মালশি গান [ Malshi Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] কবিগানের আর এক ধরনের সূচনা সঙ্গীত

মালশি গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

মালশি গান : ডাক গানের পর মালশি গান পরিবেশিত হয়। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ কবিগানের ভবানীবিষয় এবং বিজয়া নামের গানগুলো ক্রমে মালশি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ‘মালশি’ শব্দটি মালব বা মালবশ্রী শব্দের অপভ্রংশ হওয়া সম্ভব। তাই এমন অনুমান করা চলে যে, উনিশ শতকের কোনো এক পর্যায়ে এই শ্রেণির গান ব্যাপকভাবে মালব বা মালবশ্রী রাগে গীত হতো এবং তার ফলে রাগটির নামের অনুসরণে গানগুলো মালশি নামে পরিচিতি পায়। নিম্নে গোপালগঞ্জের কবিয়াল মনোহর সরকারের একটি মালশি উদ্ধৃত করা হলো:

মালশি গান [ Malshi Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] কবিগানের আর এক ধরনের সূচনা সঙ্গীত :

মালশি গান [ Malshi Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] কবিগানের আর এক ধরনের সূচনা সঙ্গীত

চিতান [ Chitan ] :

তারা জন্ম নিয়ে ভূমণ্ডলে মা তোর কোলে পেলাম কতো সুখ ৷

পাড়ন [Paron ] :

কতো সুমিষ্ট ফল খেয়েছি, শান্তির কুটির পেয়েছি
মাগো তোর দয়ায় সুখে আছি, দেখিতেছি ভবে পুত্রকন্যার মুখ ॥

১ম ফুকার [ 1st Phukar ] :

মাগো বাল্য আর যৌবনারম্ভে ছিলাম মা তোর কোলে
শেষে মহামায়ার কোলে দিয়ে কোলছাড়া করিলে।
আমার আর কি সেদিন আসবে ফিরে
বসবো মা তোর কোলের পরে
আধো আধো মধুর স্বরে আর কি ডাকবো মা বোল বলে ॥

মিশ [ Mish ] :

আমায় সুখে দুঃখে রেখে তারা দেখিস কৃপানেত্রে
এখন ফেলে দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ভুলে গেলি পুত্রস্নেহ।

মুখ [ Mukh ] :

এতো ভালোবাসি তারা তবে কেন সারাৎসারা

জীর্ণ জরা করলি আমার দেহ ॥

প্যাঁচ [ Patch ] :

আমার ভোলা পিতার মন ভুলায়ে

রাখলি ভাবরসে তার প্রাণ গলায়ে করলি আমায় সৃষ্টি
মা তোর বুকের দুগ্ধ পান করালি করে শুভদৃষ্টি ।
যখনেতে প্রসবিলে আকাশের চাঁদ হাতে পেলে
এমন মমতা দূরে ফেলে জ্বেলে দিলে ত্রিতাপ দাহ।।

মুখ [ Mukh ] :

এতো ভালোবাসি তারা তবে কেন সারাৎসারা
জীর্ণ জরা করলি আমার দেহ।

খোচ [ Khoch ] :

মা বিনে সন্তানের মায়া আর কি বোঝে কেহ ॥

২য় ফুকার [ 2nd Phukar ] :

আমায় যখন যেভাবে রাখিস তাতেই থাকি রাজি
আমার আর কোনো ধন নাই মা সম্বল, চরণমাত্র পুঁজি।
তোমার মোহমায়ায় পড়ে ধরা, বাহ্যচিন্তায় আত্মহারা
এখন দেখি সবই তারা তোরই ভোজের বাজি।।

মিশ [ Mish ] :

আমায় সুখে দুঃখে রেখে তারা দেখিস কৃপানেত্রে
এখন ফেলে দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ভুলে গেলি পুত্রস্নেহ।

মুখ [ Mukh ] :

এতো ভালোবাসি তারা তবে কেন সারাৎসারা

জীর্ণ জরা করলি আমার দেহ ॥

অন্তরা [ Antora ] :

