সঙ্গীতের প্রকারভেদ [ জনরা, ধারা, ধরণ, প্রকার] প্রচলিত / অপ্রচলিত বিভিন্ন ধরণের সঙ্গীতের সাথে পরিচয় [ Introduction to Music Genres ]

সঙ্গীতের প্রকারভেদ [ জনরা, ধারা, ধরণ, প্রকার] প্রচলিত / অপ্রচলিত বিভিন্ন ধরণের সঙ্গীতের সাথে পরিচয়

সঙ্গীতের প্রকারভেদ [ জনরা, ধারা, ধরণ, প্রকার] প্রচলিত / অপ্রচলিত বিভিন্ন ধরণের সঙ্গীতের সাথে পরিচয় [ Introduction to Music Genres ] : এই বিশ্বজগতের প্রতিটি মুহূর্তই হচ্ছে গতিশীল। বিবর্তনের ধারায় প্রাণী ও বস্তু অতীতকে পেছনে ফেলে বর্তমানকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের সন্ধানে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের ভাবনা, সাধনা, কর্ম, আকাঙ্ক্ষা, সৃজনশীলতা – সবকিছুই প্রতিনিয়ত তাড়া দেয় পরিবর্তনের মাধ্যমে সামনের দিকে অগ্রসর হতে।

ফলশ্রুতিতে জাগতিক বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয়ে আমাদের সামনে আসে নতুন রূপে। আর যুগধর্মকে স্বীকার করে আমরা তা গ্রহণ করি। সময়ের এই চলমান প্রবাহে চৌষট্টি কলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যা সংগীত ইতিহাস ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কালে কালে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। অতি প্রাচীনকালে প্রবন্ধ, বস্তু, রূপক ইত্যাদি নামে যে সকল তালযুক্ত নিবদ্ধ গান ও তালবিহীন অনিবদ্ধ গান ছিল কালের বিবর্তনে সেগুলো লুপ্ত হয়ে গেছে।

পরবর্তী সময়ে লুপ্ত হওয়া এ সকল সংগীতধারা ভিন্নরূপে ধ্রুপদ, ধামার ইত্যাদি গানে এবং রুচি পরিবর্তনের ফলে সঙ্গীতের প্রকারভেদ হয়েছে – খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা, তারানা, ত্রি-বট ইত্যাদি গানে রূপান্তরিত হয়েছে। শাস্ত্রীয় সংগীত নামে পরিচিত এই ধারাটি ছাড়াও লঘু সংগীত নামে আরেকটি ধারা সংগীতে স্থান পেয়েছে।

লঘু সঙ্গীতের প্রকারভেদ গুলো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে পল্লীগীতি, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, চৈতি, মুর্শিদি, আধুনিক, কীর্তন, লোকসংগীত, নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, শ্যামাসংগীত, লালনগীতি, হামদ, নাত, হাছন রাজার গান, মনোমোহন দত্তের গান ইত্যাদি নামে সুপরিচিত।

একসময় কোন সঙ্গীতের প্রকার হয়তো খুব প্রচলিত থাকলেও কালের বিবর্তে আজ তা হারিয়ে অপ্রচলিতর কাতারে চলে গেছে। কিন্তু এই সব কিছুই আমাদের সঙ্গীতের ইতিহাস। আমাদের দীর্ঘ সময়ের গড়ে ওঠা বর্তমান সঙ্গীত এই ভিত্তির উপরেই দাঁড়িয়েছে।

তাই একজন প্রকৃত সঙ্গীত শিল্পী বা রসিক হতে হলে, এই সঙ্গীতের প্রকার বা সব জনরার সঙ্গীত সম্পর্কে নুন্যতম ধারণা থাকা জরুরী। আমরা সেসব প্রচলিত ও অপ্রচলিত সঙ্গীতের ধারা বা জনরার একটি তালিকা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরতে চেষ্টা করছি, আশা করি ভবিষ্যৎ শিল্পী বা সঙ্গীত রসিকদের কাজে লাগবে। বিভিন্ন প্রকারের এই সংগীতগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় বর্ণের ক্রমানুসারে প্রদান করা হলো।

Table of Contents

সঙ্গীতের প্রকারভেদ [ জনরা, ধারা, ধরণ, প্রকার, Music Genres] :

অবতার গান [ Avatar Song, Music Genre ] :

হিন্দু ধর্মানুযায়ী ভগবান বিষ্ণু বা নারায়ণ মানবদেহ ধারণ করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হলে তাঁকে বলা হয় অবতার। হিন্দু মতে বিষ্ণুর দশটি অবতার হচ্ছে মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রামচন্দ্র, বলরাম, বুদ্ধ ও কল্কি। চৈত্রসংক্রান্তির গাজন উপলক্ষে ভক্ত্যা বা সন্ন্যাসীরা মিলিত হয়ে দশাবতারের ভঙ্গিতে নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে যে গান করে তাকেই বলে অবতার গান।

আধুনিক গান [ Modern Songs, Music Genre ] :

সাধারণত শৃঙ্গার-রসাত্মক চটুল শ্রেণির গানকেই বলা হয়ে থাকে আধুনিক গান। প্রেম-বিরহ-প্রকৃতি-নারী এসবই হচ্ছে আধুনিক গানের বিষয়বস্তু। আধুনিক গানের বাণী ও সুর হয় সাধারণত সহজ, সরল ও চঞ্চল প্রকৃতির। অনেক শ্রোতার কাছে এ কারণেই আধুনিক গানের একটি ভিন্নতর আবেদন রয়েছে। নিম্নে একটি আধুনিক গানের উদাহরণ দেওয়া হলো –

চাঁদের পাড়ায় থাকো নাকি
ঘুম কেড়েছো সুখ কেড়েছো
তুমি ছাড়া শূন্য হৃদয়
জোছনা মাখা সারা অঙ্গ
নদীর ঘাটে জলকে যাও সাঁঝের আঁধার হয় যে উধাও
ডাগর দুটি পদ্ম আঁখি
একটুখানি হাসলে গালে
চন্দ্রালোকে রূপের সাগর
ওগো চাঁদ সুন্দরী
মন করেছো চুরি
এখন কী যে করি ।
ঝলমল ঝলমল করে
রুমঝুম নূপুর পরে
দেখে চাঁদের পরী ॥
টলমল টলমল করে
মিষ্টি টোল পড়ে চাই যে দিতে পাড়ি ।

[গীতিকার : ফিরোজ আহমেদ ইকবাল, সুরকার : কাজী মুখলেসুর রহমান কাজল, শিল্পী : রবি চৌধুরী, তাল : কাহারবা (৮ মাত্রা)]

কওল গান [ Kaul, Music Genre ] :

ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর গুণাবলির বর্ণনাসংবলিত গানকে বলা হয় কওল বা কলবানা গান। কবাল জাতি দ্বারা উদ্ভাবিত এই গান অত্যন্ত আবেগাপ্লুত এবং চমৎকার ভাষানৈপুণ্যে গঠিত।

কবি গান [ Kabigan, Music Genre ] :

দুটি দলের নায়কের (দলনেতা বা দলের প্রধান গায়ক) মধ্যে কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তৎক্ষণাৎ মুখে মুখে রচিত কবিতায় সুরারোপ করে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে যে সংগীত লড়াই অনুষ্ঠিত হয় তাকেই বলে কবি গান। এই গানকে আঞ্চলিক ভাষায় তরজা গানও বলা হয়ে থাকে।

দুটি দলের মধ্যে উপস্থিত বুদ্ধি ব্যবহারের ক্ষমতা যার যত বেশি কবি গানে সে দলটিই তত বেশি পারদর্শিতা দেখাতে সমর্থ হয়। তৎক্ষণাৎ খেলে এমন বুদ্ধি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত বিষয়ের এই সংগীত লড়াই শ্রোতা-দর্শককে বিশেষ আনন্দ দেয় অত্যন্ত উপভোগ্য এই কবি গান পল্লী অঞ্চলের মানুষের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় এক সংগীতশৈলী হিসেবে সমাদৃত।

কাওয়ালি গান [ Kawali, Music Genre ] :

কাওয়ালি গান সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন : আমাদের কাওয়ালি আর্টিকেলে।

কাজরি বা কাজলি [ Kajri, Music Genre] :

ভারতের উত্তর প্রদেশে কাজলি দেবীকে কেন্দ্র করে যে সংগীত গাওয়া হয় তাকেই কাজরি বা কাজলি গান বলা হয়ে থাকে। উত্তর প্রদেশের প্রচলিত লোকগীতিগুলোর মধ্যে এই গান বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা তৃতীয়াতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় মহিলারা নতুন বস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে সারারাত ধরে কাজরি গান গেয়ে থাকে। এই পুজোতে ভাই ও ভ্রাতৃসমকে রাখি বাঁধা হয় বলে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলকেই কাজরি গানের আসরে মিলিত হতে দেখা যায়।

শৃঙ্গার রসপ্রধান কাজরি বা কাজলি গান মির্জাপুর ও বারানসি অঞ্চলে বেশি প্রচলিত ভক্তিরসাত্মক কিছু কাজরি গান রচিত হলেও এর বিষয়বস্তু বিরহ ও মিলনের বিভিন্ন অবস্থা। বারানসিতে ভাদ্র মাসে অনুষ্ঠিত ছট পরবের সময়ও কাজরি বা কাজলি গান গাওয়া হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের কীর্তন গানের মতোই এর গায়ন পদ্ধতি এবং কীর্তনীয়া দলের মতোই কাজলি গানেরও পৃথক পৃথক দল থাকে। একজন মূল গায়কের সঙ্গে অন্যান্য সহশিল্পী নিয়ে বসে কাজরি গানের আসর।

এ গানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, শৃঙ্গার রসাত্মক ভাষায় মূল শিল্পীকে কেন্দ্র করে দোহারি হিসেবে অন্য শিল্পীবৃন্দ তাঁকে অনুসরণ করেন। কাজরি বা কাজলি গানের দলের প্রধানকে মুখিয়া (মুখ্য) বলা হয়।

তিনি স্থানীয় ভাষায় নতুন নতুন কাজরি রচনা করে দলের অন্য শিল্পীদের তা শিখিয়ে দেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাজরি গান উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো –

রিম ঝিম রিম ঝিম্ ঝিম্ ঘন দেয়া বরষে

কাজরি গাহিয়া চলে পুরনারী হরষে

কদম-তমাল ডালে দোলনা দোলে

কুহু পাপিয়া ময়ূর বোলে

মনের বনের মুকুল খোলে।

নট-শ্যাম-সুন্দর মেঘ পরশে ॥

হৃদয় যমুনা আজ কূল জানে না গো

মনের রাধা আজ বাধা মানে না গো

বাধা মানে না।

ডাকিছে ঘর ছাড়া ঝড়ের (শ্যামের) বাঁশী

অশনি আঘাত হানে দুয়ারে আসি

গরজাক গুরুজন ভবন বাসী

আমরা বাহিরে যাব শ্যাম-মেঘ দরশে।

[গীতিকার : কাজী নজরুল ইসলাম, সুর : কাজরি ভাঙা গান, তাল: কাহারবা (৮ মাত্রা)]

কীর্তন গান [ Kirtan, Kirtan, Music Genre ] :

কীর্তন বা কীর্তন গান বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের কীর্তন বিষয়ক আর্টিকেল পড়ুন।

খেয়াল গান [ Kheyal, Kheyal, Music Genre ] :

খেয়াল গান বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের খেয়াল বিষয়ক আর্টিকেল পড়ুন।

গজল গান (Ghazals, Music Genre ] :

গজল বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের গজল বিষয়ক আর্টিকেল পড়ুন।

গম্ভীরা  বা গম্ভীরা গান [ Gambhira Song, Music Genre ] :

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা এবং বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের বিশিষ্ট লোকসংগীত হচ্ছে গম্ভীরা গান। চৈত্রসংক্রান্তি উৎসবে যে অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে তার মধ্যে গম্ভীরা গান অসম্ভব জনপ্রিয়। সাধারণত বছরের শেষ তিনদিন কোনো উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এই গানের আসর বসে।

গম্ভীরা শিল্পীগণ বিশেষ পোশাক ও নাটুকে উপাদান ব্যবহার করে থাকেন। কখনো কখনো কয়েকজন মিলে গানের মধ্যে বিষয় সংশ্লিষ্ট হাস্যরসাত্মক কথোপকথনেরও প্রয়োগ করেন। শিল্পীদের অভিনয় ও নৃত্য এই গানের আঙ্গিক দিককে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে।

জীবনসংসারে সংঘটিত নানান ঘটনা সংগীতাকারে পর্যালোচনা করাই হচ্ছে গম্ভীরা গানের মূল বৈশিষ্ট্য। সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষামূলক, এমনকি রাজনৈতিক হালচালও গম্ভীরা গানে ‘নানা হে’ বলে শুরু করতে দেখা যায়। অনেক গম্ভীরা গানে বার্ষিক চাওয়া-পাওয়ার একটি হিসাবও পাওয়া যায়।

গম্ভীর অর্থ শিব বলেই অনেকের মতে, শিবকে উপলক্ষ করেই গম্ভীরা গান রচিত হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পৌষসংক্রান্তি, গাজন ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও এই গান পরিবেশিত হয়ে থাকে। মালদহ এবং চাপাইনবাবগঞ্জ এলাকার কৃষক সমাজের একটি জাতীয় উৎসব গম্ভীরা নাচ ও গান।

