সুরুতে এ দেশে এমন এক সময় ছিল যখন সংগীতব্যিাকে অনেকে ভাল চোখে দেখতেন না। সেই ভ্রান্ত ধারণা এবং কুসংস্কার সর্বপ্রথম দূর করার চেষ্ট। করেন এবং কৃতকার্য হন বাংলার গৌরব এবং সর্বপ্রথম বিদেশ থেকে সংগীতের সর্বোচ্চ সম্মান ডকটর অব মিউজিক (D. Mus) প্রাপ্ত, রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর। ইনি সর্বপ্রথম গেকোয়ারের মহারাজার সহযোগিতায় ‘ভারত সংগীত সম্মিলনী’র উত্থোগে সংগীত প্রচারের ব্যবস্থা করেন। ফলস্বরূপ বর্তমানে দেশের বিদ্যালয়গুলিতেও সংগীত ও ললিতকলা শিক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় এখনও অনেকের ধারণা সংগীত সাধনা অন্যান্য বিদ্যাশিক্ষায় মনোনিবেশের অন্তরায়।

এই প্রসঙ্গে জার্মানীর একজন প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিকের উক্তি উল্লেখযোগ্য : “Music far from a destruction in studies, would, as Doctors and Scientists have definitily proved, impart a soothing and questioning influence on the nerve centres and as such increase the working capacity of a brain worker | দৃষ্টান্তেরও অভাব নেই, যেমন জগদ্বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক এ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং পোল্যাণ্ডের ভূতপূর্ব মন্ত্রী পেডারওয়েস্কি বিখ্যাত বেহালাবাদক ছিলেন। বিখ্যাত সমালোচক ও ঔপন্যাসিক রোমারোলা পাকা পিয়ানো বাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিবেকানন্দ এবং বহু রাজা মহারাজাদের নামও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।

অতএব মন ও মস্তিষ্ক সতেজ ও সক্রিয় রাখার জন্য সংগীত ও ললিতকলা শ্রেষ্ঠ উপাদান হিসাবে স্বীকৃত। কারণ সংগীতচর্চা মনের একাগ্রতা বৃদ্ধি করার শ্রেষ্ঠতম উপায়, এবং মনের একাগ্রতা যে সর্ব কার্যে অপরিহার্য সে কথা বলাই বাহুল্য।

সংগীতের উৎপত্তি :
ন নাদেন বিনা জ্ঞানং ন নাদেন বিনা শিবম্ ।
নাদরূপং পর: জ্যোতির্ণাদরূপী স্বয়ং হরিঃ ॥

সঙ্গীদের অন্যতম ধ্রুবতারা বিদুষী কিশোরী আমনকার : Vidushi Kishori Amankar is singing Source Wikimedia
সঙ্গীদের অন্যতম ধ্রুবতারা বিদুষী কিশোরী আমনকার

অনাদ বিন জ্ঞান অসম্ভব, নাদ বিন। মঙ্গল অসম্ভব, পরজ্যোতিঃ নাদরূপ এবং স্বয়ং হরিও নাদরূপী বিষ্ণুপুরাণে আছে, সকল গীতিকা শব্দযুর্তিধর বিষ্ণুর অংশ। আমাদের দর্শনশাস্ত্রেও নাদকে ব্রহ্ম অর্থাৎ জগতের আত্মা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে জগৎ সংগীতময়। কারণ নদীর কল্লোলে, বনের মর্মরে, পশুপক্ষীর কলকাকলিতে সংগীত নিরন্তর প্রবাহিত। অর্থাৎ পৃথিবীর সব-কিছুর মধ্যেই সংগীত অনাদিকাল ধরে ঝংকৃত হয়ে চলেছে। মানবজাতি তার নৈসর্গিক শক্তির প্রভাবে ভাব, ভাষা, বিবিধ চিন্তা ও কামনা ব্যক্ত করে সংগীতের পরমোৎকর্ষ সাধন করেছে। কারণ মানুষ মাত্রেরই কমবেশি সংগীত-শক্তি আছে।

সংগীতের ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ধনী, দরিদ্র, সন্ন্যাসী, গৃহবাসী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক প্রভৃতি সকলেই বিচিত্র এবং অভিনব সৃষ্টির সাহায্যে সংগীতের উন্নতিসাধন ও নানাভাবে আলোকপাত করেছেন। কিন্তু কথা আগে না হ্রর আগে এ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। অর্থাৎ সংগীতের উৎপত্তি সম্বন্ধে নানারকম অভিমত প্রচলিত আছে। দেশবিদেশের মনীষীগণ এ সম্পর্কে যেসকল দার্শনিক, ধর্মভাবাপন্ন বা কাল্পনিক অভিমত প্রকাশ করেছেন, তার কয়েকটির এখানে উল্লেখ করা হোল ।

হিন্দুশাস্ত্রানুসারে কথিত আছে যে, বেদ চতুষ্টয়ের স্রষ্টা ব্রহ্মা সংগীতবিদ্যা সৃষ্টি করে শিবকে এবং শিব সরস্বতীকে দান করেছিলেন। তাই বীণা পুস্তক ধারিণী সরস্বতীকে এর অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে বন্দনা করা হয়। ক্রমে স্বর্গের দেবর্ষি নারদ ও অপ্সরা-কিন্নরীগণ সংগীতবিদ্যা লাভ করেন। পরবর্তীকালে ভূলোকের ভরত, রাবণ, হনুমান প্রভৃতি কঠোর সাধনায় সংগীতবিদ্যা লাভ করেন।

আরবে প্রচলিত একটি প্রবাদে কথিত আছে যে, হজরত মুসা পাহাড়ে ভ্রমণকালে একদিন একটি দৈববাণী শুনতে পান যে, “হে ধূসা তোমার ‘অসা’ (ফকীরদের কাছে থাকে, একপ্রকার অস্ত্র) দিয়ে সামনের পাথরে আঘাত করে।”, সেই নির্দেশানুসারে পাথরে আঘাত করলে তা সাত খণ্ডে খণ্ডিত হয়ে যায় এবং সেগুলি থেকে সাতটি জলধারা প্রবাহিত হতে থাকে। সেই সাতটি জলধারা থেকেই নাকি সপ্তস্থরের উৎপত্তি।

আরবের আর একটি প্রবাদে কথিত আছে যে, ‘মুসিকার নামে নম্বানাকে সাতটি ছিদ্রযুক্ত একপ্রকার পাখি ছিল যার ধ্বনিসমূহ থেকেই নাকি সপ্তস্থরের উৎপত্তি।

জেমস্ লঙ্, বলেছেন যে, শিশুর হাসিকান্না প্রভৃতি স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব থেকেই মানুষ সংগীত পেয়েছে। চার্লস ডারুইন বলেছেন, পশুপক্ষীর ধ্বনি

থেকেই সংগীতের উৎপত্তি। প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনও এই অভিমত সমর্থন করেছেন।

ফ্রয়েড, হার্ডার, রুশো, হার্বার্ট স্পেন্সর প্রমুখ পাশ্চাত্য মনীষীদের মতে মানুষ হৃদয়াবেগ অনুসারে কথোপকথনে নিজের অজ্ঞাতেই কিছু-কিছু স্থর প্রয়োগ করে থাকে, যার উৎকর্ষসাধনে সংগীতের উৎপত্তি।

পণ্ডিত J. Kunst তার Ethnomusicology গ্রন্থে বলেছেন: “Com petition in courting; imitation of bird calls; rhythms demanded by working procedures; the lulling of an infant, the release of passion; patterns of speach, on more speci fically, a primeval tonal communication that gave rise to both language and music; and calling from a distance, which requires an essentially musical treatment in order that the voice may carry.”- Encyclopaedia Britannica, (1971), (Vol. 15, p. 1077).

