ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ | সঙ্গীতে মুসলিম যুগ | সংক্ষিপ্ত | A series of brief histories and developments in Indian music

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ | A series of brief histories and developments in Indian music: ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ বা পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ধারাবাহিক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ নিয়ে বিস্তার গবেষণা করেছেন ওস্তাদ মুনশি রইসউদ্দিন। তার লিখিত লেখা সমূহে ইতিহাসের সাথে তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি মন্তব্যও যোগ করেছেন। তবে সঙ্গীত বিষয়ক ইতিহাস জানার জন্য বা গবেষণা করার জন্য তার লেখাগুলো মূল্যবান ভূমিকা রাখবে। এজন্য শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কিছু নির্বাচিত আর্টিকেল তুলে দেয়া হলো।

Table of Contents

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ [সংক্ষিপ্ত] : সঙ্গীতে মুসলিম যুগ

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের নির্দিষ্ট কোন ইতিহাস নেই। প্রাচীন যুগ হ’তে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত ছাপার অক্ষরে লেখা গ্রন্থ ও পান্ডুলিপি গুলিতে পাক-ভারতীয় সঙ্গীত সম্বন্ধে বিভিন্ন মতবাদযুক্ত তত্ত্ব ও তথ্যাদির যা সন্ধান পাওয়া যায় তাই সঙ্গীতের ঐতিহাসিক তত্ত্ব বা ইতিহাস। যুগে যুগে বিভিন্ন পরিবর্তন ও প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রাকটিক্যাল ও থীওরিটিক্যাল সঙ্গীতের যে ধারা চলে আসছে, ইহাই পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ক্ৰমবিকাশ৷

পাক-তারতীয় সংস্কৃতি প্রাচীন কালের ভীষণ কঠোরতাকে অতিক্রম করে যেমনি বর্তমান উন্নতির পথে এগিয়ে এসেছে, সঙ্গীত-কলাও তেমনি ধীরে ধীরে যুগ-যুগান্তরের ধারাকে অনুসরণ করে সংস্কৃত ও অসংস্কৃত দুটি ধারার মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে রাগ, অলঙ্কার, মুর্ছনা, তান, মীড়, গমক ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে বিকাশ লাভ করেছে। এক কথায় বলতে গেলে প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন যুগে হিন্দু, মুসলিম ও ইংরেজি আমলেই জনরুচি হিসেবে পাক-ভারতীয় সঙ্গীত বিচিত্ররূপে প্রকাশ পেয়েছে।

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের বিকাশমূলক ঐতিহাসিক দিকটা এখনও অজ্ঞাত বলা যায়। সঙ্গীত বিষয়ে এ কথা স্বীকার করা যায় যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত বিশুদ্ধ ধরনের কোন প্রকার স্বরলিপি ছিল না। এজন্য বিভিন্ন যুগীয় সঙ্গীতের বিকাশমূলক বিভিন্ন রূপের তত্ত্ব ও তথ্য সঠিকভাবে নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তবে, বিক্ষিপ্ত ভাবে যে সকল তথ্য ও তত্ত্বাদি ছড়িয়ে আছে, তা থেকে যতটুকু সংগ্রহ করতে পেরেছি, সংক্ষেপে তাই তুলে ধরছি শিক্ষার্থীদের অবশ্য জ্ঞাতব্য বিষয় হিসেবে।

পাক-ভারতীয় বিশেষ করে পাকিস্তানের সংস্কৃতির ধারা প্রধানতঃ মুসলিম এবং এ-ধারা (সঙ্গীত) সাধারণভাবে মুসলিম-সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত। সাংস্কৃতিক আলোচনার গভীরে যেতে চাইনে। কেননা, আমাদের আলোচ্য বিষয়টি হচ্ছে ‘মুসলিম অবদানসহ পাক্-তারতীয় সঙ্গীতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ক্ৰমবিকাশ’।

সঙ্গীতে মুসলিম যুগ : মুসলিমদের বয়ে আনা সঙ্গীত এবং ভারতের স্থানীয় সঙ্গীতের যুগলবন্দীই ভারতের আজকের সঙ্গীত : Music ensemble of benares 1983 hp5 009, Author -Nomo michael hoefner, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 3.0 Unported license.
সঙ্গীতে মুসলিম যুগ : মুসলিমদের বয়ে আনা সঙ্গীত এবং ভারতের স্থানীয় সঙ্গীতের যুগলবন্দীই ভারতের আজকের সঙ্গীত

বর্তমান পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের আদি উৎস বা গোড়া হলো আরব দেশ। মুসলমান খলিফাদের আমলে বিকাশপ্রাপ্ত সঙ্গীত চর্চ্চার বহু লিখিত প্রমাণ রয়েছে এবং তার ধারাবাহিক বিকাশ ও গঠন প্রণালী সম্বন্ধেও আমরা তাদের লিখিত গ্রন্থ ও পুঁথি-পুস্তক থেকে অনেক কিছু জানতে পারি। মোট কথা মুসলমানদের গায়কী (Style of Demonstration) এবং বাদ্য-যন্ত্রাদি বিশেষ করে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের (৮ম শতাব্দী) সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে আসে। বর্তমানে সঙ্গীত বা সঙ্গীত-ধারা যা, আরব সভ্যতার প্রভাবেই সমৃদ্ধ।