বার্ষিক সাফল্য এবং ব্যর্থতার পর্যালোচনা করে নতুন ফসল বছরের সাফল্য কামনা করা হয় গানের মধ্য দিয়ে। গম্ভীরাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করার জন্য নৃত্যে দেব-দেবীদের মুখোশ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এই গান সাধারণত পোলিয়া, রাজবংশী, নাগর, কোচ প্রভৃতি আদিবাসী শিল্পীদের কণ্ঠে বেশি শোনা যায়।

তবে রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু কিছু সংগীতশিল্পী নিজ এলাকায় গম্ভীরা দল গঠন করে সমসাময়িক নানান প্রসঙ্গ ও অসংগতি নিয়ে নিজেরাই গান রচনা করে গম্ভীরা পরিবেশন করছেন। ফলে গম্ভীরা গান অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু একই সঙ্গে এর আদিরূপ হারিয়ে যাচ্ছে।

জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলায় গম্ভীরা গানের সন্ধান পাওয়া যায়; তবে তার প্রকৃতি একটু আলাদা। মালদহ এবং চাপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে বেশ কিছুটা মিল পরিলক্ষিত হয়। এমনকি উভয় অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আম। কোনো কারণে আমের ফলন ভালো না হলে গম্ভীরায় শোনা যায় :

কোহোবো কি গান ওহে শিব বাগানে নাই আম

গাছে গাছে বেড়িয়ে দেখনু লতুন পাতা সব সমান ॥

গাজন বা গাজন গান:

ভারতের উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিম বাংলার গ্রামে গ্রামে গাজন গান গাওয়া হয় । গাজন মূলত শিব সম্বন্ধীয় গান। হিন্দু ধর্মের অন্যতম দেবতা শিবের গুণগান, তাঁর কাছে কোনো কিছু চাওয়া কিংবা কোনো প্রাপ্তিযোগের কারণে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্যও গাজন গান পরিবেশিত হয়ে থাকে।

গুলনকশ্ গান বা গুলনকশ্ তারানা :

ফারসি ভাষায় ‘গুল’ শব্দের অর্থ পুষ্প বা ফুল। ফারসি ভাষায় রচিত একপ্রকার তারানা রয়েছে, যা গুল (ফুল) যুক্ত। অর্থাৎ এই ধারার গানের বাণী বিভিন্ন ফুলের নাম দিয়ে নকশা করা বা সাজানো। তাই গুলযুক্ত এই তারানাকে গুলনকশ্ নামে অভিহিত করা হয়েছে স্বনামখ্যাত সংগীতজ্ঞ হজরত আমির খসরু এই গানের আবিষ্কার করেছেন বলে জানা যায় ।

গীত [ Geet, Music Genre ] :

আধুনিক হিন্দি কাব্যসংগীতকে বলা হয় গীত। এই গানে প্রেম, বিরহ, সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা, বেদনা ইত্যাদি মিশ্রিত কাব্যরসের সমৃদ্ধ ভাবাবেগ পরিলক্ষিত হয়। তবে যে-কোনো বিষয়ই গীত রচনার বিষয়বস্তু হতে পারে। গীতে সুর অপেক্ষা বাণীর প্রাধান্য বেশি থাকে এবং সুর বাণীকে অনুসরণ করে চলে। ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে নব নব রস ও সুরের নতুন রূপে আবদ্ধ হওয়ার জন্যই দিনে দিনে গীত হয়ে উঠেছে শ্রুতিনন্দন এবং আকর্ষণীয়।

হালকা সুরের প্রয়োগ হলেও নানান সুরের মিশ্রণে এবং রাগপ্রধান গানের মতো সরগম ব্যবহারের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই গীত বেশ রঞ্জকতার সৃষ্টি করে থাকে। দাদরা, ঝুমুর, কাহারবা ইত্যাদি তালে গীত আবদ্ধ করা হয়। এই ধারার গানকে হিন্দি ভাষার আধুনিক গান বলাই উত্তম।

দিল বহুত ঘাবরা রাহা হ্যায় আজ কাল

কেয়া কোই ইয়াদ আরাহা হ্যায় আজ কাল ॥

মেরি মায়ুসি বাড়হানে কে লিয়ে

কুছ না কুছ হোতা রাহা হ্যায় আজ কাল ॥

দার্দ যাব জিন্দেগি সামঝে থে হাম

বোঝ বানতা যা রাহা হ্যায় আজ কাল |

এক দো হাম দার্দ হো উয়োভি গ্যায়ে

দিল বহত তানহা রাহা হ্যায় আজ কাল ॥

 

[ গীতিকার আলাউদ্দিন আলী খাঁ (গুজরাট, বরোদা), সুর ও সংগীত পরিচালনা : এজাজ হোসেন (গুজরাট, বরোদা), শিল্পী: ডক্টর হারুন অর রশিদ কলিন (বাংলাদেশ), ঠাট : ভৈরবী, রাগ: মিশ্র ভৈরবী, তাল: কাহারবা (৮ মাত্রা)।]

শব্দার্থ দিল=হৃদয়, বহত= খুব ঘাবরা রাহা=ভয় পাওয়া, ইয়াদ=স্মরণ, তানহা=একাকী, বাড়হানে=বাড়ানোর, মেরি=আমার মায়ুসি=হতাশ, দার্দ=কষ্ট, জিন্দেগি=জীবন, বোঝ=বোঝা, বানতা=হতে যাচ্ছে, উয়োভি=সেও, গ্যায়ে চলে গেছে।

চট্‌কা বা চটকা গান [ Chotka Song, Music Genre ] :

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা এবং বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের জনপ্রিয় গান ভাওয়াইয়ার মতোই এই অঞ্চলগুলোর আরেক প্রকার লোকসংগীতকে বলা হয় চট্‌কা গান।

চটুল থেকে চট্‌ক্কা শব্দটি এলেও এর বাণী সবসময় চটুল না-ও হতে পারে। এর বাণীতে সামাজিক অনেক বক্তব্যও খুঁজে পাওয়া যায়। হালকা ও চটুল রসের এই লোকসংগীতটির বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রেম।

তবে সমাজের অনেক অজানা কথা, নারী নির্যাতনের অনেক অকথিত ইতিহাস হাসির ছলে চটকা গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করা হয়ে থাকে। রংপুর অঞ্চলের চট্‌কা গানগুলোর মধ্যে সমধিক জনপ্রিয় একটি চট্‌কা গান উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো :

যে জন প্রেমের ভাব জানে না, তার সঙ্গে নাই লেনাদেনা।

খাঁটি সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা, সে জন সোনা চেনে না ।।