স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ বলেছেন যে, আদিম যুগে সংগীত ছিল মানুষের অন্তরে লুকানো। নানা কাজের মাঝে মানুষ নিজের চেয়ে শক্তিমান প্রকৃতিকে বুঝতো। বিভিন্ন পশুপক্ষীর ধ্বনিকে তারা মঙ্গলামঙ্গলের প্রতীক মনে করতো। অনুকরণপ্রিয় মানুষ সেই ধ্বনির সাহায্যে নিরর্থক ভাষার সংগীতে বন্দনা করতো বিশ্বদেবতার। সেই সংগীতে গোড়ার দিকে সম্ভবত: একটি কি দুটি মাত্র স্বরের ব্যবহার ছিল। ক্রমে সপ্ত স্থরের বিকাশ হয়। – স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ : ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস (১৯৬১)।

সঙ্গীতের ভূমিকা :

অতি প্রাচীনকালে আমাদের দেশে ওঁ ধ্বনি সহযোগে সংগীতের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই সংগীতের ভিত্তি ছিল আধ্যাত্মিকতা, বিষয় ছিল পরমেশ্বরের আরাধনা এবং বিশ্বপ্রকৃতির বন্দনা, আর উদ্দেশ্য ছিল আত্মোন্নতি তথ্য ঈশ্বরলাভ। সেই সংগীতের রূপ, রস, অলৌকিকতা প্রভৃতি সম্পর্কে গবেষকেরা নানাবিধ বর্ণনা ও আলোচনা করেছেন। সেই সকল আলোচনাদিতে কোন কোন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও এ বিষয়ে সকলেই একমত যে তৎকালীন সংগীতানুষ্ঠানাদির সঙ্গে আর্থিক কোন যোগ ছিল না। তা ছিল পুরোপুরি পারমার্থিক।

রামায়ণ মহাভারত তথা অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থাদিতে তৎকালীন অনুষ্ঠানাদির প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বহু বিচিত্র সংগীতানুষ্ঠানের উল্লেখ থাকায়, সংগীত যে তখন, অর্থাং খৃষ্টীয় শতাব্দীর বহু পূর্ব থেকেই অতি উচ্চ-কলাবিদ্যারূপে স্বীকৃত এবং প্রাচীন ভারতীয় সামাজিক অনুষ্ঠানাদির অপরিহার্য সঙ্গ ছিল সে কথা জানা যায়। আমাদের শাস্ত্রাদিতে সংগীতের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে উল্লিখিত উক্তিসমূহ উক্ত অভিমত সমর্থন করে। অতএব এ কথা অনস্বীকার্য যে, প্রাচীন ভারতে সংগীতের মর্যাদা ছিল ঐতিহ্যময় এবং তার ভিত্তি ছিল আধ্যাত্মিকতা। যুগপ্রবাহে তার নানা রূপবিবর্তন ঘটলেও ভারতীয় সংগীতসাধনায় আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি চিরদিনই প্রধান ৷

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান, Indian Classical Music Performance Sawai, Author -Tinkubasu, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 4.0 International license.
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান

সঙ্গীতকে সাধারণভাবে আধ্যাত্মিক বা আত্মোন্নতি, লোকরঞ্জন, অর্থোপার্জন প্রভৃতি নানা পর্যায়ভুক্ত করা যায়। কারণ এর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ক্রমবিবর্তিত হয়েই চলেছে। দরবারী সংগীতের প্রথম সংবাদ পাওয়া যায় মহারাজ সমুদ্র গুপ্তের রাজত্বে। তিনি স্বয়ং অতিগুণী সংগীতজ্ঞ (বীণাবাদক) ছিলেন। দরবারী সংগীতের চরম বিকাশ হয় মধ্যযুগে। তবে লোকরঞ্জন এবং অর্থোপার্জনই ছিল তার মূলগত উদ্দেশ্য। সুতরাং সংগীত আধ্যাত্মিক তথা শ্রেষ্ঠ কলাবিদ্যা এই মূল্যায়নের আদর্শ আপাতত গ্রন্থাদিতেই সীমিত, এমন কথা বলা বোধ করি অসঙ্গত নয়। কারণ সাধকের কঠোর সাধনা এবং নিষ্ঠার প্রকাশ প্রায় দুর্লভ হয়ে চলেছে।

বর্তমানে সংগীতচর্চ। তথা শিক্ষার প্রসার দ্রুত বেড়ে চলেছে। স্কুল-কলেজে পাঠ্যতালিকার অন্তভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সাধারনের সংগীতরুচি কতটুকু উন্নত হয়েছে, সে কথা চিন্তার বিষয়। অবশ্য এই অভিমত শুধুমাত্র উত্তর ভারতীয় সংগীতের ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে প্রযোজ্য। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, দক্ষিণ ভারতের সংগীত চিরদিনই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। সেখানকার ভৌগোলিক পরিস্থিতি, রীতিনীতি, ভাষা প্রভৃতি বহুবিধ কারণে নানা বিবর্তনের মধ্যেও প্রাস্তীয় কৌলীন্য রক্ষা পেয়েছে। তাই প্রাচীন ভারতীয় সংগীতরূপের আভাষ কিছু পরিমাণে কর্ণাটক সংগীতেই বিদ্যমান ।

রবীন্দ্রনাথ তার ‘সংগীতের মুক্তি’ প্রবন্ধে বলেছেন, “যে লোক মাঝারি সে তার মাঝখানের নির্দিষ্ট জায়গাটিতে সন্তুষ্ট থাকে না, সে প্রমাণ করতে চায় সেই যেন উপরওয়ালা। উত্তমের বিনয় স্বাভাবিক, অধমের বিনয় দায় পড়িয়া, কিন্তু জগতে সবচেয়ে দুঃসহ ঐ মধ্যম।” আমাদের দেশে গুণীজনের অভাব নেই, কিন্তু দেশের প্রায় সর্বক্ষেত্রের মত সংগীতের ক্ষেত্রেও মাঝারির প্রভুত্বের প্রাদুর্ভাব দুর্বার হওয়ায় তারা অসহায় বোধ করেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আদর্শহীন তার পরিচয় দিতে হয় এবং চটুল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সস্তা বাহবার প্রতি আগ্রহী হতে দেখা যায়। বিষয়টি মর্মাস্তিক এবং বিবেচনার দাবী রাখে। কিন্তু আমাদের অবস্থা হোল—“নাহি জানে কার দ্বারে দাড়াইবে বিচারের আশে।”

