সংগীতজ্ঞদের জীবনীর সারসংক্ষেপ [ Musicians & Musicologists Short Biography ]

সংগীতজ্ঞদের জীবনীর সারসংক্ষেপ

সংগীতজ্ঞদের জীবনী সম্পর্কে জানার প্রয়োজনীয়তা:

সংগীতজ্ঞদের জীবনী : আমরা আজ সঙ্গীত হিসেবে যা শুনছি তা একদিনে গড়ে ওঠেনি, এক বছরেও নয়, এক যুগেও নয়, এক শতাব্দীতে নয়, এমনকি এক সহস্রাব্দেও নয়। গত কয়েক সহস্রাব্দ ধরে, বহু জানা অজানা সংগীতজ্ঞ, তাদের প্রখর মেধা, জীবনের মহা মূল্যবান সময় ও শ্রমের মাধ্যমে, গড়ে দিয়ে গেছেন আজকের সঙ্গীতের ভিত্তি।

একজন ভালো শিল্পী বা একজন সঙ্গীত রসিক হবার জন্য তাদের সম্পর্কে জানা জরুরী। সেই উদ্দেশ্যে আমরা তাদের জীবনীর সারসংক্ষেপ আপনাদের সুবিধার্থে প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করি আপনাদের কাজে লাগবে।

সংগীতজ্ঞদের জীবনী:

আমরা একটি ক্রমে সংগীতজ্ঞদের জীবনী প্রকাশের উদ্যোগ নিলাম। একটি বিষয় আগে থেকে জানিয়ে রাখতে চাই যে শিল্পীর নামের জ্যৈষ্ঠতার কোন ক্রম মেনে আমরা আমাদের আর্টিকেলসমূহ প্রকাশের উদ্যোগ নিচ্ছি না। তাই কারও নাম আগে বা পরে লেখার কোন উদ্দেশ্য নেই।

আমরা আর্টিকেল এর শব্দসংখ্যা খুব কম হলে এই আর্টিকেলের সাথেই যুক্ত করবো। আর্টিকেল বেশি বড় হলে আলাদা করে প্রকাশ করে এখানে লিংক যুক্ত করে দেয়া হবে। তবে এই আর্টিকেলের টেবিল অব কন্টেন্ট এর মাধ্যমে ব্রাউজ করে সব পাওয়া যাবে।

শারঙ্গদেব [ ১১৭৫ – ১২৪৭ ]

প্রাচীনকালের শাস্ত্রীয় গ্রন্থে লেখক পরিচিতি দেওয়ার কোনো রীতি ছিল না। তাই কোনও শাস্ত্রকারের নাম ছাড়া আর কিছু জানতে হলে অপরের উক্তি বা প্রচলিত কাহিনীর ওপরই নির্ভর করতে হয়। অবশ্য যে কয়েকজন পণ্ডিত নিজেদের বংশপরিচয় তাঁদের রচিত গ্রন্থে সংক্ষেপে লিখেছিলেন তাঁদের মধ্যে পণ্ডিত শারঙ্গদেব একজন।

শারঙ্গদেবের পূর্বপুরুষরা ছিলেন কাশ্মীরের অধিবাসী এবং যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণ। এ বংশের প্রতিভাবান পুরুষরা স্থানীয়দের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দক্ষিণ ভারতে চলে যান। ভাস্করের পুত্র সোডল দেবগিরির (বর্তমান দৌলতাবাদ, মহারাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত) যাদব বংশীয় রাজা ভিল্লম (১১৮৫-১১৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) ও পরে তাঁর পুত্র সিংহনের দরবারে উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন।

সিংহনের রাজত্বকালে (১২০৫-৪৭, মতান্তরে ১২০৮-৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) সোডলের পুত্র শারঙ্গদেবের জন্ম হয়। কোনও কোনও সংগীত গুণীজন ধারণা করেন ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন ভারতীয় সংগীতের কিংবদন্তি জ্যোতিষ্ক শারঙ্গদেব। অসাধারণ প্রতিভাবান শারঙ্গদেব অল্প বয়সেই নানা বিদ্যায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন এবং শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে রাজাশ্রয় লাভ করার ফলে সংগীতসহ অন্যান্য বিদ্যায় সুপণ্ডিত হওয়ার সুযোগ পান।