‘পাক ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম অবদান’ সম্পর্কে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী এতো বেশী, যা লিখতে গেলে অন্ততঃ হাজার পৃষ্ঠার একখানা বিশাল ভলিউম বানানো যায়। নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্য পুস্তক ছোট করার জন্যে ঐতিহাসিক বিভাগও সংক্ষেপ করতে হচ্ছে। পাক-ভারতীয় সঙ্গীত একটিমাত্র রূপ বা শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ নয়। বিচিত্র এর রূপ ও বিকাশ। গাঁথা, গীত, প্রবন্ধ, চৌখণ্ডী, ভজন, কীৰ্ত্তন, যুগলবন্দ, ধ্রুপদ, খেয়াল রাগমালা, গুল নকশ, কাওয়ালী, (কালবানা), তারানা (তেলেনা), চতুরঙ্গ, ত্রিবট, টপ্পা, ঠুমরী, গজল, শোহেলা, কাজরী, জিগর, চৈতি,” ইত্যাদি শ্রেণীকে নিয়ে পাক-ভারতীয় সঙ্গীত সমৃদ্ধ।

বর্তমান যুগে কবি, তরজা, ঝুমুর, যাত্রাগান, রামায়ণগান, পাঁচালী, মনসা মঙ্গল বা মনসা ভাসান, রামপ্রসাদী, বাউল, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, ধুয়া, জারি, সারী, মারফতী, মুরশিদী, মরশীয়া, বারাশীয়া এবং বিভিন্ন শ্রেনীর কীর্ত্তন, ভজন, পালাগান, জাতীয় সঙ্গীত, গণ-সঙ্গীত, ব্রাহ্মসঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সংগীত, জাগরণী, মাচিং-গান, রাগ প্রধান বাংলা গান, আধুনিক বাংলা গান প্রভৃতির অবদান পাক-ভারতীয় সঙ্গীতকে আরও উন্নত ও মহিমাময় করেছে।

চলমানতাই জাতি ও সমাজের প্রাণ। যে জাতি ও সমাজে নতুন সৃষ্টির প্রেরণা জাগরণ নেই, সে জাতি ও সমাজ পংশু। সে জাতি ও সমাজের বিকাশের পথ অবরুদ্ধ।

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসের কাল নির্ণয়:

পাক-ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসকে তিনটি বিশেষ কালে ফেলা যায়। যথা:
(১) প্রাচীন কাল [ Ancient Period]
(২) মধ্য কাল [ Middle Period ]
(৩) আধুনিক কাল [ Modern Period ]

(১) প্রাচীন কাল অর্থে হিন্দু শাসন কাল : দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ধরা হয়।
(২) মধ্য-কাল অর্থে মুসলিম শাসন কাল (১২০০-১৮০০ )
(৩) আধুনিক কাল অর্থে ইংরেজ শাসন ও স্বাধীন পাক-ভারত কাল, মোটামুটি ১৮০০ খৃষ্টাব্দ হ’তে বর্তমান সময় পর্যন্ত।

এই যুগকেই পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহাসিক যুগ বলা হয়। মুসলিম বাদশাহদের ভারতে আগমন সময় থেকে এই যুগের আরম্ভ বলা হয়।

এই সঙ্গীত—পদ্ধতির গোড়া হচ্ছে আরব দেশ। মুসলমান খলিফাদের আমলে বিকাশপ্রাপ্ত সঙ্গীত চর্চ্চার অনেক লিখিত প্রমাণ আছে এবং সেগুলোর ধারাবাহিক বিকাশ সম্বন্ধেও আমরা তাঁদের লিখিত পুঁথি হ’তে অনেক কিছু জানতে পারি। যা হোক মুসলমানদের গায়কী ও বাদ্যযন্ত্র আরবদের সিন্ধু বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে আসে। কিন্তু আরব সভ্যতার প্রভাব ভারতের সাংস্কৃতিক জীবনে খুব বেশী ছিলো না।

হিন্দু সঙ্গীতের ভিত্তি বোধ হয় বৈদিক যুগেই আরস্ত হয় এবং মুণিঋষিগণ বেদের স্তোত্রগুলি সুর দিয়ে গাইতেন। তখন সঙ্গীতের ব্যবহার ধর্মক্ষেত্রেই বেশী ছিল এবং সঙ্গীতকে ধর্মের বাহন হিসেবে মানা হত। হিন্দু শাসনকালে পাক-ভারতে সঙ্গীতের খুব চর্চ্চা ছিল এবং সেই যুগে সঙ্গীত-শাস্ত্র সম্বন্ধীয় কিছু গ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়। হিন্দু রাজা ও সম্রাটগণ প্রায়ই সঙ্গীত ও সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিতের পৃষ্ঠাপোষকতা করতেন। তাঁদের দরবারে অনেক সঙ্গীতজ্ঞ আদর ও সম্মান পেতেন। দিগ্বিজেতা সমুদ্রগুপ্তকে তাঁর আমলের স্বর্ণমুদ্রায় হাতে বীণাসহ দেখা যায়, তাই একটা দাবির সাথে বলা চলে যে, তিনি বীণা বাজাতে পারদর্শী ছিলেন।

খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা লক্ষণ সেনের সময় কবি জয়দেব কর্তৃক পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের একটি বিশেষ অঙ্গ “কীর্তন” পদাবলীর সৃষ্টি হয়। তিনি সংস্কৃত ভাষায় “গীতগোবিন্দ” নামে পদাবলী রচনা করেন। ঐ পদাবলী অনুসরণ করে পরবর্তীকালে বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, শ্রীচৈতন্য প্রমুখ গুণীবৃন্দও কীর্তন পদাবলী রচনা করেন। জয়দেবকেই কীর্তন অঙ্গের আদি স্রষ্টা ও প্রবর্তক বলা হয়।