গুণীজনের আদর্শহীনতার আর একটি কারণ হোল, তাদের মননশীলতার অভাব। পণ্ডিত ভাতখণ্ডে সংগীতজ্ঞদের চার শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যেমন, ‘কলাকার’ ‘শাস্ত্রকার’ ‘গীতিকার’ ও ‘শিক্ষক’। এর সবগুলি বিভাগে বিচক্ষণ সংগীতজ্ঞ কদাচিৎ মেলে। অবশ্য এর কোন একটি বিভাগে পারদর্শ হওয়াও সহজ নয়। তবে তেমন গুণীজন আমাদের দেশে বহু আছেন। কিন্তু সকল সংগীতজ্ঞেরই কিছুটা অন্তত জ্ঞান এর সবগুলি শাখাতে থাক। অবশ্য কর্তব্য। কারণ নিরক্ষর কলাকার, স্বরজ্ঞানহীন শাস্ত্রকার, সংগীতজ্ঞানহীন গীতিকার এবং অরসিক তথা শাস্ত্রজ্ঞানহীন শিক্ষক এঁরা সকলেই প্রায় অঙ্কের মতো সংগীতসমুদ্রের তীরে বসে হাহুতাশ করে থাকেন।

যন্ত্র সঙ্গীতের বিভিন্ন যুগের যন্ত্র, Indian Classical Music Instruments, Gallery15 national museum india, Author -Nomu420, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 3.0 Unported license.
যন্ত্র সঙ্গীতের বিভিন্ন যুগের যন্ত্র

কিছুকাল আগে এক সংগীতানুষ্ঠানে কিছু বিদেশী শিল্পীর গান শুনেছিলাম । তার৷ ভারতীয় রাগ-সংগীত এবং রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেছিলেন। তাঁদের উদাত্ত কণ্ঠস্বর, সাবলীল গায়কী এবং সাধনার নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভারত সরকার বিদেশে ভারতীয় সংগীত প্রচারে যত্নশীল। বিদেশীরাও পরম আগ্রহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন। হয়তো এমন দিন আসবে যখন আমাদের দেশের অন্যান্য বিঘার মতো সংগীতের পরিচয় নিতেও আমাদের বিদেশে যেতে হবে।

আমাদের জাতীয় ত্রুটি হোল যে, আমাদের সাংস্কৃতিক উন্নাসিকতার অস্ত নেই। আমরা মনে করি, আমাদের সংগীত ও সংস্কৃতি চরম প্রগতিশীল, এবং আমরা পরম সংস্কৃতিবান অথচ বিদেশী চটুল সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি চট করে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। আমরা বহু বিচিত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করি, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃতির নামে যা অনুষ্ঠিত হয়, তাকে অত্যাচার বললেও কম বলা হয়। কোথাও তা শুধুমাত্র সৌখিন আমোদের বিষয়। কেহ বা ইংরেজি শিক্ষা বা অর্থের জোরেই নিজেকে উত্তম সমঝদার বলে জাহির করে খুশি হন।

আমাদের সংগীত ও সংস্কৃতির ভূমিকা আজ কোথায় সে বিষয়ে বিবেচনার অবকাশ আছে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তাই শক্তিমান গুণীজনের হস্তক্ষেপ এবং সাধারণের সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করি। আর এই সব ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধনে আমাদেরই আগ্রহশীল ও সচেষ্ট হতে হবে।

সঙ্গীতের সমকাল বিভাজন :

কোন মানুষের জীবনী যেমন তার শৈশব বাদ দিয়ে অসম্পূর্ণ, কোন বিষয়ের বর্ণনাও তেমনি যথাসম্ভব প্রথম থেকে আরম্ভ করাই যুক্তিযুক্ত। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেছেন : “…It is the duty of the historian not to let that past be forgotten. He must trace these gifts back to their sources, give them their due place in time scheme, and show how they influenced or prepared the succeeding ages.” – Sir Jadu Nath Sarker: India through Ages. 1951.

সংগীত সাধনায় আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রধান হলেও ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির উপযোগিতাও কম নয়। কারণ ব্যবহারিক (practical) এবং ঔপপত্তিক (theoretical) অংশদ্বয়ের মধ্যে ছায়া ও কায়ার মতো নিবিড় সম্বন্ধ আছে।

ইতিহাসের ভিত্তিতে জানা যায় যে, ভারতবর্ষের পূর্বাচার্যেরাই সমগ্র বিশ্বকে জ্ঞানবিজ্ঞানের সমৃদ্ধি দান করে গৌরবোজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন। দেশ বিদেশের মনীষীগণ সে কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন। যার উল্লেখ করে স্বামী অভেদানন্দ বলেছেন:

“…If we read the writings and other historical accounts left by Pliny, Strabo, Magesthenes, Herodotus, Ptophyry and other ancient authors of different countries, we shall see how highly the civilization of India was regarded by them. In fact between the years 1500 and 500 B.C., the Hindus were so far advanced in religion, metaphysics, philosophy, science, art, music and medicine that no other nation could stand as their rival, or compete with them in any of these branches of knowledge.” – Swami Abhedanand: India and her people. 1905-6.

পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখন্ডে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে লিপিবদ্ধ করতে যার অবদান অনস্বীকার্য, India Vishnu Narayan Bhatkhande, Author-Unknown, Public Domain Image as per Indian Copyright Act 1911.
পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখন্ডে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে লিপিবদ্ধ করতে যার অবদান অনস্বীকার্য

অর্থাৎ প্রাচীন ভারতের সঙ্গে বিশ্বের সম্পর্ক আধুনিককালের মতো অক্ষমতা বা দীনতাপূর্ণ ছিল না। প্রাচীন সেই সভ্যতা গড়ে উঠতে বহুকাল সময় লেগেছিল। কেননা কোন দেশের জ্ঞান বিকাশ যুগে যুগে বিভিন্ন প্রতিভার স্পর্শে হয়ে থাকে। পরিবর্তনশীল জগতে নিত্য নবীন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অন্যান্য বিষয়ের মতো সংগীতকলাও বিকাশলাভ করেছে।

মাটির স্তর দেখে যেমন ভূতত্ত্ববিদগণ নানাবিধ পৌরাণিক তথ্যাদি অনুমান ও প্রমাণ করেছেন, সংগীত সম্বন্ধে তেমন কোন প্রক্রিয়া না থাকলেও হরপ্পা, মহেঞ্জোদড়ো প্রভৃতি নানা স্থানের খননকার্যে প্রাপ্ত বহু বিচিত্র বাদ্যযন্ত্র ও অন্যান্য দ্রব্যসম্ভার থেকে গবেষকগণ বহুবিধ তত্ত্ব ও তথ্যাদি অনুমান ও প্রমাণ করেছেন। তাদের সিদ্ধান্ত হোল, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সংগীত প্রচলিত ।

সংগীত বিবর্তনের এই সুদীর্ঘকালকে কোন সঠিক পর্যায়ক্রমে ভাগ করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ, হয়তো বা অসম্ভব। কারণ এ সম্পর্কে এত মতপার্থক্য আছে যে, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন। তবে সংগীতালোচনার সুবিধার্থে মোটামুটিভাবে এইরূপে বিভক্ত করা হোল—