লেখাপড়া ও সংগীতচর্চা নিয়েই তাঁর বেশিরভাগ সময় কাটত। সেই সঙ্গে তিনি চিকিৎসকের কাজও করতেন। অবশ্য নিজেকে তিনি শ্রীকরণাগ্রণী বলে পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন করণ বা দপ্তরের প্রধান কর্মচারী। তাঁর ডাকনাম ছিল নিঃসঙ্ক। তাই তাঁর উদ্ভাবিত বীণার নাম রেখেছিলেন ‘নিঃসঙ্কবীণা’।

সে সময় প্রাপ্ত যাবতীয় সংগীতশাস্ত্র অধ্যয়ন করে আনুমানিক ১২৪৮-৬৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তিনি সঙ্গীত রত্নাকর গ্রন্থটি রচনা করেন। যা স্বরাধ্যায়, রাগাধ্যায়, প্রকীর্ণাধ্যায়, প্রবন্ধাধ্যায়, বাদ্যাধ্যায়, তালাধ্যায় ও নৃত্যাধ্যায় এই সাতটি পরিচ্ছেদ নিয়ে সম্পন্ন। মধ্যযুগে সংগীতবিষয়ক এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রন্থ আর পাওয়া যায়নি।

এই গ্রন্থে সাংগীতিক যাবতীয় বিষয় সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। তিনি ভরত ও মতঙ্গের অনুগামী শাস্ত্রকার হলেও পূর্বসূরি আচার্যদের প্রমাণবাক্যের উল্লেখ সহযোগে প্রাচীন ও সমসাময়িক সংগীতের পরিচয় দিয়েছেন। গান্ধর্বগীত সম্বন্ধে তিনি যেমন আলোচনা করেছেন তাতে মনে হয় ওই রীতির ওপর তাঁর প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছিল ।

ভারতীয় সংগীতে মধ্য এশিয়ার প্রভাব, প্রাচীন সংগীতের ক্রমবিবর্তন, বহুবিচিত্র গীতরীতির জন্ম-ইতিহাস, এমনকি স্বরলিপিসহকারে সংগীত সংরক্ষণের প্রচেষ্টাও তিনি করেছেন। এছাড়া ভরত-বর্ণিত চলাচল বীণার সাহায্যে বাইশটি শ্রুতি ও স্বরস্থান নিরূপণের বিষয়টিরও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি অভিজাত সংগীতেরই বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রয়োগ ক্ষেত্রে যা সত্য তাই প্রকৃত শাস্ত্র প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবহেলিত শাস্ত্রের কোনো মূল্য নেই। তিনি স্বীকার করেছেন যে, গান্ধর্ব বা মার্গসংগীত গ্রন্থের পাতায় আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত হচ্ছে দেশি সংগীত, যা নির্দিষ্ট মাত্রায় এবং কালানুগত বন্ধনে নিজেকে আবদ্ধ রাখে না।

সঙ্গীত রত্নাকর গ্রন্থটি সংগীতজগতের একটি অমূল্য রত্নবিশেষ এবং সমগ্র উপমহাদেশে প্রামাণ্য পুস্তক হিসেবে স্বীকৃত। এই গ্রন্থের দুরূহ বিষয় সম্পর্কে সহজবোধ্য টীকা রচনা করে পরবর্তীকালে সিংহভুপাল (১৪০০ শতাব্দী) এবং কল্পিনাথ (১৫০০ শতাব্দী) যশস্বী হয়েছেন। এই গ্রন্থ সম্পর্কে সিংহভুপাল বলেছেন যে –