প্রাচীনকালের হিন্দুরা সঙ্গীতকে একটা ধর্মীয় অঙ্গ বলে মানতেন এবং সঙ্গীত ধর্মের বাহনস্বরূপ একটি সূক্ষ্ম কল হিসেবে অনুশীলন করতেন। মুসলমানরা এটার চর্চ্চা করতেন পার্থিব কলা হিসেবে যার উদ্দেশ্য ছিলো মনোরঞ্জন এবং জীবনকে সুষ্ঠু ও সবল করা। মুসলমানদের গায়কী ও বাদ্যযন্ত্র আরবদের সিন্ধু বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে আসে। পরবর্তীকালের গজনীবংশের সুলতানরা পাঞ্জাবে বসতি স্থাপন করেন। তাঁরা নিজেদেরকে ভারতীয় করে নিয়েছিলেন। এইভাবে মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বহু প্রকার বাদ্যযন্ত্রও এদেশে আসে; সেগুলো আজও পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত রয়েছে।

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ [ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দী ] Muslim Era in Indian Music [Thirteenth and Fourteenth Centuries]

ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দী ] Muslim Era in Indian Music [Thirteenth and Fourteenth Centuries] সম্পর্কে জানতে উপরের লিংকটিতে ক্লিক করুন। বিষয়টি বড় হওয়ায় আলাদা আর্টিকেল করতে হলো।

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ [ষোড়শ শতাব্দী] Muslim Era in Indian Music [Sixteenth Centuries]

ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ষোড়শ শতাব্দী] Muslim Era in Indian Music [Sixteenth Centuries]  : ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ এর ইতিহাসে ষোড়শ শতাব্দী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্রাট বাবরের মাধ্যমে এই যুগের সূচনা হয়। বাবরের প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গীত ও সঙ্গীতের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে যায়।

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস : বাবর (১৫২৬-১৫৩০ খ্রীঃ) :

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ষোড়শ শতাব্দী] - ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন
জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর
বাবরের প্রকৃত নাম জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ। ব্যাঘ্রের মত শক্তিশালী ছিলেন বলেই তিনি বাবর (বাবর অর্থ ব্যাঘ্র) নামেই পরিচিত ছিলেন। বাবর নানা সদৃগুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর প্রতিভা ছিল সর্বমুখী। তিনি ছিলেন একাধারে রণকুশল সেনাপতি, সাহিত্যিক ও কলাবিদ। সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পে তাঁর অসাধারণ অধিকার ছিল। তিনি পারসী ও তুর্কী ভাষায় সুন্দর গীত, কবিতা রচনা করে গেছেন। (পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস (Stanly Lane Poole)।

তিনি একজন বিশেষ কথাবিদ (Critic) ছিলেন। তিনি সঙ্গীতবিদগণের দোষ-গুণ বিচার করতেন ও সমালোচনা করতেন। তুর্কী ভাষায় লেখা তাঁর আত্মচরিত্রে বহু মুসলিম সঙ্গীতবিদের নাম উল্লেখ করলেও তন্মধ্যে কোন ভারতীয় অথবা তুরান দেশীয় সঙ্গীত বা সঙ্গীতশিল্পী বলে কিছুই উল্লেখ করেন নি। তৎকালে সমরকন্দের সুলতান হোসেন মির্জার দরবারে যখন সঙ্গীতের চর্চ্চা হ’ত বাবর তাতে যোগ দিতেন ও সঙ্গীতবিদগণের ক্রিয়ানৈপুণ্যের সমালোচনা করতেন। এ কথাটি পেয়েছি ডক্টর হালিম সাহেবের সমালোচনায়।

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ : সুর-বংশ (১৪৪০-১৫৫৫ খ্রী:) :

সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতায় মোগল বাদশাহদের চেয়ে সুরগণও পশ্চাদপদ ছিলেন না। আল বাদায়ূনী বলেছেন যে, তাঁরা সাঙ্গীতিক আমোদ-প্রমোদে ধৈর্য্য ও সংযম হারিয়ে উন্মাত্ত হয়ে পড়তেন। শাহনেওয়াজ খান বিরচিত “মিরাত-ই-আফতাব-নুম।” গ্রন্থও এ সবের সাক্ষ্য দেয়। সুর রাজার মধ্যে শের শাহের পুত্র ও রাজ্যাধিকারী ইসলাম শাহ্ই সঙ্গীতের বেশী পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁর দরবার-সঙ্গীতবিদগণের মধ্যে মুবারিজ খাঁ, বাবা রামদাস, নায়ক ধোন্ধে ও মহাপাত্র নরহরি প্রমুখ গুণীর নাম উল্লেখযোগ্য।

সেকান্দর সুর অত্যন্ত সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন। তিনি মেবারের রাজা রামচাঁদ ভট্টর (বাঘেলা) দরবার-গায়ক তানসেনকে বহু উপঢৌকন পাঠিয়ে তাঁর দরবারে আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আদিল শাহ সুর (২য়) হিন্দী ভাষায় একখানি সঙ্গীত গ্রন্থ লিখেছিলেন। শোনা যায়, আদিল শাহ একবার একটি ছোট্ট ছেলের গানে মুগ্ধ হয়ে তাকে ইনাম স্বরূপ ১০ হাজারী মসনব প্রদান করেছিলেন।