(১) প্রাগৈতিহাসিক কাল : ৫০০০ (?) থেকে ৩০০০ (?) খৃষ্টপূর্বাব্দ।
(২) বৈদিক যুগ :
(ক) অতি প্রাচীন বৈদিক যুগ : ৩০০০ থেকে ৬০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ।
(খ) প্রাচীন বৈদিক যুগ : খৃষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে খৃষ্টীয় ১১শ শতাব্দী।
(৩) মধ্য বা মুসলমান যুগ : ১১শ শতাব্দী থেকে ১৮শ শতাব্দী।
(৪) আধুনিক বা ইংরেজ যুগ : ১৮ শতাব্দী থেকে ১৯৪৭ খৃষ্টাব্দ ।
(৫) স্বাধীন ভারত : ১৯৪৭ খৃষ্টাব্দ থেকে পরবর্তীকাল।

সঙ্গীতের প্রাগৈতিহাসিক কাল ( ৫০০০-৩০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ) :

যদিও প্রাগৈতিহাসিক বলতে আমরা ইতিহাস আরস্তের পূর্বের শিকারী ও কৃষক (hunter and farmer) সম্প্রদায়ের সময়কাল বুঝি, কিন্তু সেই সময়কাল যে কতদূর বিস্তৃত এবং সে সম্পর্কে এত মতপার্থক্য বিদ্যমান যে, এ বিষয়ে কোন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আজ আর সম্ভব নয়। বৃটিশ নৃতত্ত্ববিদ fat (Dr. L. S. B. Leakey) Tanzania’s Olduvai Gorge কাজ করার সময়ে খননকার্যে প্রাপ্ত জীবাশ্ম (fossil) পরীক্ষা করে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, মানবজাতির বিকাশ খৃষ্টপূর্ব আঠারো লক্ষ বছর কাল আগে হয়েছিল। তিনি আরো বলেছেন যে, ওই ধরনের জীবাশ্ম ভারতবর্ষের Soan, পিকিংয়ের নিকটবর্তী Chou-kou-tien এবং জাভাতেও পাওয়া গেছে [ Prehistoric and Primitive man: Dr. Andreas Lommel ]। অতএব এই মতানুসারে মানবজাতির বিকাশ উক্ত স্থানগুলিতে সুদীর্ঘ ১৮ লক্ষ বছর খৃষ্টপূর্বাব্দে হয়েছিল বলে ধরে নিতে হয়।

তবে সিন্ধু উপত্যকা (Indus Valley) যে ভারতীয় সভ্যতার আদিভূমি সে বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। এই সিন্ধু উপত্যকাতেই সর্বপ্রথম হরপ্পা (পাঞ্জাব) ও মহেঞ্জোদড়ো (সিন্ধু ) নগরদ্বয় স্থাপিত হয়েছিল। খননকার্যে ওই অঞ্চলের ৩৭০ মাইলের মধ্যে ওইরূপ উচ্চসভ্যতায় বিকশিত ও উন্নত আরো প্রায় একশত নগর আবিষ্কৃত হয়েছিল। প্রথম আক্রমণকারী আর্যরা নাকি পারস্ত থেকে ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবেশ করে এবং খৃষ্টপূর্ব ১৫০ অব্দে তারাই খৃষ্টপূর্ব ৩য়-২য় সহস্রাব্দের উক্ত নগরগুলিকে ধ্বংস করেছিলেন পরবর্তীকালে ক্রমে তারা সিন্ধু ও গাঙ্গেয় উপত্যকাতে বসতি বিস্তার করেন।

আফতাব এ মৌসিকি ওস্তাদ ফৈয়াজ খান, Ustad FAIYAZ KHAN, Author- Unknown, Public Domain Image as Per Indian Copyright Law
আফতাব এ মৌসিকি ওস্তাদ ফৈয়াজ খান

সেই আর্যরাই নাকি ভারতবর্ষে সংস্কৃত ভাষা, বৈদিক সংস্কৃতি এবং অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ সাধন করেছিলেন [[ Jeannine Auboyer [ The Oriental world: Roger Goepper ] ] [ Landmarks of the World’s Art ] 1971 ]। ২ তবে সংগীতালোচনার স্থবিধার্থে অতি প্রাচীন বা প্রাগৈতিহাসিক কালকে এই গ্রন্থে ৫০০০ থেকে ৩০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কাল স্থির করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানের খননকার্যে প্রাপ্ত বাশী, মৃদঙ্গ, ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক তন্ত্রীযুক্ত বীণা, ব্রোঞ্জের নৃত্যশীল। নারীমূর্তি প্রভৃতি থেকে গবেষকগণ নানাবিধ অভিমত প্রকাশ করেছেন। যেমন, কেহ কেহ তৎকালীন সংগীতে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, খাঘ, রোগ, পূজা, যুদ্ধ প্রভৃতি শ্রেণীবিভাগের কথা বলেছেন।

এমন কি সেই সংগীতের প্রভাবে তারা নাকি নানা অলৌকিক ঘটনাও ঘটাতে পারতেন। অবশ্য এইরূপ ধারণা বা সংস্কার এখনও যাযাবর, বেদে প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত দেখা যায়। তৎকালীন সংগীত সম্পর্কে Dr. Felber বলেছেন : “…Speach and music have descended from a common origin, in a primitive language, which was neither speaking nor singing but something both”… [ Dr. Erwin Felber: The Indian Music of the Vedio and the Classical Period. 1912] তবে খননকার্যে প্রাপ্ত বাদ্যযন্ত্রাদি পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে অনেকেই একমত যে, তৎকালীন সংগীতে অন্তত চারটি স্বরের ব্যবহার ছিল।

সঙ্গীতের বৈদিক যুগ :

(খৃষ্টপূর্ব ৩০০০-১১শ শতাব্দী)
খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ (তিন হাজার) থেকে খৃষ্টীয় ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত সময় কালকে অতিপ্রাচীন এবং প্রাচীন বৈদিক যুগ বলে স্থির করা হয়েছে। ভারতীয় আর্যেরা তখন সকল বিষয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিলেন। বৈদিক যুগকে তাই সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান বিকাশের উৎস এবং ভারতবাসীরাই সকল জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি দান করে শাস্তি ও মিলনমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন বলে স্বীকৃত। অর্থাৎ ভারতবর্ষ একটি স্থপ্রাচীন দেশ এবং সকল দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদিভূমি। শিল্পী E. B. Havell বলেছেন :

“…It is a profound mistake to regard the Indian Aryans as an uncreative or inartistic race; for it was Aryans philosphy, which makes all India one today, that synthesised all the foreign influence which every invader brought from outside and moulded them to its own ideals.”[ E. B. Havell: The Ideals of Indian Art. 1920] Prof. Max Muller: Giflord Lectures. 1889]

আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ২য় সহস্রাব্দে ভারতবর্ষে আর্যগণের অভ্যুদয় হয়, তারা বিদ্যা-বুদ্ধিতে খুব উন্নত ছিলেন। যদিও হিন্দু সংস্কারানুসারে বেদ চতুষ্টয়ের মন্ত্রসমূহকে পরমেশ্বরের বাণী বলে আমরা বিশ্বাস করি, কিন্তু ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে বিভিন্ন আর্য ঋষিরাই ওই গ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন। অবশ্য হিন্দুশাস্ত্রাদিতেও এ কথারও সমর্থন আছে। তবে তাদের দেবতাদির নামের উল্লেখ করায় সম্ভবত ওইরূপ সংস্কারের সৃষ্টি হয়েছে। সেই আর্যরাই হরপ্পা, মহেঞ্জোদড়ো, ঝুকর, চন্নদড়ো প্রভৃতি সিন্ধু উপত্যকার অভিপ্রাচীন নগরগুলি এবং তার শিল্প, সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন।