‘শারঙ্গদেবের আবির্ভাবের পূর্বে ভরত আদি পূর্বাচার্যদের বর্ণিত সকল সাঙ্গীতিক উপকরণ পদ্ধতি যখন দুর্বোধ্য তথা লুপ্ত হতে চলেছিলো, তিনিই সেসকল মূল্যবান তথ্যসমূহ সংরক্ষণ করিয়াছেন’।

এই গ্রন্থে বর্ণিত বহু বিচিত্র রাগের মধ্যে মালব, গৌড়, কর্ণাট, বাঙালি, দ্রাবিড়, সৌরাষ্ট্র, গুর্জর ইত্যাদি রাগনাম প্রদেশ বিশেষের নামের সঙ্গে সম্বন্ধ সূচনা করে। সে-সময় এই রীতিতে রাগের নামকরণ করা হতো বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া তুরস্কতোড়ি, তুরস্কগৌড় ইত্যাদি রাগের প্রতিপাদন প্রমাণ করে যে, তখন সংগীতে মুসলমানদের প্রভাব দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

শারঙ্গদেব বর্ণিত শুদ্ধরাগ ‘মুখারী’ বর্তমান কর্ণাটকি সংগীতে ‘কনকাঙ্গী’ নামে পরিচিত। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষদিকে এই বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও সংগীতশাস্ত্রকার নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে অন্ত সুরালোকে গমন করে।

[ সংগীতজ্ঞদের জীবনীর সারসংক্ষেপ [ Musicians & Musicologists Short Biography ]

হজরত আমির খসরু (১২৫৩ – ১৩২৫)

স্বামী হরিদাস

সুরসম্রাট মিয়া তানসেনের সংগীতগুরু স্বামী হরিদাসের অতন্দ্র প্রহরায় উত্তর ভারতীয় সংগীত অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তাই এই বিদগ্ধ সংগীতগুণীজনকে বলা হয় ভারতীয় সংগীতের পরিত্রাতা। গতানুগতিক ধর্মাশ্রয়ী সংগীতকে তিনিই নতুনভাবে সজ্জিত করে জনসমাজে প্রচলন ও প্রসারিত করেন। তাঁর সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার গায়নশৈলী এক নতুন রূপ ধারণ করে তৎকালীন সংগীতভুবনকে এগিয়ে নিয়ে যায় আলোকময় পথে।

উত্তর প্রদেশের আলিগড় জেলার একটি গ্রামে স্বামী হরিদাস জন্মগ্রহণ করেন। ভক্তসিন্ধু গ্রন্থে তাঁর জন্ম ১৪৪১ খ্রিষ্টাব্দে উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো সংগীত-গবেষক ও সংগীতজ্ঞ বলেন, ১৪৩৭ খ্রিষ্টাব্দ স্বামী হরিদাসের জন্মের বছর। আবার কারো কারো মতে ১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল স্বামী আশুধীর এবং মাতার নাম গঙ্গা। আশুধীর মুলতান জেলার উচ্চশ্রেণির সারস্বত ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং স্বামী-স্ত্রী দুজনই বিশেষ ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন।

তবে স্বামী হরিদাসের জন্মদাতার নাম স্বামী আশুধীর কি না সে বিষয়ে অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন। তাঁদের মতে, হরিদাস ছিলেন ধনাঢ্য ব্রাহ্মণ এবং আশুধীর সারস্বত ব্রাহ্মণ। সুতরাং তাঁদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক থাকা সম্ভব নয়। তাই পুত্র নয়, বরং পুত্রসম ছিলেন বলাই হয়তো ঠিক হবে। কিন্তু বেশিরভাগ সংগীত-গবেষক এবং গুণীজন প্রথম মতটিকেই বহুলাংশে সমর্থন করে থাকেন।

সংগীতের সংস্কার করার মহান দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই যেন স্বামী হরিদাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সাধক জীবনে সংগীত ক্রমে ক্রমে ঈশ্বর সাধনার পথে একটি প্রধান অবলম্বন হিসেবে পরিগণিত হয়। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি বৃন্দাবনে চলে যান এবং কৃষ্ণ ভজনায় মনপ্রাণ সমর্পণ করেন।