ঐ সময় বিভিন্ন শাসনকর্তাও সঙ্গীতে যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তন্মধ্যে মালোয়ার শেষ রাজা রাজবাহাদুর। তাঁর রাজ্যেও সঙ্গীতের বিশেষ প্রচলন ছিল। তিনি নিজেও সঙ্গীত বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত গায়কীকে “বাজখানী” ঢং বা স্টাইল বলা হয়। রাজবাহাদুরের স্ত্রীর নাম রূপমতী। রূপমতী নিজেই একজন সঙ্গীতনিপুণা ছিলেন ও বহুগান রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত গান-পদ্ধতি উচ্চাঙ্গের না হলেও সাধারণ জন-সমাজে তা খুব প্রাণস্পর্শী ছিল। অদ্যাবধি তাঁর রচিত গান “রূপমতীর গান নামে পরিচিত। মালোয়ার দেশে সাধারণ স্ত্রীলোকেরা শস্যাদি ঝাড়বার সময় রূপমতীর গান গেয়ে থাকে।

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ষোড়শ শতাব্দী] - ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন - ভারতীয় সঙ্গীতে বিভিন্ন যুগের বাদ্যযন্ত্র : Indian Classical Music Instruments, Gallery15 national museum india, Author -Nomu420, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 3.0 Unported license.
ভারতীয় সঙ্গীতে বিভিন্ন যুগের বাদ্যযন্ত্র
গুজরাটের শাসনকর্তা বাহাদুর শাহ (১৫২৬-১৫৩৭)। তিনি নিজে সঙ্গীতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি নায়ক বৈলুর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। গোয়ালিয়রের রাজা মানসিংহের মৃত্যুর পর যখন ইব্রাহিম লোদী (১৫১৭) গোয়ালিয়র জয় করেন, তখন মানসিংহের দরবারের বিখ্যাত গায়ক বসুকে নিজের দরবারে নিয়ে আসেন। শোনা যায়, নায়ক বসুর আওয়াজ এমনি এক বিশেষ ধরনের ছিল যে, তিনি যখন গান করতেন তখন তাঁর আওয়াজ শুনে মনে হত যেন দু’টি গায়কের কণ্ঠ একত্রে ধ্বনিত হচ্ছে। নায়ক বসু যখন আহম্মদাবাদে ছিলেন, তখন তিনি তিনটি নতুন রাগ “বাহাদুরী–টোড়ি, নায়কী কানাড়া ও নায়কী-কল্যাণ’ সৃষ্টি ও প্রচলন করেন। বর্তমান প্রচলিত রাগগুলির মধ্যে নায়কী কানাড়া রাগের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

প্রকাশ “Miral+-Sikndan” গ্রন্থে পাওয়া যায়, বাহাদুর শাহের দরবারে নায়ক বৈজু নামে একজন গায়ক ছিলেন। বাহাদুর শাহের দরবারে নায়ক বৈজুর শিষ্য নায়ক গোপাল নামক অন্য একজন বিশিষ্ট গুণী ছিলেন। বাহাদুর শাহের বংশের শেষ সুলতান মহম্মদ শাহ ৩য় (১৫৩৭) সময়ে আহম্মদাবাদে সঙ্গীতের বিশেষ প্রসার ঘটে। এমন কি হাটে-বাজারেও সদাসর্বদা গান শোনা যেত। এই নায়ক গোপাল তখন প্রসিদ্ধ “নায়কা খেতাবে ভূষিত হন।

[ প্রকাশ, সুলতান ইব্রাহিম লোদী গোয়ালিয়র জয় করার পর নায়ক বসু গুজরাটের বাহাদুর শাহের দরবারে চলে যান।]

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস : হুমায়ূন (১৫৩০-৪০ খ্রীঃ পুনরায় ১৫৫৫-৫৬ খ্রীঃ):

হুমায়ূন সঙ্গীত ভালবাসতেন। তিনি সঙ্গীতজ্ঞদের সঙ্গে হামেশা মিশতে পছন্দ করতেন। ১৫৩৫ খৃষ্টাব্দে গুজরাটের শাসনকর্তা বাহাদুর শাহকে পরাজিত করে মানডু অধিকার করেন। তিনি বন্দীদের সকলকেই কতল (বধ) করতে আদেশ দেন। বন্দীদের মধ্যে “বৈজু” নামে একজন গায়ক আছে জেনে তাকে ডেকে পাঠান এবং তার গান শুনেন। তার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকে মুক্তি দেন এবং নিজের দরবারের গায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। তাঁর দরবারে নায়ক বৈলুর শিষ্য নায়ক গোপাল (গোপাল নায়ক নয়। সঙ্গীতে সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর দরবারে অন্যতম গায়ক ছিলেন ‘বাচ্চু’ নামে একলোক। হুমায়ূনের পরই আকবরের যুগ। এই সময় হতেই সঙ্গীতের প্রকৃত ঐতিহাসিক স্বর্ণযুগ ধরা হয়।

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – বাদশাহ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ) : পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ এর মধ্যে স্বর্ণযুগ :

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ এর মধ্যে স্বর্ণযুগ বলা হয় বাদশাহ আকবরের সময়কে। বাদশাহ আকবরের সময়েই পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের বিশেষ উন্নতি সাধিত হয়। আকবর বাদশাহ-ই শুধু ছিলেন না, সঙ্গীতবিদ হিসেবেও তাঁর খ্যাতি কম নয়। তিনিও ১৫টি রাগ রচনা করেন। নিসাবর রাগটি তন্মধ্যে অন্যতম। তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে বহু সঙ্গীতগুণী এনে তাঁর দরবার অলঙ্কৃত করেছিলেন। তাঁর দরবারে হিন্দু, ইরাণী, তুরাণী, কাশ্মীরী প্রমুখ বহু নারী পুরুষ সঙ্গীত শিল্পীর সমাবেশ ছিলো। এই সকল গুণীগণকে তিনি সাতটি দলে বা গ্রুপে বিভক্ত করেন।