 

কুটা-কাটায় মানিক পাইলো রে, অথই পানিত ফেলিয়া দিলো রে

সাত রাজার ধন মানিক হারাইয়া ও( হায়রে)।

কুটা-কাটায় মন যে মানে না, সে জন মানিক চেনে না ॥

উল্লুকের থাকিতে রে নয়ন, না দেখে সে রবির কিরণ।

কী কব দুষ্কেরও কথা (ও আমি)

সে জন ভাব জানে না, সে জন মানিক চেনে না ।

পিঁপড়া বোঝে চিনিরও দাম, ও বানিয়ায় চিনে সোনা।

মাটির প্রেমের মূল্য কে জানে (ও হায়রে) ধরায় আছে কয়জনা, সে জন মানিক চেনে না |

[গীতিকার ও সুরকার : জলিলুল আলম, শিল্পী ফেরদৌসী রহমান, তাল: ঝুমুর (৬ মাত্রা)]

 

চতুরঙ্গ গান [ Chaturanga, Music Genere] :

সংগীতের একটি বিশেষ ধারা। খেয়াল, তারানা, সরগম ও বোলবাণী মিশ্রিত করে যে গান গাওয়া হয় তাকে বলে চতুরঙ্গ। এই গানের চারটি অঙ্গ বা ভাগের প্রথম অংশ স্থায়ী, যেখানে থাকে গানের কথা বা বাণী বা পদ। দ্বিতীয় অংশে থাকে তারানার বোল, তৃতীয় অংশে সরগম এবং চতুর্থ বা শেষ অংশে থাকে পাখোয়াজ বা তবলার বোল।

চারটি পৃথক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয়কে ঘিরে গাওয়া হয় বলে সংগীতের বিশেষ এই শৈলীটি চতুরঙ্গ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। রাগের শুদ্ধতাকে রক্ষা করে খেয়াল গানের ঢংয়ে চতুরঙ্গ গাওয়া হয়। খেয়াল গানের আভোগ অংশে যেমন গায়কের নাম থাকে তেমনি উক্ত গানের প্রথম অংশ বা স্থায়ীতে ‘চতুরঙ্গ’ কথাটি উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

এই শৈলীর গান বর্তমানে তেমন প্রচলিত নয় বলে খুব একটা শোনাও যায় না। চতুরঙ্গের প্রচলন ছিল এমন সময়ের একটি জনপ্রিয় গান উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো –

 

চতুরঙ্গ গাওবো সখীরি আজ
সখীয়ন ভুলি সব কাজ ॥
নাদির দির দানী তোম তন দিরদির না
দীমতন নাদিম তোমতন নননা।।
সরগম ধামগ মধসা র্রর্গর্রর্স
নধমগ মধমগ রগমগ রগরস ।
ধাধা ধা কিটতক কিড়ধা ধা ক্রাং ধা
ধা কড়াং ধা ধা কড়াং ধা দানী ॥

[রাগ : গুর্জরি টোরি, ঠাট: টোরি, বাদীস্বর : ধ, সমবাদীস্বর গ/র, জাতি : ষাড়ব-ষাড়ব, অঙ্গ : উত্তরঙ্গ প্রধান, গায়ন সময় দিবা দ্বিতীয় প্রহর, তাল: ত্রিতাল (১৬ মাত্রা), আরোহী : স ঋজ্ঞ ক্ষ দ ন র্স, অবরোহী : স ন দ ক্ষ জ্ঞ ঋজ্ঞ ঋস ।]

চুট্‌কলা [ Cutkala, Music Genre ] :

জৌনপুরের সুলতান হুসেন শাহ শর্কি আবিষ্কৃত বিশেষ ধারার গীতরীতিকে বলা হয় ‘চুট্‌কলা’। জৌনপুরে ব্যাপক প্রচলিত এই গানে দুটি কলি থাকে । চুট্‌কলা গানের কলিতে পদের শেষে মিল থাকে না এবং তাল ছাড়া গাওয়া হয় । দুটি কলির দ্বিতীয়টি সম্পূর্ণই কবিতার মতো করে সাজানো থাকে।

চুট্‌কলা গানের প্রথম কলিতেই যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পাদিত হয়। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় গান চুট্‌কলার বিষয়বস্ত্র হচ্ছে প্রেম ও বিরহ। চুট্‌কলা গান যখন যুদ্ধ সম্পর্কে রচিত হয় তখন তাকে বলে ‘সাদরা চুট্‌কলা’।

ঋতু গান [ Seasonal Song, Music Genre ] :

যে গানের বাণীতে কোনো না কোনো ঋতুর বর্ণনা থাকে তাকেই বলে ঋতু গান। ঋতুর সঙ্গে গানের ও রাগের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। কেবলমাত্র বিশেষ বিশেষ ঋতুতেই বিশেষ বিশেষ গানগুলো গাওয়া হয়ে থাকে। বসন্তকালে গাওয়া হয়ে থাকে বসন্ত রাগে রচিত বসন্তের ঋতু গান।

আবার বর্ষা ঋতুতে মিয়াকি মলহার রাগে রচিত বর্ষার ঋতু গান পরিবেশিত হয়। ঋতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত ঋতু গান পরিবেশনকালে প্রকৃতির রূপ আর গান মিলেমিশে একাকার হয়ে এক অপূর্ব পরিবেশের সূচনা করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বর্ষাঋতুকে নিয়ে একটি গান উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো –

রিম ঝিম ঘন ঘন রে বরষে।

গগনে ঘনঘটা      শিহরে তরুলতা

ময়ূর ময়ূরী নাচিছে হরষে ॥

দিশি দিশি সচকিত              দামিনী চমকিত

চমকি উঠিছে হরিণী তরাসে।

রিম্ ঝিম্ ঘন ঘন রে বরষে ॥

[রচয়িতা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেতকী, তাল: ত্রিতাল (১৬ মাত্রা), পর্যায় : প্রকৃতি (ঋতু)]

চৈতি গান [ Chaiti Song, Music Genre ] :

ভারতের বিহার রাজ্যের প্রধান লোকসংগীতগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চৈতি গান। এটি শৃঙ্গার রসাত্মক হলেও বিরহব্যথার স্পর্শ গানের রূপে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। সাধারণত রাম-সীতার ব্যথাভরা জীবনদর্শনই চৈতি গানের মূল বিষয়বস্তু।

আবার, অনেক সংগীতগুণীজনের মতে, চৈত্র মাসের উৎসব অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় বলেই লোকসংগীতটি চৈতি গান নামে পরিচিত। বিহার প্রদেশে চৈতি একটি বিশেষ আদৃত ও অসম্ভব জনপ্রিয় সংগীতশৈলী ।