তবে বেদচতুষ্টয়ের রচনাকাল নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য আছে। কারণ কেহ খৃষ্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দে, কেহ খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে আবার কেহ কেহ্ তারও বহু পূর্বে এগুলি রচিত হয়েছিল বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। জার্মান মনীষী পণ্ডিত Max Muller এই প্রসঙ্গে সুন্দর উক্তি করেছেন :

“ that we cannot hope to fix a terminus a quo. Whether the Vedic were composed 1000 or 1500 or 2000 or 3000 B.C., no power on earth will ever determine…” তিনি অন্যত্র বলেছেন: “. It may be very brave to postulate 2000 B.C., or even 5000 B.C, as a minimum date for the Vedic hymns, but what is gained by such bravery? Whatever may be the date of the Vedic hymns whether 1500 or 15000 B.C., they have their own unique place and stand by themselves in the literature of the world.” [ Indian Philosophy. 1912]

অতএব এগুলির রচনাকাল এখন পর্যন্ত অমীমাংশিতই থেকে গেছে। তবে খননকার্যে যে সিন্ধুসভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার উৎপত্তি কালের সঙ্গে যে এগুলির রচনাকালের যোগসূত্র আছে সে বিষয়ে অনেকেই একমত ।

বৈদিক গ্রন্থ :

প্রাচীন ঋষিগণ যে সকল বৈদিক সাহিত্য রচনা করেছেন সেগুলিকে তারা সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ নামে চারভাগে বিভক্ত করেছেন।

সংহিতা :
ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্ব এই বেদ চতুষ্টয়কে সংহিতা বলে। এগুলি পথে। রচিত এবং ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সাহিত্য। এগুলির মধ্যে আবার ঋগ্বেদ সব থেকে প্রাচীন। বৈদিক গ্রন্থাদিতে ‘ত্রয়ী’ শব্দের উল্লেখ থাকায়, অনেকে প্রথম তিনটিকেই প্রামাণ্য বলে মনে করেন। তবে অধিকাংশ পণ্ডিতদের মতে চারটি বেদই সংহিতারূপে প্রামাণ্য এবং অথর্ববেদটি অনেক পরবর্তীকালের রচনা।

আমাদের আদি সাহিত্য চর্যাপদে সঙ্গীতের ব্যবহার দেখা যায়, Chorjapod, Rajshahi College Library Inside, Author - Mohmoni, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 4.0 International license.
আমাদের আদি সাহিত্য চর্যাপদে সঙ্গীতের ব্যবহার দেখা যায়

ঋগ্বেদে সহস্রাধিক স্তোত্রে প্রকৃতি ও দেবতাদের স্তুতিগান করা হয়েছে। যজুর্বেদে যাগ-যজ্ঞের মন্ত্র-তন্ত্র এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির বর্ণনা আছে। সামবেদ ঋগ্বেদের শ্লোকগুলির অনুসরণেই রচিত। অর্থাৎ ঋকের যে শ্লোকগুলি যাগ যজ্ঞকালে স্থরে আবৃত্তি করা হোত তাই সামবেদ। অথর্ববেদে আছে বিচিত্র রহস্যময় সাংকেতিক চিহ্নসমূহ; পৃথিবীর স্তব; সৃষ্টি রহস্য; রোগ, দানব ও হিংস্র জন্ত থেকে রক্ষার ও চিকিৎসার মন্ত্রাদি ।

ব্রাহ্মণ :
প্রতিটি বেদের ব্রাহ্মণ নামে বৈদিক মন্ত্রসমূহের ব্যাখ্যা আছে। আসলে পূজা-পার্বণ ও যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠানবিধি প্রভৃতি নিয়েই এই ব্রাহ্মণ সাহিত্যের বিকাশ।

আরণ্যক :
ব্রাহ্মণের পরিশিষ্ট ভাগ আরণ্যক নামে পরিচিত। বার্ধক্যে যারা সন্ন্যাসধর্ম ( অরণ্যবাস) পালনেচ্ছু তাদের উদ্দেশে অপেক্ষাকৃত সহজ যাগ-যজ্ঞ রীতি সন্নিবিষ্ট করে আরণ্যক অংশটি রচিত। এতে অনুষ্ঠানের পরিবর্তে দার্শনিক চিন্তার প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

উপনিষদ বা বেদান্ত :
আরণ্যকগুলির জন্য গভীর চিন্তার ফলে যে দার্শনিক জ্ঞানলাভ হয়েছিল তার প্রকাশকে উপনিষদ বা বেদান্ত বলা হয়। কারণ কালক্রমে যাগ-যজ্ঞের জটিলতা ও অমানুষিকতা ত্যাগ করে ব্রহ্মজ্ঞানের আলোচনা আরম্ভ হয়। সেই আলোচনাই উপনিষদ, যাকে বেদের অস্ত বলে, এবং এইখানেই বৈদিক সাহিত্যের শেষ বলা হয়।

বেদাঙ্গ :
বেদপাঠ ও যজ্ঞের অনুষ্ঠান শিক্ষার জন্য বেদাঙ্গ রচিত হয়েছিল। বেদপাঠ বলতে বেদগান, সামগান প্রভৃতি বোঝায়। বেদ সর্বদা স্থরে আবৃত্তি করার প্রথা এবং তার সঙ্গে বাঘ ও নৃত্যেরও প্রচলন ছিল। অর্থাৎ বৈদিক যুগে সংগীতের পূর্ণ বিকাশ ছিল। বস্তুত বেদপাঠের ছয়টি অপরিহার্য বিদ্যাকে বেদাঙ্গ বলে। যেমন, ১। শিক্ষা (উচ্চারণ), ২। ছন্দ, ৩। ব্যাকরণ, ৪। নিরুক্ত, ৫। জ্যোতিষ এবং ৬। কল্প। নিরুক্ত ও ব্যাকরণ রচনায় যাস্ক ও পাণিনীর নাম অক্ষয় হয়ে আছে। এই ছয়টি বিদ্যার মধ্যে কল্পসূত্রটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, এর বিভিন্ন অংশ শ্রোতস্বত্র, গৃহ্যসূত্র, শুল্বহত্র ও ধর্মসূত্র নামে পরিচিত।

শ্রোতস্থত্রে গার্হস্থ জীবনের বৈদিক কর্মাদির তথা যাগ-যজ্ঞের বিধি বিধানাদির বর্ণনা আছে। গৃহস্থত্রে আছে গার্হস্থ জীবনে পালনীয় তথা বিবাহাদির রীতিনীতি। শুল্বসূত্রে যাগ-যজ্ঞের বেদী প্রস্তুতের পরিমাপ দেওয়া আছে, যার থেকে জ্যামিতির উদ্ভব হয়েছে। আর ধর্মসূত্রে আছে সমাজ ও শাসন সম্পর্কিত বিবিধ আইন বিষয়ক বিধিবিধানগুলি। যার থেকে পরবর্তী কালে মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা, স্মৃতি প্রভৃতি গ্রন্থাদি রচিত হয়েছিল।