সপ্তাহের প্রতিটি দিনই একেকটি দলের জন্যে নির্ধারিত ছিলো। বাদশাহের দরবারের সঙ্গীতবিদদের পরিচয় দিতে গিয়ে আবুল ফজল তাঁর লেখা ‘আইন-ই-আকবরী’ নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে যে শ্রেষ্ঠ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করেছেন, নিম্নে তার একটি তালিকা দেয়া হলোঃ

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ষোড়শ ও সপ্তদশ] - ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন
মিয়া তানসেন (গেয়ালিওর)
1. Miyan Tansen of Gwaliar. A singer like him has not been in India for the last thousand years. Baba Ramdas of Gwaliar, a singer.
2. Baba Ramdas of Gwaliar, a singer.
3. Subhan khan, of Gwaliar, a singer.
4. Srigyan Khan, of Gwaliar, a singer.
5. Miyan Chand, of Gwaliar, a singer.
6. Sarod Khan, of Gwaliar, a singer.
7. Miyan Lal, of Gwaliar, a singer.
8. Nayak Jarju, of Gwaliar, a singer.
9. Chand Khan, of Gwaliar, a singer.
10. Shihab Khan, of Gwaliar, a singer. Pefororms on the Bin.

11. Tantaranga Khan, son of Miyan Tansen, singer.
12. Bichitra Khan, Brother of Subhan Khan, a Singer.
13. Mahammad Khan Dhari, singer.
14. Daud Dhari. singer.
15. Birmandal Khan of Gwallar, plays on the Surmandal. 16. Baz Bahadur (Bayazid), son of Shujaat Khan Sur (Shajawal Khan of Shajawalpur. Malwah) Ruler of malwah; a singer without rival.

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ষোড়শ ও সপ্তদশ] - ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন
গোলকোন্ডা সালতানাত : রাবাব বাদক
17. Mulla Is-Haq Dhari, Singer.
18. Rangsen of Agr. Singer. 19. Surdas, son of Baba Ramdas, a singer.
20. Rahamutulla, Brother of Mulla Is-haq. a singer. 21. Usta Dast of Mashhad, plays on the Flute (Nal).

22. Purbin Khan, his son plays on the Bin.
23. Shaikh Dawan Dhari, performs on the Karana. 24. Mir Sayyid All of Mashhad, plays on the Ghichak.
25. Usta Yusuf of Harat, plays on the Tamburah.
26. Qasim, Surnamed Koh-bar. He has invented one instrument, intermediate. between the Qubuz and the Rubab.
27. Tash Beg of Quipchuq, plays of qubuz.
28. Sultan Hafiz Husani of Mashhad, Chants.
29. Bahram Qull of Harat, plays on the Chichak.
30. Sultan Hashim of Mashhad, plays on the Tamburah..

31. Usta Shah Mahammad. Plays on the ‘Summa’
32. Usta Mahammad Amin, Plays on the Tamburah,
33. Hafiz Khwajah All of Mashhad. Chants.
34. Mir Abdullah, Brother of Mr Abdul Hal, plays on the Qanun.
35. Pirzadah, Nephew of mir Dawan of Khurasan, Sings and Chants.
36. Usta Mahammad Hussain plays on the Tamburah..

উল্লেখ্য যে বাদশাহ আকবরের নবরত্ন সভার শ্রেষ্ঠ শুনী ছিলেন তানসেন।

* Noted from the English Translation of Ain-1-Akbari by H. Blochman, Page-612-13.

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ [সপ্তদশ শতাব্দী] Muslim Era in Indian Music [Seventeenth Centuries] :

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ষোড়শ ও সপ্তদশ] - ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন, Mughal Shah Jahan, Source - Wikipedia, The work is in public domain now.
মুঘল সম্রাট শাহজাহান

জাহাঙ্গীর (১৬০৫-২৭খ্রীঃ):

পিতার ধারা সম্পূর্ণ বজায় রেখেছিলেন জাহাঙ্গীর। তাঁর সময়ে, ইকবাল নাম-ই-জাহাঙ্গীর নামে একখানা বৃহৎ গ্রন্থ রচিত হয়। এই গ্রন্থেই পাওয়া যায় তার দরবারের সঙ্গীত ও সঙ্গীতবিদদের পরিচিতি। তাঁর দরবারে বিশেষ গুণীদের মধ্যে মিয়া তানসেন, মিয়াঁ লাল, হাফিজ নাদ আলী (এঁরা আকবরের সভাগায়ক), তানসেন পুত্র বিলাস খাঁ, ছতর খাঁ, জাহাঙ্গীরদার, পারভেজ দাদ, মাধু, হজম ও আর্মেনীয় খৃষ্টান ধ্রুপদী জুলকারনাইন। বাদশাহ আকবর ও তৎপুত্র জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালকে ধ্রুপদের ‘সুবর্ণ-যুগ’ বলাহয়।

শাহজাহান (১৬২৮-৫৮ খ্ৰী:):