জনসংগীত :

যে সংগীত জনসাধারণকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে তাকে বলা হয় স্বদেশাত্মক বা রাষ্ট্রীয় গীত। আর এই রাষ্ট্রীয় গীতই হলো জনসংগীত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে শত্রুমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে রচিত বিখ্যাত জনসংগীতটি উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো –

 

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা,

আমরা তোমাদের ভুলবো না আমরা তোমাদের ভুলবো না

দুঃসহ বেদনার কণ্টক পথ বেয়ে শোষণের নাগপাশ ছিঁড়লে যারা

আমরা তোমাদের ভুলবো না আমরা তোমাদের ভুলবো না ।।

যুগের এ নিষ্ঠুর বন্ধন হতে মুক্তির এ বারতা আনলে যারা

আমরা তোমাদের ভুলবো না ভুলবো না ভুলবো না |

কৃষান কৃষানির গানে গানে পদ্মা মেঘনার কলতানে।

বাউলের একতারাতে আনন্দ ঝংকারে তোমাদের নাম ঝংকৃত হবে।

নতুন স্বদেশ গড়ার পথে তোমরা চিরদিন দিশারি রবে

আমরা তোমাদের ভুলবো না ভুলবো না ভুলবো না |

[কথা : গোবিন্দ হালদার সুর আপেল মাহমুদ, শিল্পী : রিজিয়া কাবেরী ও সহশিল্পীবৃন্দ, তাল: কাহারবা (৮ মাত্রা), বি.দ্র. বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন’ থেকে প্রচারিত জাতীয় সংবাদ শুরু হওয়ার পূর্বে এই গানটি সূচনা সংগীত হিসেবে বাজানো হয়ে থাকে।]

জাগ গান [ Jaag Gaan, Music Genre ] :

জাগ গান বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের জাগ গান বিষয়ক আর্টিকেল পড়ুন।

জাতীয় সংগীত [ National Anthem, Music Genre ]

বিশ্বের সকল রাষ্ট্রেরই আছে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, নির্দিষ্ট পতাকা, যা তাদের পরিচয় বহন করে এবং থাকে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রভাষা যা দিয়ে তারা প্রকাশ করে মনের ভাব। এক একটি দেশ বা রাষ্ট্র গঠিত হয় সেই ভূখণ্ডে বসবাসকারী জাতির সার্বিক প্রয়োজনের তাগিদ থেকে।

প্রতিটি রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর থাকে নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং সেইসাথে নিজস্ব কিছু রূপরেখা। ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। বিনোদনের জন্য গীত, বাদ্য, নৃত্য, চিত্র, নাট্য ইত্যাদি ললিতকলা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধি লাভ করে। তবে কোনো কোনো রাষ্ট্রে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছাড়াও থাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং তাদেরও থাকে নিজস্ব ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-কালচার ।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সকলকে নিয়ে একই পতাকাতলে সমবেত হয়ে সর্বজন গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত নির্দিষ্ট একটি গীত নির্ধারণ করা হয়। সে সংগীতের মধ্য দিয়ে জাতি নিজ রাষ্ট্র তথা দেশমাতৃকার প্রতি তার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। রাষ্ট্রীয় ভাষায় রচিত নিজ দেশের পরিচয় বহনকারী এই গীতকেই বলা হয় ‘জাতীয় সংগীত’। প্রতিটি দেশের জাতীয় সংগীত সেখানকার জাতীয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে থাকে। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র ও জাতির সংস্কৃতির পরিচয় প্রস্ফুটিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি “ [গীতিকার ও সুরকার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাল : দাদরা (৬ মাত্রা)।

জারি গান [ Jari Song, Music Genre ]

ফারসি ভাষায় ‘জারি’ শব্দের অর্থ শোক প্রকাশ করা বা ক্রন্দন করা। বাংলাদেশের লোকসংগীতগুলোর মধ্যে জারি গান একটি বিশেষ ধারা অবলম্বন করে উদ্ভূত হয়েছে। বীর ও করুণ রসাত্মক সুরের শোকসংগীত জারি গান ময়মনসিংহ অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইসলামের কাণ্ডারি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হাসান (রা.) ও হজরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর আদর্শের সংগ্রাম এবং তাঁদের আত্মত্যাগ ইসলামের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে সমগ্র বিশ্বে। মহানুভবতায় ভরা তাঁদের জীবনকাহিনী ও ফোরাত নদীর তীরে কারবালা ময়দানে সংঘটিত হৃদয়বিদারক ঘটনা নিয়ে রচিত হয় জারি গান।

একজন মূল গায়কের নেতৃত্বে বিশ থেকে তিরিশ জন গায়ক পায়ে নূপুর বেঁধে এবং হাতে একটি গামছা নিয়ে বৃত্তাকারে পা ফেলে ফেলে অগ্রসর হতে থাকেন চলার তালে তালে নূপুর বাজতে থাকে এবং সম্মিলিত গায়কেরা হাতের গামছাটি আঁচলের মতো করে দোলাতে থাকেন। মূল গায়ক গানের মধ্য দিয়ে কাহিনীর বিবরণ দিতে থাকেন এবং তাঁর সঙ্গে সহ-শিল্পীবৃন্দ মাঝে মাঝে ধুয়া ধরেন। করুণ রসাত্মক কাহিনীর মধ্যে বীর রসাত্মক ধুয়াগুলো অপূর্ব রস-বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। তাই জারি গান একদিকে যেমন করুণ এবং হৃদয়বিদারক অন্যদিকে তেমনি গৌরবময় ও বীরত্বপূর্ণ।

লোক-জনপদে অসম্ভব জনপ্রিয় এই গান গ্রামবাসী কখনো চোখের পানিতে সয়লাব হয়ে, কখনোবা বীরত্ব ব্যঞ্জনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কয়েক রাত ধরে শুনে থাকেন। পল্লী-গানের অভ্যন্তরে প্রচলিত জারি গানের সঙ্গে বেহালা, সারিন্দা, ঢাক, মন্দিরা, দোতরা, খঞ্জনি, মারাক্কাস, জিপসি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র সংগত করা হয়।

জিগর গান [ Jigar Song, Music Genre ]

ঈশ্বরবিষয়ক সংগীতকে বলা হয় জিগর গান। এই গান কয়েকটি কলিতে নিবদ্ধ হয়। তবে জিগর গানের বিষয়বস্তু সবসময়ই পরমার্থ সম্পর্কিত হয়ে থাকে।

ঝুমুর গান [ Jhumur Song, Music Genre ]