পুত্রের প্রতি বাদানুবাদ, এই বিসম্বাদ তারা তোর অন্তরে।
যদি এতো ছিলো মনে

প্রসবের দিনে মারলি না কেন স্মৃতিকাগারে।
ভেক ভুজঙ্গের মাতা যেমন প্রসবিয়া করে গ্রহণ
সেই স্বভাব করেছিস ধারণ এতো দিনের পরে।

থাকতে মাতা বর্তমানে, পুত্র মরলো প্রাণে
মা বলে কে ডাকবে তোরে ॥

পরিচিতান [ Parichitan ] :

আমার সংসারের ভাব জানা আছে, কাছে কাছে থাকতে সতত।

পরপাড়ন [Porparon ] :

এখন কি খেলা মা খেলেছিস, পূর্বের মায়া ভুলেছিস

সেজেছিস মা বিমাতার মতো ॥

শেষ ফুকার [ Last Phukar ] :

ও তুই পাষাণীর কন্যা ঈশানী পাষাণীর জঠরে

ও তোর পাষাণ প্রাণে পুত্রের মায়া বুঝবে কেমন করে।

করে পঞ্চভূতে ভূতের কাণ্ড দক্ষযজ্ঞ লণ্ডভণ্ড

বাপকে দিলি ছাগের মুণ্ড, তুই আর খাতির করবি কারে ॥

চুট্টি [ Chutti ] :

আমায় সুখে দুঃখে রেখে তারা দেখিস কৃপানেত্রে

এখন ফেলে দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ভুলে গেলি পুত্রস্নেহ ।৫

[৫ সংকলিত, দীনেশচন্দ্র সিংহ, পূর্ববঙ্গের কবিগান সংগ্রহ ও পর্যালোচনা, পৃ. ১০৬। স্বরূপেন্দু সরকারের সংগ্রহ থেকে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তুক-নামগুলোতে স্বরূপেন্দু সরকারের পাঠ অনুসরণ করা হয়েছে।]

সাধারণত ডাক গান পরিবেশনের পরপরই মালশি গান পরিবেশিত হয় বলে এবং অভিন্ন আসরে অভিন্ন দোহারগণ একটা শেষ হওয়ামাত্র অন্যটা শুরু করেন । সেজন্য কবিগানের শ্রোতাদের নিকটে গান দুটো একত্রে ডাক-মালশি নামে পরিচিত হতে শুরু করে। ডাক ও মালশি গানের মধ্যে বিষয় ও উপস্থাপনগত একাধিক সাদৃশ্য তার কারণ। প্রথমত, উভয় গানই সাধারণত আদ্যাশক্তিকে নিয়ে এবং তাঁর উদ্দেশে গাওয়া হয়; দ্বিতীয়ত, এইসব গানের কোনো চাপান-উতোর হয় না। উভয় দলকেই ডাক ও মালশি পরিবেশন করতে হয়। কোন দল কী ধরনের ডাক ও কী ধরনের মালশি পরিবেশন করবে, দলপ্রধান বা দলের সরকার তা নির্ধারণ করে থাকেন।

মালশি গান [ Malshi Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] কবিগানের আর এক ধরনের সূচনা সঙ্গীত

 

মালশি গানের তুক বা স্তবকসংখ্যা কমবেশি ১২টি। সাধারণত এগুলোর ক্রম নিম্নরূপ :

  • চিতান (ধরন ও পাড়ন)
  • ফুকার, মিল বা মিশ
  • মুখ
  • পঁাচ বা ডাইনা
  • খোচ বা খাদ
  • ২য় ফুকার
  • ২য় মিশ বা মিল
  • অস্তরা
  • পরচিতান
  • ৩য় ফুকার
  • শেষ মিশ বা ছুট্টি।

* কোথাও কোথাও ছুটির পরেও মুখ গাওয়ার রীতি রয়েছে। ডাক গান ও ধুয়া গান ছাড়া মালশি গানের এই গঠন কবিগানের অন্য সব গানের স্তবক-বিন্যাসের অনুরূপ।