শাহজাহানও সঙ্গীতে বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তৎকালের ফকীরুল্লাহ্ সইফ খান লিখিত ‘রাগ দর্পণ’ নামক গ্রন্থে শাহজাহানের দরবার গায়ক-বাদকদের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি এই গ্রন্থে ৩০ জন বিশেষ গুণীর নাম উল্লেখ করে বলেছেন যে, এদের মধ্যে ৬ জনের বেশী গায়ক-বাদক ছিলেন পারস্য দেশের। তৎকালীন সঙ্গীত সম্পূর্ণ বিদেশী প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বয়ংম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছিল।

মানসিংহের সময়ের প্রচলিত ধ্রুপদ ও সুলতান হোসেন শাহ্ সকী প্রবর্তিত খেয়াল পদ্ধতি’ এই সময়েই বিশেষ জনপ্রিয় হয়। দরবারে গুণীদের মধ্যে বারনওয়া নিবাসী শেখ বাহাউদ্দীন (৫০) নামক জনৈক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘অমৃতবীণ’ বাদক ছিলেন। তিনি ‘খিয়াল’ নামে একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন।

ঔরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭খ্রীঃ):

ঔরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণ করার পর ১০ বছর পর্যন্ত সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সময় বিরাট সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এ সময় রাজকীয় ব্যান্ড পার্টি মিছিলের পুরোভাগে থেকে খিজরাবাদ হ’তে সিংহাসন পর্যন্ত আসে এবং সম্রাটের সিংহাসনরোহণের সময় নৃত্যশিল্পীরা নাচ করতে থাকে।

ঔরঙ্গজেবের দরবারে বহু সঙ্গীতবিদ ছিলেন। তার প্রশান্তি সূচক কতিপয় ধ্রুপদ গান-ই এর সত্যতা বহণ করে আছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে সকল উদ্ধৃতি দেয়া গেল না।

ইমাম শাফীর কাছে মুরিদ হওয়ার পর থেকে তিনি অত্যন্ত সংযমী ও বিরাগী হয়ে ওঠেন এবং সঙ্গীত – ছাড়াও অন্যান্য আমোদ-প্রমোদ একেবারেই পরিত্যাগ করেন। তাই তার ন্যায় মহান বাদশাহের বিরুদ্ধে অনেক অপবাদ রচনা করেছেন পরবর্তীকালের হিন্দু ও ইংরেজ লেখকেরা।

 

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ [অষ্টাদশ শতাব্দী] Muslim Era in Indian Music [Eighteenth]

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ : শাহ আলম বাহাদুর শাহ (১৭০৭–১২ খ্রীঃ):

ঔরঙ্গজেবের পুত্র শাহ আলম বাহাদুর শাহ্ খুবই সঙ্গীতানুরাগী ও ভক্ত ছিলেন। তাঁর দরবার-সঙ্গীতবিদদের মধ্যে নিয়ামত খাঁ ছিলেন শ্রেষ্ঠ গায়ক ও রচয়িতা। তিনি নিয়াজী কাওয়াল ও লালা বাঙালী গুণীদ্বয়ের সাহায্যে অসংখ্য গান রচনা করেছিলেন। জাহান্দর শাহ্ (১৭১২-১৩খ্রী:) ও ফররুখ শিয়র (১৭১৩–১৯ খ্রীঃ)- এই দু’জন বাদশাহের আমলের সঙ্গীত সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে নিয়ামত খাঁ জাহান্দর শাহের দরবারের গায়ক ছিলেন বলে শোনা যায়।

খেয়াল সঙ্গীতের পূর্ণ বিকশিত যুগ :

সঙ্গীতের পূর্নাঙ্গ বিকাশ এই শতাব্দীর সঙ্গীতাঙ্গনে ঘটো যাওয়া সবচেয়ে বড় ঘটনা। যদিও সেই সময়ের বিকশিত খেয়াল একেবারে সেই রূপেই এখন আর প্রচলিত নেই। কালের আবর্তে বদলে গিয়ে অনেক নতুন হয়েছে। গায়নরীতি বদলেছে। বদলে গেছে খেয়ালের পরিবেশন পদ্ধতি। তবে মনে রাখা জরুরী যে তখনকার সেই খেয়ালের বিবর্তনেই আজকের খেয়াল। আর খেয়াল মূলত আজও নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে মুল ধারার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে। তাই এই ঘটনাটি সঙ্গীতের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে খেয়াল সঙ্গীতের পূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়, পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [অষ্টাদশ শতাব্দী] – ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন, An Indian classical music performance, Karen Blaha from Charlottesville, VA, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 2.0 Generic license.
অষ্টাদশ শতাব্দীতে খেয়াল সঙ্গীতের পূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ : বাদশাহ মুহম্মদ শাহ (১৭১৯-৪৮খ্রীঃ):

বাহাদুর শাহের অন্যতম পৌত্র শেষ মোগল বাদশাহ মহম্মদ শাহের আমলেই বিশেষ করে খেয়াল সঙ্গীত বিকাশ লাভ করে। তানসেনের দৌহিত্র বংশের লাল খাঁর পুত্র নিয়ামত খাঁর সৃষ্টি ও শিক্ষাদানে এই উপমহাদেশে ‘খেয়াল’ সর্বোচ্চ প্রসার লাভ করে। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন বীণকার ও ধ্রুপদী। কোনো বিশেষ কারণে কিছু দিনের জন্যে বাদশাহের দরবার ত্যাগ করে অতি গোপনে দুটি ভিক্ষুক বালক নিয়ে খেয়াল পদ্ধতি (গান ও গায়কী) শিক্ষা দেন।