বিহার রাজ্যের ছোট নাগপুর এবং সাঁওতাল পরগনার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত একধরনের লোকসংগীত ঝুমুর গান নামে পরিচিত। ঝুমুর গানের সুরে নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়গ্রাহী । আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় ঝুমুর গান মাদলের বোল ও বাশির সুরের সঙ্গে গাওয়া হয়ে থাকে। এই গানগুলোর আকার সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয়। লৌকিক যে-কোনো বিষয় অবলম্বনেই ঝুমুর গান রচিত হতে পারে। তবে প্রেমবিষয়ক পদই এতে বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। ভারতের মানভূম, সিংভূম, বাঁকুড়া, ছোট নাগপুর এবং বাংলাদেশের দিনাজপুর, রংপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ ইত্যাদি অঞ্চলে সাঁওতাল আদিবাসীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার কারণে ঝুমুর গানের ভাষা ও আঙ্গিকে নানান বৈচিত্র্যের সমাবেশ ঘটেছে।

সঙ্গত কারণেই অঞ্চলভেদে ঝুমুর গানের নানান শ্রেণিবিভাগ দেখা যায়। সেগুলোর মধ্যে খেমটি ঝুমুর, ছৌ নাচের ঝুমুর, পাতা নাচের ঝুমুর, দাঁড়শালিয়া ঝুমুর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণত ঝুমুর তালে নিবদ্ধ ঝুমুর গান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রুতিমধুর হয়ে থাকে।

ছোট ছোট রাঙন বেটি। ডারায় পরে চুল।
মোচড়ে বান্ধিতে কেশ। কদম ফুলের পারা।

টপ-খেয়াল [ Tap Kheyal or Tappa Kheyal, Music Genre ]

টপ্পা ও খেয়াল গানের সংমিশ্রণে সৃষ্ট গানকে বলা হয় টপ-খেয়াল গান।

টপ্পা [ Tappa, Music Genre ]

টপ্পা বা টপ্পা গান [ Tappa ] সম্পর্কে জানতে আমাদের “টপ্পা বা টপ্পা গান [ Tappa ]” আর্টিকেলটি দেখুন।

ঠুংরি বা ঠুমরি [ Thumri, Music Genre ]

ঠুমরি সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন আমাদের ঠুমরী আর্টিকেলে

তারানা [ Tarana, Music Genre ]

ভারতীয় সংগীতের ধারায় অর্থহীন কতগুলো ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি সহযোগে চিত্ত হরণ করা যে বিশেষ শৈলীর গান পরিবেশন করা হয় তাকে বলে তারানা বা তেলেনা। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির (১২৯৬-১৩১৬) উচ্চপদস্থ রাজসভাসদ ও সংগীতজ্ঞ হজরত আমির খসরু ব্যতিক্রম শৈলীর এই গান প্রবর্তন করেন।

তারানা গানে শুধুমাত্র স্থায়ী ও অন্তরা এই দুটি তুক বা ভাগ থাকে । খেয়াল গানের প্রক্রিয়ায় তারানা গাওয়া হলেও উভয়ের মধ্যে ভাষার পার্থক্য বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। খেয়াল গান রচনায় ভাবসমৃদ্ধ ভাষা বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তারানার ক্ষেত্রে কতগুলো অর্থহীন ধ্বনির সমন্বয় ঘটে। এই গীতশৈলীতে দেরেনা, নাদেরে, তানা, দানি, দেরদের, ইয়ালালোম, তা দেরে, দেরতুম, না, ওদিয়ানা, দ্রিম, ইয়ালালি

ইত্যাদি কতগুলো অর্থহীন ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি এবং কখনো কখনো অর্থহীন ফারসি শব্দের প্রয়োগও দেখা যায়। তারানা গানের রচনা সাধারণত এরকম ধ্বনিসমষ্টির সহযোগেই করা হয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো সময় বৈচিত্র্য আনার জন্য এই রচনাগুলোর মধ্যে তবলা বা পাখোয়াজের বোল অত্যন্ত নান্দনিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়।

তারানা গানে রাগ ও তালের প্রাধান্যই বেশি এবং দ্রুতলয়ে গাওয়া হয় বলে লয়কারীর চমৎকারিত্বে দর্শক-শ্রোতার চিত্ত প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। কোনো কোনো সময় ছোট তানের প্রয়োগ এর রূপমাধুর্যকে অসম্ভব বাড়িয়ে দেয়। তারানা গান ত্রিতাল, একতাল, ঝাঁপতাল ইত্যাদিতে তুলনামূলকভাবে বেশি নিবদ্ধ হয়ে থাকে। জিহ্বার জড়তা কাটাতে তারানা অনুশীলন সংগীতগুণীজন মহলে অত্যন্ত সমাদৃত।

ওস্তাদ তানরস খাঁ, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ, ওস্তাদ নথু খাঁ, ওস্তাদ নিসার হোসেন খাঁ প্রমুখ স্বনামখ্যাত সংগীতজ্ঞ শ্রেষ্ঠ তারানা রচয়িতা ও শিল্পীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । খ্যাতিমান শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীদের খেয়াল গাওয়ার পর ঠুংরি, ভজন ইত্যাদির পরিবর্তে তারানা পরিবেশন করতে দেখা যায়।

০ +
নাদেরে দেরে তা দেরে না দেরে না
নাদের দের তা দেরে না
ইয়ালালোম ইয়ালালোম
ইয়ালালি ইয়ালালে।
দের না তানা নানা নানা নানা
তাদের না ইয়ালালোম ॥

+
নাদের দেরতুম দেরদের তানা দেরে না
তানা তানা দেরে না

দের দের দের তা দারে দানি
তা দের না তানা দেরে না
দিম দের না দিম তানা
দের দের দের তা দারে দানি
ধা কেটে তাক ধুম কেটে তাক ধিৎ তা ক্রান
ধাতি ধা কেড়ে নাক তেরেকেটে তাক ক্রান
কেড়ে নাক তেরেকেটে ধাতি ধা ক্রান
তা ধা ইয়ালালোম ইয়ালালোম ॥

[ ঠাট : বিলাবল, রাগ : বিহাগ, বাদীস্বর : গান্ধার (গ), সমবাদীস্বর : নিশাত (ন), অঙ্গ : পূর্বাঙ্গ প্রধান, জাতি : ঔড়ব-সম্পূর্ণ, গায়ন সময়: রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর, আরোহী : ন্ স গ ম প ন র্স, অবরোহী স ন ধ প ক্ষগ মগ রস ]

ত্রি-বট [ Tribot, Music Genre ]

তারানা গীতশৈলীর মতো, তবে গায়কিতে পার্থক্য বিদ্যমান এবং খেয়াল অঙ্গে গাওয়া হয় এমন একটি গীতশৈলীকে ত্রি-বট বা তিরবট বলা হয়ে থাকে। এই গানে সাধারণত তিনটি অংশ থাকা বিশেষ প্রয়োজন, সেগুলো হচ্ছে ক) গানের বাণী, খ) তারানা এবং গ) – পাখোয়াজের বোল। উল্লিখিত তিনটি অংশের আবির্ভাব হয় বলেই এই শৈলীর গানকে ত্রি-বট নামে অভিহিত করা হয়েছে।