স্বামী হরিদাস ছিলেন নিঃস্বার্থ সম্প্রদায়ভুক্ত এবং বৃন্দাবনে তাঁরই নামানুসারে ‘হরিদাসী সম্প্রদায়’ নামে একটি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। বৃন্দাবনের । বাঁকেবিহারির মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী হরিদাস নিধুবন নিকুঞ্জে একটি ছোট কুটিরে সাধন-ভজন করেই সারাটি জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। সে সময়ের আরো দু-একজন হরিদাসের নামও জানা যায়। সেজন্য স্বামী হরিদাসকে বলা হতো আসুকো হরিদাস’।

তিনি ব্রজভাষায় ধ্রুপদাঙ্গের কিছু কিছু পদ রচনা করেছেন। প্রত্যেকটি গানে রাগরূপকে তিনি অবিকৃত রেখে সুরারোপ করেছেন। এবং তালকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়েছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের যথাযথ প্রচারের জন্য তিনি যে শিষ্যমণ্ডলী তৈরি করেছিলেন, উত্তরকালে তাঁরা সকলেই সংগীতের জগতে একেকজন দিকপাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে মিয়া তানসেন ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। অন্যদের মধ্যে রাজা শৌরসেন, দিবাকর পণ্ডিত, সোমনাথ পণ্ডিত, নায়ক রামদাস, নায়ক বৈজু বাওরা, নায়ক গোপাল লাল, নায়ক মদন রায় প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ধর্মপ্রচারের জন্য সুরারোপ করে নৃত্যসহযোগে তিনি বৃন্দাবনে যে রাসের পদ গানের প্রচলন করেন তাই বর্তমানকালের ব্রজধামের রাসলীলা। কেবল রাসলীলা নয়, হোলি গানেরও তিনি উন্নততর প্রবর্তক। একই সঙ্গে তিনি গীত, বাদ্য ও নৃত্যের যথেষ্ট উন্নতি বিধান করেছিলেন। তিনি ১৫০০ শতাব্দীর পরিবর্তিত ধ্রুব-প্রবন্ধাবলিকেই গ্রহণ করেন এবং ভগবানের গুণকীর্তনের মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছিলে

স্বামী হরিদাসজির নামে কয়েকটি গ্রন্থ পাওয়া যায়, তার মধ্যে হরিদাসজিকো গ্রন্থ, স্বামী হরিদাসজিকো পদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে এই গ্রন্থগুলো তাঁর নামে অন্য কারো রচিত কি না তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না। উত্তর ভারতীয় সংগীতের বিদগ্ধ অধিনায়ক ও ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ বেশ কয়েকজন সংগীতজ্ঞ তৈরির মহান কারিগর স্বামী হরিদাস ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সুর স্বর্গালোকের উদ্দেশে মহাপ্রস্থান করেন।

[ সংগীতজ্ঞদের জীবনীর সারসংক্ষেপ [ Musicians & Musicologists Short Biography ]

রাজা মানসিংহ তোমর
মিয়া তানসেন (মোহাম্মদ আতা আলী খান)
সদারঙ্গ
অদারঙ্গ

সংগীতজ্ঞ সদারঙ্গের দুই পুত্র। তাঁদের একজনের নাম ফিরোজ খাঁ, যাঁর ছদ্মনাম অদারঙ্গ এবং অপর পুত্রের নাম ভুপত খা, যাঁর ছদ্মনাম মহারঙ্গ। সদারঙ্গের উত্তর সাধক হিসেবে অদারঙ্গের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কোনো একসময়ে তাঁর জন্ম হয় বলে জানা যায়। মহাপ্রতিভাবান সংগীতজ্ঞ পিতা ওস্তাদ নিয়ামত খাঁ সাহেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে শৈশব থেকেই তিনি সংগীতসাধনায় মনোনিবেশ করেন। উপযুক্ত শিষ্য পুত্র ফিরোজ খাঁকে পিতা সদারঙ্গ নিজ ভাণ্ডার উজাড় করে সংগীতশিক্ষা প্রদান করেন।