ষড়দর্শন :
ষড়দর্শন বলতে কপিলের ‘সাংখ্য’, পতঞ্জলির ‘যোগ’, গৌতমের ‘ন্যায়’, কণাদের ‘বৈশাষিক’, জৈমিনীর ‘পূর্বমীমাংসা’ এবং ব্যাসের ‘উত্তর মীমাংসা’, ‘দর্শন’ বা ‘বেদান্ত দর্শন’ বোঝায়।

ব্রাহ্মণ সাহিত্য, ধর্মসূত্র বা হিন্দুস্মৃতি :
ব্রাহ্মণ সাহিত্যগুলির সঙ্গে পুরোহিতদের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। যাজিক কল্পসূত্রের ভিত্তিতে রচিত ধর্মসূত্র বা হিন্দুস্মৃতি প্রভৃতির থেকে ক্রমে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র ( রাষ্ট্রনীতি), সংগীতশাস্ত্র, নাট্যশাস্ত্র, ধনুর্বেদ, কারুকর্ম, স্থাপত্যবিদ্যা, হস্তিশাস্ত্র, অশ্বসূত্র, কামশাস্ত্র প্রভৃতির বিকাশ হয়। অর্থাৎ বেদ চতুষ্টয়কে কেন্দ্র করে যে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার রচিত হয়েছিল এবং তাতে ভারতীয় পূর্বাচার্যদের যে মনীষার পরিচয় পাওয়া যায় তা আজও বিশ্বকে বিস্মিত করে।

গীতশ্রেণী :
বৈদিক গানে সাধারণত তিনটি, চারটি বা পাচটি পর্যন্ত স্বর ব্যবহৃত হোত। তবে ক্রমে ছয়টি এবং সাতটি স্বরযুক্ত সামগানেরও বিকাশ হয়েছিল। বৈদিক যুগের বিভিন্ন স্তরে যে বিভিন্ন শ্রেণীর গানের উদ্ভব হয়েছিল সে কথার উল্লেখ অনেকেই করেছেন। পাণিনীয় শিক্ষায় আছে :

আর্টিক গাথিকশ্চৈব সামিকশ্চ স্বরান্তরঃ ।
ঔড়বং ষাড়বশ্চৈব সম্পূর্ণশ্চেতি সপ্তমঃ ৷৷

এই শ্রেণীবৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করে নারদী শিক্ষায় বলা হয়েছে—

একস্বর প্রয়োগোহি আর্টিক সোহাভিধীয়তে ।
গাথিকো দ্বিশ্বরোজ্ঞেয় স্বিস্বরশ্চৈব সামিকঃ ।।
চতুঃস্বর প্রয়োগোহি কথিতস্তু স্বরাস্তরঃ।
ঔডুব পঞ্চভিশ্চৈব ষাড়বঃ ষট্ স্বরো ভবেৎ ।।
সম্পূর্ণ: সপ্তভিশ্চৈব বিজ্ঞেয়ে। গীতষোক্তৃভিঃ ৷৷

অর্থাৎ আর্টিক একস্বর, গাথিক দুই স্বর, সামিক তিন স্বর, স্বরাস্তর চারস্বর, ঔড়ব পাঁচস্বর, ষাড়ব ছয়স্বর এবং সম্পূর্ণ সাত স্বর যুক্ত গান। বৈদিক যুগে এই সাত শ্রেণীর গানের প্রচলন ছিল।

আদি শাস্ত্র অনুসারে গীত, বাদ্য, নৃত্য - এই তিনে মিলে সঙ্গীত [A seated Indian woman plays a sitar next to a garden pond.]
আদি শাস্ত্র অনুসারে গীত, বাদ্য, নৃত্য – এই তিনে মিলে সঙ্গীত

বৈদিক স্বর:
বৈদিক সাতটি স্বরকে যথাক্রমে ক্রুষ্ট, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, মন্ত্র ও অতিস্বাৰ্য বলা হোত। তবে বৈদিকযুগেই যে লৌকিক সাতটি স্বর এবং তিন স্থানের বিকাশ হয়েছিল সে কথাও পাণিনীয় শিক্ষায় জানা যায় :

উদাত্তে নিষাদ গান্ধারবোনুদাত্ত ঋষভধৈতৌ।
স্বরিতঃ প্রভবা হোতে ষড়জমধ্যমপঞ্চমাঃ ।।

অর্থাৎ উদাত্তে (তার) নি, গ, অনুদাত্তে (মন্ত্র) রে, ধ, এবং স্বরিতে ( মধ্য ) সা, মওপ।

যম :
মহর্ষি শৌনক স্বরকে বলেছেন ‘যম’ – “ত্ৰিষু মদ্ৰাদিষু স্থানেষু একৈকস্মিন সপ্ত সপ্ত যমাঃ ভবস্তি।” অর্থাৎ মন্দ্রাদি তিনটি স্থানে সাতটি করে যম (স্বর ) আছে৷ মনে হয় স্বরের সংজ্ঞা হিসাবে ‘যম’ শব্দটি সর্বাধিক যুক্তিপূর্ণ মহর্ষি পতঞ্জলি ‘যম’ শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেছেন—

যমনিয়মাসনপ্রাণায়ামপ্রত্যাহারধারণাধ্যানসমাধয়োঽষ্টবঙ্গানি
অহিংসাসত্যাস্তেয় ব্রহ্মচর্যাপরিগ্রহা যমা:।

অর্থাৎ যমের নিয়ম হোল অহিংসা, চুরি বা গ্রহণ না করা, সত্য ও ব্রহ্মচর্য পালন করা প্রভৃতি। অর্থাৎ যম সর্বদ। নিয়ামক (Regulator) হয়ে থাকে।

স্বরমণ্ডল :
বৈদিকযুগের গোড়ার দিকে না হলেও কিছুকালের মধ্যেই যে স্বরমণ্ডলের সমাবেশ হয়েছিল সে কথা নারদী শিক্ষায় জানা যায়। তিনি এর পরিচয়ে বলেছেন –

সপ্তস্বরাস্ত্রয়োগ্রাম মুর্ছনাস্তেকবিংশতি।
তানা একোনপঞ্চাশদিতেত্তৎ স্বরমণ্ডলম্ ॥

অর্থাৎ সাতটি স্বর, তিনটি গ্রাম, একুশটি মূর্ছনা ও একান্নটি তানের সমাবেশকে স্বরমণ্ডল বলে।

বৈদিক যুগে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদের যুগ, ব্রাহ্মণ সাহিত্যাদির যুগ, যাস্ক ও পাণিনীর যুগ, শিক্ষা ও প্রাতিশাখ্যের যুগ প্রভৃতি বিভিন্ন স্তরে সঙ্গীত, ভাষ| প্রভৃতির নানা বিবর্তন হয়েছিল। তৎকালীন মনীষীদের রচিত গ্রন্থাদিতে যেসকল সঙ্গীতিক বা সাংগীতিক উপাদানাদি পাওয়া যায় অতঃপর তার কিছু সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হোল।

সঙ্গীতের ক্রমবিকাশ :