কালী বা দুর্গা উভয় দেবীর উদ্দেশে মালশি গান রচিত হয়ে থাকে। অঞ্চলভেদে কখনো কখনো শুধু কালীবিষয়ক গানকে মালশি গান এবং দুর্গাবিষয়ক গানকে ভবানীবিষয় গান বলা হলেও বিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ উভয় ধরনের গান মালশি গান নামে পরিচিতি পায়। এ সময় থেকে দুর্গাপূজার ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, বা বিজয়া উপলক্ষে রচিত গানকে বলা হতে থাকে যথাক্রমে ষষ্ঠী পূজার মালশি, সপ্তমী পূজার মালশি, অষ্টমী পূজার মালশি, নবমী পূজার মালশি, বা বিজয়ার মালশি। এক সময়ে দুর্গা বা ভবানীবিষয়ক এই গানগুলো প্রধানত আগমনী ও বিজয়া—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিলো।

কালী বা দুর্গাতে নিবেদিত হলেও এই গানগুলোর মূল বক্তব্য বৈচিত্র্যপূর্ণ। আঠারো-উনিশ শতকে এই শ্রেণির গানে আদ্যাশক্তির প্রতি গায়কের নানা ধরনের প্রার্থনা ও আকুতি, অভিযোগ ও অভিমান, মহিমা ও গুণকীর্তন স্থান পেতো। কিন্তু বিশ শতক নাগাদ গানগুলোর কথাবস্তুতে বহুমাত্রিক পরিবর্তন ঘটে। কখনো কখনো দুর্গা বা কালীর একটু-আধটু উল্লেখ থাকলেও দেখা যায় সমকালীন রাজনীতি, আর্থসামাজিক অবস্থা, দৈব-দুর্বিপাক, ঘটনা-দুর্ঘটনা, জনপ্রিয় ব্যক্তির কীর্তি বা অপকীর্তি প্রভৃতি বিষয় গানগুলোর কথাবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

কবিয়ালগণ তাঁদের অভিন্ন মালশি গান একাধিক আসরে পরিবেশনের সুযোগ পান বলে এবং অনেক মালশি গান বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণে মালশি গানগুলোর অলিখিত কিছু শিরোনাম সৃষ্টি হয়ে যায়। এ পর্যন্ত কবিগানের যতোগুলো সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, অভিন্ন কারণে শিরোনামসহ সেগুলো মুদ্রিত হতে দেখা যায়। যেমন—সমাজচিত্রের মালশি, বার্ধক্যের মালশি, দুর্ভিক্ষের মালশি, যুদ্ধের মালশি, ভাওয়াল কুমারের মালশি, ইংরেজি শিক্ষার মালশি, কলির মালশি, বিপ্লবের মালশি, সাম্যবাদের মালশি, রকেটের মালশি, আগমনীর মালশি, বিজয়ার মালশি, প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের মালশি, দেহতত্ত্বের মালশি, অনুকষ্টের মালশি, বঙ্গমাতার মালশি ইত্যাদি।

দুর্গাপূজা বিষয়ক মালশি গানগুলোতে প্রায়ই মানবিক একটি প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে, তা হলো: বৎসরান্তে কন্যার পিতৃগৃহে আগমন এবং পিতৃগৃহ থেকে কন্যার প্রস্থানের আনন্দ ও বেদনা।

[৬ বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বগুড়া অঞ্চলে এক ধরনের মালশি গান চালু ছিলো। তবে সেই গানের গঠনের সঙ্গে কবিগানের মালশি গানের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।]

 

 

মালশি গান [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার
লেখক :
স্বরোচিষ সরকার [ Shorochish Sarkar]
বিশিষ্ট আভিধানিক ও বৈয়াকরণ
অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
লেখক : কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি

 

এই বিষয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেলগুলো দেখুন :

এ বিষয়ে অন্যান্য লিংক:

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

17 Comments to “মালশি গান [ Malshi Gaan of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] কবিগানের আর এক ধরনের সূচনা সঙ্গীত”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।