নিবিষ্ট সাধনা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, পর্যাপ্ত অনুশীলন এবং সংগীতের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসার কারণে অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে ওঠেন তিনি সংগীতভুবনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। পিতার মতো খেয়াল গায়ক ও সংগীতস্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বীণাশিল্পী এবং ধামার গানের জন্য তিনি বিশেষভাবে খ্যাতি অর্জন করেন। ঈর্ষণীয় সংগীতনৈপুণ্যের গুণে ফিরোজ খাঁ দিল্লির সম্রাট মোহাম্মদ শাহের দরবারে একজন সুগায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করেন।

বাদশাহ নামদার অসাধারণ সংগীতপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ফিরোজ খাঁকে ‘অদারঙ্গ’ উপাধি প্রদান করেন। তাঁর রচনাশক্তি ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী, আকর্ষণীয়, প্রখর মেধাদীপ্ত, দারুণ কুশলী ও চমৎকার প্রশংসনীয়। স্বনামখ্যাত পিতার পথ অনুসরণ করে তিনি প্রচুর ধ্রুপদ, খেয়াল ও তারানা রচনা করেন। তাঁর গানের আঙ্গিক ও রচনাশৈলী ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও নান্দনিকতাপূর্ণ। তাঁর সৃষ্ট ‘ফিরোজখানি টোড়ি’ বর্তমান সময়ে বিশেষভাবে সমাদৃত।

অদারঙ্গের গানগুলোর বেশিরভাগই মোহাম্মদ শাহের স্তুতিসূচক হলেও ভাষার মাধুর্য ও ভাবের মননশীলতায় এক বিশেষ মাত্রা প্রদানের সাক্ষ্য বহন করে। সংগীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুণী পিতার অনুসারী ছিলেন বলেই সংগীতভুবনে ফিরোজ খাঁ ওরফে অদারঙ্গ নামটি আজো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। উচ্চাঙ্গসংগীতের বন্দিশে ‘অদারঙ্গ’ উল্লেখ হলে তা এই গুণী সংগীতজ্ঞের অপূর্ব কুশলী সৃজনশীলতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

হস্স্সু খাঁ ও হদ্দু খান

হসু খাঁ ও তাঁর ভাই ওস্তাদ হদ্দু খাঁ ছিলেন গোয়ালিয়র ঘরানার প্রখ্যাত গায়ক। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই সংগীতগুণী দুই ভাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের পিতা কাদির বখস এবং পিতামহ নখন পীর বখস হিন্দুস্তানি সংগীতজগতে অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। হসু ও হদু খাঁ অল্প বয়সে পিতাকে হারান। ফলে পিতামহের আশ্রয়েই দুই ভাই গোয়ালিয়রে লালিত-পালিত হন।

এসময় গোয়ালিয়রের অধিপতি ছিলেন মহারাজা দৌলতরাও সিন্ধে। তাঁর দরবারে তখন সভাগায়ক ছিলেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান খেয়াল গায়ক ওস্তাদ মুহম্মদ খাঁ। হসু খাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অপূর্ব। মহারাজ সিন্ধে হসু ও হুদ্দুকে মুহম্মদ খাঁর গান গোপনে শোনার ব্যবস্থা করে দেন। কারণ পুরনো গোষ্ঠী বিবাদের জন্য মুহম্মদ খাঁ কিছুতেই তাঁদের সংগীতশিক্ষা দিতে রাজি ছিলেন না। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ঐশ্বরিক গায়নক্ষমতার অধিকারী হসু ও হদ্দু খাঁ ওস্তাদ মুহম্মদ খাঁর গায়কি আয়ত্ত করে ফেলেন। এরপর মহারাজ দৌলতরাও একদিন তাঁর দরবারে জলসার আয়োজন করেন। সেখানে দুই ভাই তাঁদের প্রতিভার পরিচয় দিয়ে উপস্থিত সকলকে চমৎকৃত করেন। এতে মুহম্মদ খাঁ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন।