সঙ্গীত শাস্ত্রাদিতে কথিত আছে যে, অতি প্রাচীনকালে ব্রহ্মা সংগীতবিদ্যা সৃষ্টি করে শিবকে এবং শিব সরস্বতীকে দান করেন; পরবর্তীকালে ভূলোকের ভরত, নারদ প্রমুখ মহর্ষিরা কঠোর সাধনায় সংগীতবিদ্যা লাভ করেন। তবে ইতিহাসের ভিত্তিতে আমরা জানি যে, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মতঙ্গের সময় পর্যন্ত বৈদিক যুগ হিসাবে স্বীকৃত এবং তখন সামগান, গাথা প্রভৃতির প্রচলন তথা চার থেকে সপ্ত স্থরের বিকাশ হয়েছিল। এর মধ্যে আবার ভরত-পূর্ব এবং ভরতের পরবর্তীকালকে যথাক্রমে ক্লাসিকাল যুগ ও বৈদিক যুগ বলা হয়। অর্থাৎ রামায়ণ, মহাভারত, নাট্যশাস্ত্র প্রভৃতির রচনাকালকে নিয়ে কিছু অংশ হোল ক্লাসিকাল যুগ । যখন গ্রাম, মূর্ছনা, জাতি প্রভৃতি সংগীত পদ্ধতির প্রচলন ছিল।

বাদ্য সঙ্গীতের যুগলবন্দী, Indian culture music, Author - Marshalldecouthb 1810231, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 4.0 International license.
বাদ্য সঙ্গীতের যুগলবন্দী

সঙ্গীতে তখন রাগের বিকাশ ছিল কিনা, তা নিয়ে মতভেদ আছে। সংগীতশাস্ত্রী P. Sambomoorthy বলেছেন: “The vedic hymns of this period constitute the oldest hymnal music of humanity. During the post-Bharata period, the raga concept steadily grew until it reached its perfection in the time of Matanga [ P. Sambomoorthy History of Indian Music. 1960]. অবশ্য তখন রাগ শব্দের প্রচলন না থাকলেও, যাবতীয় সংগীতে রঞ্জকতা যে পরিপূর্ণরূপে ছিল সে বিষয়ে অনেকেই একমত।

রামায়ণ মহাভারতাদিতে বহু বিচিত্র সাংগীতিক উপাদানাদির পরিচয় পাওয়া যায়। সেই সময়কালকে সামগানের যুগ বলা যায়। সামগানোত্তর যুগে জাতিরাগাদির বিকাশ হয়। অর্থাৎ পরবর্তী ক্রমবিকাশ হিসাবে জাতিরাগ, গ্রামরাগ, অভিজাত দেশীরাগ প্রভৃতির স্তরগুলি উল্লেখযোগ্য।

ক্লাসিকাল যুগের শেষের দিকে কোহল, যাষ্টিক, বিশ্বাবস্থ মতঙ্গ প্রমুখ সংগীতাচার্যেরা শুদ্ধিষজ্ঞের ব্যবস্থা করেন। যার সাহায্যে বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক (folk) ও জাতীয় স্বর রচনাগুলিকে পরিশুদ্ধ করে শাস্ত্রীয় রাগ সঙ্গীত বা অভিজাত দেশীসংগীতের পর্যায়ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ তখন গ্রামরাগাদির সঙ্গে সঙ্গে জন্য জনক রীতিতে ভাষা, বিভাষা, অন্তরভাষা প্রভৃতি অভিজাত দেশীরাগের বিকাশ হয়। ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিনীর বিকাশ হয় আরো পরবর্তীকালে। তখন রাগগুলি ঋতু অনুসারে গাওয়ার প্রথা ছিল। যেমন গ্রীষ্মে—দীপক, বর্ষায়— মেঘ, শরতে— ভৈরব, হেমস্তে—শ্র, শীতে— মালকোষ এবং বসস্তে- হিন্দোল। ( ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থে এই রাগনামগুলিতে কিঞ্চিত পার্থক্য লক্ষিত হয় )।

রাগ ছয়টির জন্য ছয়টি করে রাগিনী (ভার্যা ) ছিল (এ বিষয়েও মতপার্থক্য বিদ্যমান ) । সেই রাগ-রাগিনী পদ্ধতিই কালের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রচলিত থাট-রাগ পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়েছে অর্থাৎ বর্তমান রাগ সংগীতে ক্লাসিকাল যুগের সংগীতধারাই প্রবাহিত। কিন্তু তাই বলে কোনমতেই একে মার্গসংগীত আখ্যা দেওয়া যায় না। কারণ অত্যন্ত কঠোর সাংস্কৃতিক নিয়মাবদ্ধ সেই মাৰ্গসংগীত বৈদিক যুগেই লপ্ত হয়েছিল।

ভারতীয় সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ রত্ন হোল সংগীত। অতি প্রাচীনকাল থেকে এর গৌরবময় ঐতিহ্য বিরাজিত। যখন বিশ্বের কোন দেশ সাধারণ লোক সংগীতের স্তরেও পৌঁছাতে পারে নি, তখন থেকেই ভারতবর্ষে সংগীতকলার পরিপূর্ণ বিকাশ ছিল। ভারতীয় সংগীত ক্রমবিকাশের কাহিনী অত্যস্ত বৈচিত্র্যময়, এবং এর চর্চা শুধুমাত্র কলাবিষ্ঠার চর্চাই নয়, একটি জাতির মনীষা সম্পর্কেও জ্ঞানলাভ করা। যারা পৃথিবীকে তাল ও স্থর সমন্বিত এমন একটি বিদ্যা দান করেছেন।

স্বরাক্ষর পদ্ধতির (সা, রে, গ, ম প্রভৃতি) আবিষ্কার সর্বপ্রথম হয় ভারতবর্ষে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় খৃষ্টীয় ১ম শতাব্দীর নারদীশিক্ষাগ্রন্থে । পাশ্চাত্য সংগীতে যার বিকাশ হয় ১০ম শতাব্দীতে (পাশ্চাত্য সংগীত প্রসঙ্গ দ্রষ্টব্য)।

নাট্যশাস্ত্রকার বর্ণিত সাংগীতিক উপাদানাদি তথ। বাঘযন্ত্রাদির শ্রেণীবিভাগ ( তত, সুষির, অবনদ্ধ ও ঘন— যথাক্রমে Chordophones, Aerophones, Membranophones & Autophones ) প্রভৃতি অত্যস্ত বিজ্ঞানসম্মত হিসাবে বিশ্বের সর্বত্র স্বীকৃতিলাভ করেছে।

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের প্রধান সহগামী যন্ত্র ছিল বীণা, যার মধ্য যড় জ ‘আধার ষড়‚জ’ হিসাবে স্বীকৃত ছিল। অবশ্য তার সঠিক রূপ (pitch/ vibration) নিরূপণ করা আজ কঠিন। কারণ বীণার দৈর্ঘ্য প্রভৃতির উপরে তা নির্ভরশীল ছিল। তবে আধার যড় জকে কেন্দ্র করেই সর্বদা সামগান লীলায়িত ছিল এমন কথা মনে করা অনুচিত, কারণ ক্রমশ তা মধ্যম, পঞ্চম, আদি স্বরগ্রামে উত্থিত হোত। যে রীতি ঋগ্বেদ মন্ত্রাদি উচ্চারণে আজও অনুম্বত হতে দেখা যায়।