অনেক ত্রি-বট রচয়িতা গুণী সংগীতমণ্ডলী তাঁদের সৃষ্টিতে ক) তারানা, খ) সরগম, গ) পাখোয়াজের বোল – এই তিনটি অংশের আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকেন। এই শৈলীর গানে তান করা দোষণীয় নয়।

কোনো কোনো ত্রি-বট রচয়িতা গানের ভাষার মধ্যে ‘ত্রি-বট’ শব্দটি উল্লেখের মধ্য দিয়ে এই গীতশৈলীকে স্পষ্ট করে থাকেন। বর্তমান যুগে তারানা গানের সমাদর অধিক লাভ করায় ত্রি-বট শৈলীর গান তেমন আর শোনা যায় না।

দেরে না দ্রিম তানন
তারে তারে দানি
তাদারে তাদারে দানি
তন নন দেরে নন।।

তারে তারে তানাদ্রিম তান দেরেনা
তানা দেরে না তনতাদারে তাদিয়ান।।

মর সন্ সর ক্ষপ
র্রর্ম পম পন র্সর্স
র্মর্ম র্রর্স নধ পক্ষ
রক্ষ পম রম রস।।

ধা গদি ঘেনে ধা গদি ঘেনে তেটে কতা গদি ঘেনে ধা গদি ঘেনে ধা গদি ঘেনে ॥

[ঠাট : কল্যাণ, রাগ : শুদ্ধ সারং, বাদীস্বর : ঋষভ (র), সমবাদীস্বর : পঞ্চম (প), অঙ্গ : পূর্বাঙ্গ প্রধান, জাতি : ঔড়ব-ষাড়ব, গায়ন সময় দিবা দ্বিতীয় প্রহর, আরোহী : ন স র ক্ষ প ন র্স, অবরোহী: স ন ধ প ক্ষ প রমর সস তাল: ত্রিতাল (৮ মাত্রা)।]

ধামার [ Dhamar, Music Genre ]

ধামারশৈলীর গান কে প্রবর্তন করেন বা কবে থেকে এই গীতশৈলীর উদ্ভব ও প্রচলন হয় আজ অবধি তা জানা যায়নি। অনেক সংগীতগুণীজনের ধারণা, পঞ্চদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সংগীত দিকপাল স্বামী হরিদাসজির কল্পনা থেকেই ধামারশৈলীর গান রূপ লাভ করেছে।

তৎকালীন সময়ে সংগীত সংস্কারের সুমহান দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বৃন্দাবনের বাঁকেবিহারির মন্দিরে সাধন-ভজন করেই তিনি সারাটি জীবন অতিবাহিত করেন। ব্রজভাষায় তিনি ধ্রুপদাঙ্গের কিছু কিছু পদ রচনা করেছিলেন। ধর্ম প্রচারের প্রয়োজনে বৃন্দাবনে তিনি ‘রাসের পদ’ গানের প্রচলন করেন। ধারণা করা হয়, মার্জিত ব্রজভাষায় রাধা-কৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক বর্ণনা সমন্বিত গাম্ভীর্যবিহীন যে সুরের মূর্ছনা ভক্তদের হৃদয়কে সিক্ত করে তাকেই বলে ‘ধামার’ গান।

উক্ত বিষয়টি নিয়ে মতভেদ থাকলেও সংগীতজ্ঞ গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ধামার গানের নামকরণ নিয়ে যে বিশেষ আলোকপাত করেছেন তা নিয়ে অনেকেই একমত হয়েছেন। তাঁর ভাবনা ও বর্ণনানুসারে ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘কৃষ্ণ’ এবং ‘আর’ শব্দের প্রতিশব্দ হলো ‘রীতি বা নিয়ম’। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে হোলি উৎসবে যে ছন্দ তথা রীতিতে গান করতেন সেই গীত পদ্ধতিকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে প্রচলিত গীতশৈলীকে বলা হয়ে থাকে ধামার গান।

সাধারণভাবেই হিন্দি, উর্দু ও ব্রজভাষায় রচিত ‘রাধা-কৃষ্ণের’ লীলাবিষয়ক বর্ণনা এবং কৃষ্ণচরিত্র ও বৃন্দাবনের বর্ণনাই হচ্ছে ধামার গানের বিষয়বস্তু। এই শৈলীর গানে চৌদ্দমাত্রার বিষমপদী নির্দিষ্ট ‘ধামার’ তাল ব্যতীত অন্য কোনো তাল ব্যবহৃত হয় না।

ধামার গানের ৪ (চার)টি তুক বা বিভাগ থাকে। সেগুলো হচ্ছে – স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ। তবে স্থায়ী ও অন্তরা এ দুটি তুকের ধামার গান বর্তমানে বেশি প্রচলিত। শৃঙ্গার রসাত্মক এবং ধ্রুপদ অপেক্ষা লঘু হলেও চৌদ্দমাত্রাযুক্ত বিষমপদী তালে নিবদ্ধ এই গান গাওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

এই শৈলীর গানে যেভাবে দুগুণ, তিনগুণ, চৌগুণ, আড়, কুআড়, বিআড় ইত্যাদি লয়কারীতে বাট করতে হয়, তা কঠোর অনুশীলন ও বহু সাধনা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়।

ধামার গান গাওয়ার পূর্বে নোম-তোম ইত্যাদি বাণীর সহযোগে রাগভিত্তিক আলাপচারী করা হয়ে থাকে। এই শৈলীর গানে তান করা না হলেও নানান ছন্দের বোলতান প্রয়োগ একজন শিল্পীর দক্ষতা ও নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে।

আগের দিনের সংগীতগুণীজনেরা ধ্রুপদ গান গাওয়ার পর অপেক্ষাকৃত চঞ্চল প্রকৃতির ধামার গান পরিবেশন করতেন। কেউ কেউ এই শৈলীর গানকে হোরি বা হোলি গান বলে থাকেন, যা যুক্তিসংগত নয় বলেই অনেক সংগীতগুণীজনের ধারণা। তাঁদের মতে, হোরি বা হোলি নামে ভিন্ন শৈলীর আরো এক প্রকার গান প্রচলিত রয়েছে, যা ধামার হতে গুণগতভাবে ভিন্ন প্রকৃতির।

জনপ্রিয় একটি ধামার গান উদাহরণস্বরূপ প্রদান করা হলো –

কানা রাঙা ডারা দিও
মোবারা স্বাস মোরি
শুনেকো দেগি গারি ॥

ম্যায় তুমকো না জানাতা
সুয়ামি সুনে মোহে
মাড়হে আনাড়ি ৷৷

[ঠাট : ভৈরবী, রাগ : মালকোষ, বাদীস্বর : মধ্যম (ম), সমবাদীস্বর : ষড়জ (স), অঙ্গ উত্তরাঙ্গ প্রধান, জাতি : ঔড়ব-ঔড়ব, গায়ন সময় : রাত্রি তৃতীয় প্রহর, আরোহণ : ণ্ স জ্ঞ ম দ ণ র্স, অবরোহণ : র্স ণ দ ম জ্ঞ ম জ্ঞ স, তাল : ধামার (১৪ মাত্রা)। বি.দ্র. স্থায়ীর দ্বিগুণ পাচ (৫) মাত্রার পর থেকে ডারা বলে এবং অন্তরার দ্বিগুণ আট (৮) মাত্রা থেকে তুমাকো বলা হয়।]

ধ্রুপদ [ Dhrupad ]

ধ্রুপদ – সঙ্গীত শৈলী [ Dhrupad, Music Genre ] সম্পর্কে জানতে আমাদের ধ্রুপদ – সঙ্গীত শৈলী [ Dhrupad, Music Genre ] আর্টিকেলটি দেখুন।

পল্লীগীতি [ Palligiti ]

পল্লীগীতি – সঙ্গীত শৈলী [ Palligiti, Music Genre ] সম্পর্কে জানতে আমাদের পল্লীগীতি – সঙ্গীত শৈলী [ Palligiti, Music Genre ] 

ভজন [ Bhajan ]

ভজন শব্দের অর্থ হলো ঈশ্বর বা দেব-দেবীর স্তুতি করা, গৌরব বর্ণনা করা, গুণকীর্তন করা, প্রশংসা করা, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা। আর যে গানের মাধ্যমে ঈশ্বর বা দেব-দেবীর স্তুতি অর্থাৎ ভজন করা হয় তাকেই বলে ভজন। ভক্তিরস থেকে উদ্ভূত এই গানের কথা মূলত হিন্দু ধর্মীয় অধ্যাত্মবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাধারণত আত্মনিবেদনের সুর যে কোনো ভক্তমনে সাড়া জাগাতে সক্ষম। তাই গিরিধারী লাল বা গিরিধারী নাগর কিংবা শ্রীকৃষ্ণবিষয়ক ভাষার প্রয়োগ ভাবপ্রধান এই গানকে আরো বেশি আবেগাপ্লুত করে দেয়।
ভক্তিরসের ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে ভজন গানে সাংগীতিক নানা কুশলতা, তান, লয়কারীর প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়। বাংলাভূমির ভক্তবহুল বহু সাধক এই গানের মাধ্যমে ভগবানের উপাসনা করে সিদ্ধি লাভ করেছেন। তাঁদের রচিত ও প্রচারিত ভজন ব্যাপক আদৃত ও জনপ্রিয় হয়েছে।

ভক্তিরস আশ্রিত ভজন গানে রাগের বিশুদ্ধতার প্রতি সবসময় দৃষ্টি দেওয়া হয় না। বাণীর সঙ্গে মিলেমিশে হৃদয়ের ভক্তিভাবকে অনেক বেশি জাগ্রত করে তোলে এমন সুরই ভজন গানের জন্য উপযুক্ত। তাই প্রায় সব ভজন গানেই একাধিক রাগের মিশ্রণ ঘটে থাকে। হিন্দি ভাষায় রচিত ভজন গানের প্রচলন সবচেয়ে বেশি হলেও ভারতবর্ষে রাজ্যভেদে প্রায় সব ভাষাতেই ভজন গান শোনা যায়। আধুনিককালে বাংলা ভাষায় রচিত অনেক ভজন শোনা যায়, যা বাংলাভাষী ভক্তবৃন্দের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয়।

ভজন রচয়িতা সংগীতজ্ঞদের মধ্যে নায়ক কবীর, তুলসীদাস, নাগরী দাস, নানক, ব্যাসদাস, ব্রহ্মানন্দ, মীরা বাঈ, রুহিদাস, নায়ক সুরদাস প্রমুখ গুণীজনের নাম ভারতবর্ষের সংগীত ইতিহাসে এখনো হয়ে আছে সমুজ্জ্বল। এই গান সাধারণত দাদরা, কাহারবা ও ত্রি-তালের সঙ্গে বাঁধা হয়ে থাকে। ভজন গানের বিষয়বস্তুর মধ্যে থাকে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের জন্য আকুতি, তাঁকে অদর্শনের বেদনা, সুখ-দুঃখের চিরসাথী হিসেবে ভজনা, তাঁর লীলা বা গুণের বর্ণনা ইত্যাদি। মীরা বাঈয়ের একটি বিখ্যাত ভজন উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো –

বরসে বাদারিয়া সাবান কী
সাবান কী মন ভাবন কী।।

সাবান সে উমাঙ্গ মেরি মনওয়া
ভনক শুনি হরি আবন কী।
উমড় ঘুমড় চাই দিশসে আয়ো
দামিনী দমকে ঝাড় লাবন কী ॥

নানহী নানহী বুদন মেহা বরসে
শীতল পবন সোহাবান কী।
মীরাকে প্রভু গিরিধারী নাগর
আনন্দ মঙ্গল গাওয়ান কী ॥

[গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী মীরা বাঈ, রাগ: মিশ্র ইমন, তাল: কাহারবা (৮ মাত্রা)

সঙ্গীতের প্রকারভেদ [ জনরা, ধারা, ধরণ, প্রকার] প্রচলিত / অপ্রচলিত বিভিন্ন ধরণের সঙ্গীতের সাথে পরিচয় [ Introduction to Music Genres ]
সঙ্গীতের প্রকারভেদ [ জনরা, ধারা, ধরণ, প্রকার] প্রচলিত / অপ্রচলিত বিভিন্ন ধরণের সঙ্গীতের সাথে পরিচয়

ভাওয়াইয়া [ Bhawaiya gaan ]

এই বিষয়ে বিস্তারিত আর্টিকেল খুব দ্রুতই পাবেন

ভাটিয়ালি [ Bhatiyali Gaan ]

এই বিষয়ে বিস্তারিত আর্টিকেল খুব দ্রুতই পাবেন

ভাষার গান

এই বিষয়ে বিস্তারিত আর্টিকেল খুব দ্রুতই পাবেন

লোকসংগীত

এই বিষয়ে বিস্তারিত আর্টিকেল খুব দ্রুতই পাবেন

স্বাধীনতার গান

এই বিষয়ে বিস্তারিত আর্টিকেল খুব দ্রুতই পাবেন

আরও পড়ুন :

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।