এরপর মুহম্মদ খাঁ হসু ও হদ্দু খাঁর ক্ষতি করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। খুব দ্রুত এক সুযোগ জুটে যায়। পরবর্তী সময়ে আরেকটি জলসার আয়োজন করা হলে মুহম্মদ খাঁ চক্রান্ত করে হসু খাঁকে ‘মিয়াকি মালহার’ গাইতে অনুরোধ করেন। সরল স্বভাবের হসু খাঁ কোনো কিছুর বিপদ আশঙ্কা না করে গান ধরেন। এই গানে তাঁর প্রতিপক্ষ ওস্তাদরা ‘কড়ক বিজলি’ নামে এক প্রকার কঠিন তান প্রয়োগ করেন। হসু খাঁ তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিতীয়বার ওই তান প্রয়োগ করেন। কিন্তু এর ফলে অতিরিক্ত দম রাখার জন্য তাঁর বুকে আঘাত লাগে এবং মুখ দিয়ে রক্তবমি হতে থাকে। এই আঘাতের কিছুকাল পরে ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে হসু খাঁর মৃত্যু হয়। তরুণ বয়সেই এক প্রতিভাবান গায়কের জীবনাবসান হয়।

বড় ভাই হসু খাঁর মৃত্যুর পর হদ্দু খাঁ কিছুকালের জন্য গোয়ালিয়র ত্যাগ করে পৈতৃক নিবাস লক্ষ্ণৌতে চলে যান। শিগগিরই লক্ষ্ণৌতে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর কণ্ঠস্বর বড় ভাই হসু খাঁর মতো সুমিষ্ট না হলেও বেশ সুরেলা ছিল। গল্প প্রচলিত আছে গান করার সময় হঠাৎ জোরালো কণ্ঠে তান প্রয়োগ করলে আস্তাবলে বাঁধা – একবার তিনি একটি ঘোড়া বিকট চিৎকার করে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যায়। কিছুকাল লক্ষ্ণৌবাসী থাকার পর গুজরাট রাজ্যের বরোদার মহারাজা সয়াজিরাওয়ের আমন্ত্রণে হদ্দু খাঁ গোয়ালিয়রে প্রত্যাবর্তন করেন।

মিয়াকি মালহার, ইমন, মালকোষ, তোরি বা টোড়ি, দরবারি-কানাড়া, বেহাগ ইত্যাদি রাগ হদ্দু খাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। গান করার সময় তিনি প্রথমে বিলম্বিত লয়ে শুরু করতেন। স্থায়ী এবং অন্তরা এই বিলম্বিত লয়ে। গাওয়ার পর বোলতান এবং বিভিন্ন প্রকার তান প্রয়োগ করতেন। তারপর একই রাগে একটি ছোট খেয়াল আরম্ভ করতেন এবং দ্রুতলয়ে তা পরিবেশন করতেন। তাঁর সপ্তকে ইচ্ছেমতো বিচরণ এবং সুরেলা কণ্ঠে স্পষ্ট তান প্রয়োগ ছিল তাঁর সংগীতশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ওস্তাদ হদ্দু খার অগণিত শিষ্যের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী গায়কের সংখ্যাই ছিল বেশি। ওস্তাদ হদ্দু খাঁ দুইবার বিয়ে করেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর গর্ভজাত দুই পুত্র মুহম্মদ খাঁ ও রহমত খাঁ। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত দুই কন্যার মধ্যে অগ্রজের বিয়ে হয় ওস্তাদ ইনায়েত খাঁর সঙ্গে এবং ছোট মেয়ের বিয়ে হয় প্রসিদ্ধ বীণাশিল্পী ওস্তাদ বন্দে আলী খাঁর সঙ্গে। বৃদ্ধাবস্থায় ওস্তাদ হদ্দু খাঁর শরীরের নিচের অংশ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। ওই অবস্থায়ও তাঁকে রাজদরবারে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো গান গাওয়ার জন্য। মৃত্যুর এক মাস আগেও এই সংগীতসাধক প্রতিদিন নিয়মিত ছয় ঘণ্টা রেয়াজ করতেন। জীবনের গোধূলিলগ্ন পর্যন্ত সংগীতের সেবায় নিমগ্ন থেকে ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে গোয়ালিয়রে তাঁর জীবনাবসান হয়।