মধ্যযুগের প্রারম্ভে বিদেশী আক্রমণের সেই দুর্যোগের দিনে ললিতকলাবিদ্যার চর্চা অনেক হ্রাস পায়। তবে ভারতীয় সংস্কৃতি তার গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে চিরকালই বিরাজিত, যার প্রমাণ তৎকালীন সঙ্গীতfচার্যদের সাধনা ও সৃষ্টি থেকে পাওয়া যায়। (সংগীতজ্ঞদের জীবনকথা দ্রষ্টব্য)।

আলাউদ্দীন খিলজির রাজত্বকালে (১৩শ-১৪শ শতাব্দী) সর্ব প্রথম হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের স্থত্রপাত হয়েছিল বলা যায়। হিন্দুস্থানী ও কর্ণাটক সংগীতের সংজ্ঞা সর্বপ্রথম হরিপাল রচিত সংগীত সুধাকর ( ১৩০৯-১৩১২ খৃষ্টাব্দে রচিত ) গ্রন্থে পাওয়া যায়। ইতিপূর্বেই আরব ও পারসিক প্রভাবে উত্তর ভারতীয় সংগীত ও সংস্কৃতিতে নান। বিবর্তন আরম্ভ হয়েছিল। উত্তর ভারতীয় সংগীতের বিবর্তনের পর থেকেই শুধু দক্ষিণী সংগীতকে কর্ণাটক বলা আরম্ভ হয় [ P. Sambomoorthy History of Indian Music. 1980 ]।

কাওয়ালী সঙ্গীত পরিবেষণ করছেন কাওয়ালগণ : Qawwali_Wikimedia_Free_Image
কাওয়ালী সঙ্গীত পরিবেষণ

হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের গোড়াপত্তন করেন অতিগুণী ও স্রষ্টা আমীর খসরু । ধ্রুপদগানের সৃষ্টি নাকি তৎকালীন বৈজুবাওরা নামক এক সঙ্গীতগুণীর দ্বারা হয়েছিল । ( এই বৈজু বাদশাহ আকবরের সময়ের বৈজু নয়) [ এবারেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী : হিন্দুস্থানী সংগীতে তানসেনের স্থান। ১৩৬৪ ]। ১ অবশ্য এ বিষয়ে মতভেদ আছে, কারণ কেহ-কেহ রাজা মানকে (১৪৮৬-১৫১৬ খৃষ্টাব্দ) ধ্রুপদের স্রষ্টা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আবার কারো মতে বৈদিক যুগ থেকেই ধ্রুপদ প্রচলিত। যাই হোক উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় সংগীতের বিবর্তন আরম্ভ হয় মুসলমান আগমনের পরে।

১৪শ শতকে আমীর খসরু খেয়াল, কাওয়ালি, গজল প্রভৃতি গীতরীতির প্রবর্তন করেন। ১৫শ শতকে জৌনপুরের নবাব স্থলতান হুসেন শর্কী খেয়াল গানের আরো উন্নতি বিধান করেন। গোড়ার দিকে খেয়াল ছিল কিঞ্চিত নিয়মভঙ্গ ধ্রুপদের মতো। ক্রমে নানা তান, অলংকারাদির প্রয়োগসহ ছোটো ও বড়ো দুই প্রকার খেয়ালের বিকাশ হয়। এর চরম উৎকর্ষসাধন করেন তানসেন বংশীয় ন্যামৎ খঁ। ( সদারঙ্গ)। খেয়ালের যাবতীয় বিবর্তন দিল্লীতেই হয়, এই সংগীতধারার বাহকদের বলা হোত কব্বাল ঘরাণা। কব্বাল বংশের গোলাম রস্থল খেয়ালের যথেষ্ট উন্নতি বিধান করেন, এবং তিনি স্বয়ং অতিগুণী শিল্পী ছিলেন (ক)। তাঁর পুত্র গোলাম নবী (শোরী মিঞা ) ‘টপ্পা’ গীতরীতির প্রবর্তন করেন।

বাংলাদেশে টপ্পা গানের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য। গোলাম রস্থলের দৌহিত্র শঙ্কর ও মধু খন খেয়ালীয়া হিসাবে সংগীত জগতে প্রসিদ্ধ। গোয়ালিয়রবাসী নখন পীরবক্স ধ্রুপদী বংশীয় হলেও সদারঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং খেয়াল গাইতেন। নখন পীরবকৃসের পৌত্র হদ্দ, খাঁ, হস্থ্য খঁ। ও নথ, খ। বিখ্যাত খেয়ালীয়া ছিলেন। এঁদের তিনটি ঘরাণা থেকেই থেয়াল গীতরীতির শ্রেষ্ঠ বিকাশ হয়েছে।

ঠুংত্রী হোল খেয়াল গানের রাগ ও রীতিভ্রষ্ট একপ্রকার চটুল গীতরীতি। সর্বপ্রথম এর প্রচলন হয় বারাণসীতে। গ্রাম্য গীতি থেকেই নাকি এর বিকাশ। তবে বর্তমান বারাণসী ঘরাণার প্রধান প্রচারক ছিলেন ঠুংরী সম্রাট মৈজুদ্দীন খা। লক্ষ্ণৌতে ঠুংত্রীর প্রচারক হলেন নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ। পাঞ্জাবী ঠুংরী সম্ভবত এগুলির মিশ্রণে সৃষ্ট। তবে পাঞ্জাবী ঠুংরীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হোল কতকগুলি স্থানীয় অলংকার প্রয়োগ। হিন্দুস্থানী সংগীতের প্রধান চারটি ধারা হোল—ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা ও ঠুত্রী।

২০শ শতাব্দীতে ধ্রুপদ ও টপ্প। গানের শিল্পী অপেক্ষাকৃত কমে গেছে। তবে খেয়াল ও ঠুংরী গান বিভিন্ন গুণীর মাধ্যমে নব নব রূপে বিকাশলাভ করেছে। এ ছাড়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে শাখা বহুল অসংখ্য আঞ্চলিক ও জাতীয় সংগীতের প্রচলন আছে। যেমন, ভাঙড়া, হীড়; রাজস্থানের মাণ্ড, বিহার ও উত্তরপ্রদেশের চৈতী, সাবণী, লাবণী, বিরহা, কজরী; আসামের বনগীত, বিহুগীত; বাংলার কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালী প্রভৃতি। যার পূর্ণ বিবরণের জন্য একখানি স্বতন্ত্র গ্রন্থের আবশ্যক ।

তবে কিছু কিছু পরিচয় “গীতরীতি প্রসঙ্গ” পরিচ্ছদে দেওয়া হয়েছে । আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীত হিসাবে বাংলার রবীন্দ্রসংগীত স্বীকৃত।

 

লেখক:

অমল দাশশর্মা

লেখক, সঙ্গীত মনীষা

লেখাটি লেখকের সঙ্গীত প্রশস্তি থেকে সংগৃহীত।

 

 

সঙ্গীত সম্পর্কে অন্যান্য রেফারেন্স:

Link to our other important disclaimers, policy, contact, etc:

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।