পরে বালকদ্বয়ের গান শুনে বাদশাহ নিয়ামত খাঁকে পুনরায় দরবারে সর্বোচ্চ সম্মানের আসন দেন করেন। নিয়ামত খাঁর অপূর্ব গুণ ও কৃতিত্বে সম্রাট মহম্মদ শাহ্ তাঁকে ‘সদারঙ্গ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সম্রাট মহম্মদ শাহের দরবারে থেকে তিনি অসংখ্য ধ্রুপ, খেয়াল, তারানা, হোরী, সাদরা ইত্যাদি গান রচনা ও সুর সংযোজন করেন এবং তালিম দেন।

সম্রাট নিজেও সঙ্গীতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনিও বহু গান রচনা করেন। বর্তমান উত্তর পাক ভারতীয় সঙ্গীতে খেয়াল গানগুলোর মধ্যে প্রায় অর্ধেক গানই হয় সদারঙ্গ বা মহম্মদ শাহের রচনা। তাঁদের রচিত খেয়াল-অঙ্গের গানগুলোকেই ট্রাডিশনাল খেয়াল বলা হয়। সে-সব গানে ভাষা বা কথার চাইতে সুরের প্রাধান্যই ছিলো বেশি। যে-সব গানের কথায় ‘সদারঙ্গ’ অথবা ‘মহম্মদ শা পিয়া সদারঙ্গিলে থাকবে যে সব গানই ঔদের মধ্যে যে কোনও একজনের রচনা বলে জানতে হবে।

নিয়ামত (সদারঙ্গ) খাঁর দুই পুত্র ফিরুজ বা ফিরোজ খাঁ ও ভূপৎ খাঁ। অনুগত প্রতিভা ও শিক্ষার গুণে এঁরাও উচ্চ সম্মান লাভ করেন। পিতার ন্যায় তারাও বহু গান রচনা করেন। ফিরোজ খাঁর রচনাশক্তি ছিলো আরও প্রখর। কলা-নৈপূণ্যের স্বীকৃতি স্বরূপ মহম্মদ শাহ ফিরোজ খাঁকে ‘অদারঙ্গ’ এবং ভূপৎ খাঁকে ‘মহারঙ্গ’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

মহম্মদ শাহের দরবারে ‘শেখ মৈনুন্দিন’ নামে অন্যতম এক খেয়াল গায়ক ছিলেন। তখনকার দিনে আকর্ষনীয় ও রংদার খেয়ালী হিসেবে তিনি ছাড়া অন্য কারও নাম শোনা যায় না। মহম্মদ শাহের সময়েই খেয়ালের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়।

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ [বিংশ শতাব্দী], Muslim Era in Indian Music [Twentieth Century]

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগের বিংশ শতাব্দীর [ Muslim Era in Indian Music [Twentieth Century]] অংশ পড়তে উপরের লিংকটিতে ক্লিক করুন।

 

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ [ঊনবিংশ শতাব্দী] Muslim Era in Indian Music [Nineteenth century]

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ [ঊনবিংশ শতাব্দী] Muslim Era in Indian Music [Nineteenth century]: সদারঙ্গ [ Sadarang ] , অদারঙ্গ [ Adarang ] গুণীদের পরেই যারা যুগস্রষ্টা, তারা হলেন- গোয়ালিয়রের ‘হন্দ্দু খাঁ [ Haddu Khan ] ও হস্যু খাঁ’ [ Hassu Khan ] ভ্রাতৃদ্বয়। খেয়াল [ Kheyal ] গানে বিভিন্ন প্রকার ছন্দ ও অলঙ্কারিক তানের সৃষ্টিও এঁরাই করেন। বর্তমান তান প্রধান খেয়াল-রীতির স্রষ্টা হিসেবে এঁদেরকেও যুগ প্রবর্ত্তক বলা হয়।

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ঊনবিংশ শতাব্দী] – ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন, বিষ্ণুপুর প্রাসাদের প্রবেশ পথ, এই প্রাসাদকে কেন্দ্র করেই জন্ম হয় বিষ্ণুপুর ঘরানার, Entrance to the remains of the Palace of Bishnupur Kings 1, Author-Rq88187, This file is licensed under the Creative Commons Attribution-Share Alike 3.0 Unported license.
বিষ্ণুপুর প্রাসাদের প্রবেশ পথ, এই প্রাসাদকে কেন্দ্র করেই জন্ম হয় বিষ্ণুপুর ঘরানার
দিল্লীর কেন্দ্রীয় শাসনের অবনতির সাথে সাথে সঙ্গীতের জগতের এক বিরাট ধরনের পরিবর্তনের গল্প সূচিত হয়। সেসময়ের যুগসেরা সকল গায়ক-বাদক তথা সঙ্গীতের গুণীজন দিল্লীর কেন্দ্রীয় শাসনের পৃষ্ঠপোষকতার উপরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল ছিল। দিল্লীর কেন্দ্রীয় শাসনের অবনতির সাথে সাথে সেসব গুণীজনের জীবন যাত্রা অনিশ্চিত হতে থাকে। তাই তারা অন্য কোন উপায় বের করার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন।

এরপর সেসব গুণীজন বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসকদের দরবারে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। অনেক প্রাদেশিক সরকার তাদের যথাযথ সম্মানের সাথে আশ্রয় দেন। তাই বলা যায়, সঙ্গীতও ঐ সময় লক্ষ্মৌ [ Lucknow State ] , রামপুর [ Rampur State ] , পুণা [ Pune State ] , ইন্দোর [ Indore State ], গোয়ালিয়র [ Gwalior State ] , আলওয়ার [ Alwar State ], বরোদা [ Baroda State ], জয়পুর [ Jaipur State ] প্রভৃতি দরবারে আশ্রয় নেয়। মোগল বাদশাহের পৃষ্ঠপোষকতায় ও দরবার-সঙ্গীতবিদদের মারফতেই উত্তর পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে।।