ওস্তাদ আব্দুল করিম খান

ওস্তাদ হাফিজ আলী খান

বিদগ্ধ সুরসাধক ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ এক বিখ্যাত সংগীত পরিবারের উত্তরসূরি। তিনি ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে গোয়ালিয়রে জন্মগ্রহণ করেন। প্রপিতামহ ওস্তাদ গুলাম বন্দেগি ছিলেন তৎকালীন সময়ের সুবিখ্যাত রবাবশিল্পী। তাঁর পুত্র ওস্তাদ গুলাম আলী পিতার কাছে রবাববাদন শিখে সেই বাদ্যযন্ত্রের অনুসরণে সরোদ বাদ্যযন্ত্রের জনক হিসেবে বরণীয় হন।

ওস্তাদ গুলাম আলীর সুযোগ্য পুত্র নন্নে খাঁ একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সরোদবাদক হিসেবে গোয়ালিয়র রাজসভায় সভাবাদক পদে নিজের স্থান করে নেন। পিতার উপযুক্ত পুত্র হাফিজ আলী খাঁ সাধনার মাধ্যমে এক বিশেষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন এবং ‘আফতাবে-সরোদ উপাধি লাভ করে রাজসভায় পিতার আসনে সমমর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হন। পিতা ওস্তাদ নন্নে খাঁ উচ্চাঙ্গসংগীতের গুরুত্ব বুঝতেন বলেই হয়তো পুত্র হাফিজকে উপযুক্ত তালিম প্রদান করেছিলেন।

সংগীতশিক্ষার উদগ্র বাসনায় তাড়িত হয়ে পরে তিনি বৃন্দাবনে প্রখ্যাত ধ্রুপদিয়া ও হোলি গায়ক মহারাজ গণেশলাল চৌবে, রামপুরের বিশ্ববিশ্রুত সভাবাদক ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে হোলি, ধ্রুবগান ও সুরশৃঙ্গার বাদ্যযন্ত্রের তালিম গ্রহণ করেন।
বৈবাহিক সূত্রে তিনি রামপুরের নবাব হামিদ আলীর পরম আত্মীয় ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। ফলে নবাবগুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সাহেবের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয় তাঁর। বিখ্যাত সেতারবাদক ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেবের বাদনশৈলী তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল। তিনি ওস্তাদ আমির খাঁর বাদনরীতি এবং নিজস্ব ঢঙের সমন্বয় ঘটিয়ে এক নতুন ধারা প্রবর্তন করেন।

ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ নিজ চাচা ওস্তাদ মুরাদ আলী খাঁর কাছেও দীর্ঘ সময় সংগীতশিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ সরোদবাদক ওস্তাদ ফিদা হোসেন খাঁর কাছে তিনি সরোদ বাদন পদ্ধতি এবং তাঁর নানা যান্ত্রিক ক্রিয়াকৌশল শেখেন। কলকাতার রামচাঁদ বড়াল মহাশয়ের মতে –

“তাঁর দ্রুত তান ক্ষেপণে রাগের শুদ্ধতা রক্ষা করা অনিবার্য বলে মনে হতো। কেননা, অনেক সময় বিশেষ করে তান-এর ক্ষেত্রে সমপ্রকৃতির রাগের মিশ্রণ অনেক শিল্পীর কণ্ঠে বা বাদনে অনুসৃত হতে দেখা যায় বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল। কারণ, সুহা কানাড়া, সুঘরাই কানাড়া, দরবারী কানাড়া ইত্যাদি তানের ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা হয় না’।

ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁর বাদনে মুগ্ধ হয়ে গোয়ালিয়রের রাজা তাঁকে রাজদরবারের সভাসংগীতজ্ঞ পদে সসম্মানে নিযুক্ত করেছিলেন। সেখানে থাকাকালীন তাঁর অনন্যসাধারণ রাগ রূপায়ণক্ষমতা তৎকালীন সংগীতাঙ্গনে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

সমগ্র ভারতে তাঁর সুরের ঢেউ অপূর্ব ভালোলাগার দোলা দিয়েছিল। তিনি কলকাতা, গৌরীপুর, মুক্তাগাছা, ঢাকা প্রভৃতি স্থানে ১৯২০-২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সংগীত সফর করে বেড়ান। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পরের তিন বছর তিনি গুরুজি ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ, গুরুবন্ধু নবাব চম্মন খাঁ এবং রামপুরের নবাব হামিদ আলী খাঁকে হারান। এর কিছুদিন পর তাঁর স্ত্রী ও শ্বশুর সাহেব ইন্তেকাল করেন। প্রিয়জনদের বিয়োগব্যথায় অত্যন্ত মুষড়ে পড়েন তিনি। তারপর থেকে বেশিরভাগ সময় তিনি গোয়ালিয়রেই কাটাতেন।

বেশ কিছুদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ থেকে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর অসাধারণ সংগীত প্রতিভা ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। শিল্পীজীবনে দর্শক-শ্রোতার কাছ থেকে যেমন অঢেল শ্রদ্ধা লাভ করেছেন তিনি তেমনি স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বিভিন্ন খেতাব ও বহু সম্মাননা। ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’, বিশ্বভারতী ‘দেশীকোত্তম’ এবং খয়রাগড় বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডিলিট’ প্রদান করে সম্মানিত করে। খ্যাতিমান পিতার সুযোগ্য পুত্র মুবারক, বাব্বু ও আমজাদ আলী খাঁ উত্তর সাধক হিসেবে পরিচিতি লাভসহ স্বপ্রতিভায় হয়েছে উদ্ভাসিত।

 

সংগীতজ্ঞদের জীবনীর সারসংক্ষেপ
সংগীতজ্ঞদের জীবনীর সারসংক্ষেপ

ইনায়েত খা

ওঙ্কারনাথ ঠাকুর

পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর [Pandit Omkarnath Thakur ] এর সংক্ষিপ্ত জীবনী দেখুন এই লিংকে

ফকির লালন সাঁই

ফকির লালন সাঁই সম্পর্কে জানতে পড়ুন:
১. মিউজিক গুরুকুল : লালনকথা

২. সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর : ছোটদের লালন সাঁই

সবদর হোসেন খাঁ
হাছন রাজা
মনোমোহন দত্ত ফকির (তাপস) আফতাবউদ্দিন খাঁ

ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন

ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন – বাংলাভূমির এক বিদগ্ধ সংগীতগুণীজন।

জসীম উদ্‌দীন

গীতিকবি জসীম উদ্‌দীন কে নিয়ে বাংলা গুরুকুলে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে “গীতিকবি জসীম উদ্‌দীন [ Poet Jasimuddin ] ” নামে।

হিরণ চন্দ্র নট্ট

হিরণ চন্দ্র নট্ট স্পর্কে জানতে দেখুন  পন্ডিত হিরণ চন্দ্র নট্ট

হিমাংশু কুমার দত্ত

হিমাংশু কুমার দত্ত সম্পর্কে দেখুন হিমাংশু দত্ত [ Himangshu Dutta ]

মোজাম্মেল হোসেন

মোজাম্মেল হোসেন সম্পর্কে জানতে পড়ুন “মোজাম্মেল হোসেন

কুলেন্দু দাস

কুলেন্দু দাস বিষয়ে জানতে পড়ুন “কুলেন্দু দাস

আবদুল আজিজ বাচ্চু আখতার সাদমানী

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

3 Comments to “সংগীতজ্ঞদের জীবনীর সারসংক্ষেপ [ Musicians & Musicologists Short Biography ]”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।