১৮৫৭ খৃষ্টাব্দ থেকে লক্ষ্মৌ ও রামপুর সঙ্গীতে যুগপৎ প্রধান্য বিস্তার করতে থাকে। লক্ষ্মৌর নবাব ওয়াজেদ আলীর শাসন পরিচালনায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় সঙ্গীত দ্রুত উন্নতি লাভ করে।

লক্ষ্মৌ দরবারে থাকাকালে অযোধ্যার নবাব ‘আসাফুদ্দৌলা’ [ Nawab Asaf-Ud-Daula ]’র পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দে পাটনা নিবাসী বিখ্যাত পণ্ডিত ও সঙ্গীতবিদ রাজা খাঁন স্বয়ং নবাবের নামানুসারে ‘নগমাত-ই-আসিফী [ Naghmat-e-Asifi ]  নামে সঙ্গীতের একখানা যুগান্তকারী প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেন। প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের কাল্পনিক অদ্ভুত রীতি নীতির অবসান ঘটিয়ে সর্বপ্রথম তিনিই উত্তর-পাক ভারতীয় সঙ্গীতকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন।

তিনি বহু গবেষণার পর সাতটি স্বরের শুদ্ধতা নির্ণয় করেন এবং শুদ্ধ স্বর-সপ্তক অর্থাৎ বর্তমানের ‘বিলাবল’ ঠাট’– আবিষ্কার করেন। পরে ‘বিলাবল’ ঠাটটিকে মান করে বিকৃত স্বরযোগে আরও অবধারিত ৩১টি ঠাট গঠন প্রণালীর উল্লেখ করেন তাঁর গ্রন্থে।

পরবর্তীকালে সঙ্গীতবিদ রাজা খাঁন ৩২টি ঠাটের মধ্যে সাধারণ ব্যবহারে ১০টি ঠাট গ্রহণ করে সেগুলোর গঠন প্রণালী নিশ্চিত করেন। তখন বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডের [ Vishnu Narayan Bhatkhande ] বয়স ৪ বছর ছিল।। এই ১০টি ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করে রাগগুলোর শ্রেণী বিভাগ করা হয়। যে জন্যে বর্তমানে রাগ পরিচয়ে প্রথমেই বলা হয় রাগটি অমুক ঠাটের বা ঠাটোপন্ন রাগ ইত্যাদি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারঝে এই উপমহাদেশের সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতন ঘটে। ধ্রুপদ ও খেয়াল’ চর্চ্চা ও বোঝা সহজতর ছিলো না বলেই হালকা ও ইন্দ্রিয়োপভোগ্য বিভিন্ন ধরনের গান সৃষ্টি হয়। লক্ষ্মৌর দরবারেই প্রথমে টপ্পা ও পরে ঠুমরী এ ধরনের গানের প্রসিদ্ধি ঘটে।

লক্ষ্মৌর নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের (১৮৪০-৭০ খ্রীঃ) আমলেই টপ্পা ও টুম্রীর উদ্ভব হয়। নবাব নিজেও সঙ্গীতবিদ ছিলেন। ‘আলী ও আখতার পিয়া’ দুটি ছদ্ম নামে বহু কবিতা ও গান রচনা করেন।

টপ্পা- স্রষ্টা হিসেবে গোলাম নবী মতান্তরে শোরী মিয়াকে এবং ঠুমরীর স্রষ্টা হিসেবে ভাইয়া সাহেব গণপত্ রাও মতান্তরে মৈজুদ্দীন খাঁকে মানা হয়।

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস – মুসলিম যুগ  বিষয়ে [ About Muslim Era in Indian Music ]:

পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই সময়ে ভারতীয় সনাতন সান্ত্রীয় সঙ্গীত এর সাথে পারস্যের সঙ্গীত মিলিত হয়েছে। এই শুভ মিলনটি ইতিহাস সৃষ্টিকারী মিলন। দুপক্ষই দুদিকের সঙ্গীতকে গ্রহণ করেছে। মিলনে মিলে মিশে একাকার হয়েছে। ভাষা-গায়নরীতি-রাগ সব কিছুই মিলে একাত্ম হয়ে গেছে। সেই রীতির অসামান্য মিলনের প্রক্রিয়ার সন্তান হিসেবে এসেছে আজকের হিন্দুস্থানি বা উত্তর ভারতীয় সান্ত্রীয় সঙ্গীত।

এই হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিস্তৃত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে শুরু করে আফগানিস্তান পর্যন্ত। আজও নিয়মিত চর্চা হচ্ছে এবং উত্তর উত্তর উন্নতি সাধিত হচ্ছে। তাই পাক-ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন থাকছে। নিচের আর্টিকেল গুলো পড়তে পারেন।  এছাড়া আমাদের সাইটে নিয়মিত চোখ রাখুন, আশা করি আরও বিস্তারিত খুব দ্রুতই পাবেন।

সূত্র : প্রবেশিকা সংগীত শিক্ষা পদ্ধতি – ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন

আরও পড়তে পারেন:

“ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ | সঙ্গীতে মুসলিম যুগ | সংক্ষিপ্ত | A series of brief histories and developments in Indian music”-এ 16-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন