টপ্পা বা টপ্পা গান – সঙ্গীত শৈলী [ Tappa, Music Genre ]

টপ্পা বা টপ্পা গান – সঙ্গীত শৈলী [ Tappa, Music Genre ] : শৃঙ্গার রসপ্রধান ও চঞ্চল প্রকৃতির একধরনের বিশেষ সংগীতশৈলীকে বলা হয়ে থাকে ‘টপ্পা’ গান। টপ্পা শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে ‘লম্ফ’ এবং অপর একটি অর্থ ‘সংক্ষেপ’। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো একসময় এই গানের উদ্ভব বলে বেশিরভাগ সংগীতগুণীজন মত প্রকাশ করে থাকেন। সে সময় মধ্য এশিয়া থেকে একদল যাযাবর গোষ্ঠী পাঞ্জাবে এসে বসবাস শুরু করে।

এই সম্প্রদায়ের একজন উটচালক শোরি মিয়া যাবাবর সংগীতধারার সঙ্গে উত্তর ভারতীয় সংগীতের মিশ্রণে টপ্পাশৈলীর গান প্রবর্তন করেন বলে অনেক সংগীতগুণীজনের ধারণা।

এই ঘটনাকে কেউ কেউ বর্ণনা করেন একটু ভিন্নভাবে। তাঁদের বর্ণনানুযায়ী, অনেককাল পূর্বে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আরব বণিকদের যাতায়াত করতে হতো ইরান ও আফগানিস্তান হয়ে ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে। ব্যবসায়িক দ্রব্যসামগ্রী উটের পিঠে চাপিয়ে রাত্রিবেলা তারা পথ চলত দলবদ্ধভাবে। তখন তারা পায়ে চলার ছন্দের সঙ্গে মিল রেখে হু-হু করে একধরনের কম্পনযুক্ত সাংগীতিক সুর তোর করত।

সেই সুর কালে কালে পাঞ্জাবের উটচালকদের কাছে একটি আঞ্চলিক সংগীতধারায় পরিণত হয়। পাঞ্জাবে প্রচলিত এই লোকসংগীত ‘ডপা’ নামে পরিচয় লাভ করে, যা হিন্দিতে ‘টপ্পা’ গানে রূপান্তরিত হয়েছে।

আবার ভিন্নমতানুসারী সংগীতগুণীজনেরা বলেন, লক্ষ্ণৌর নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্ (রাজত্বকাল : ১৮৪৭-৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন শিল্প-সংস্কৃতির একজন উদার পৃষ্ঠপোষক এবং তৎকালীন অন্যতম সংগীতজ্ঞ ও গীত রচয়িতা। তাঁর উদ্ভাবিত ‘ধুমরি’ গানের সমকালীন আরেকটি সংগীতধারা হচ্ছে ‘টপ্পা’ গান।

ঋদ্ধ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ নিয়ামত খাঁ ওরফে সদারঙ্গ কাওয়াল বংশের দুই ভাই জানে রসুল ও গোলাম রসুলকে যথাযথ তালিম দিয়ে অভূতপূর্ব কুশলী শিল্পী হিসেবে তৈরি করেছিলেন। পাঞ্জাবের অধিবাসী সংগীতজ্ঞ গোলাম রসুল পরবর্তীকালে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার সভাগায়কের পদ অলংকৃত করেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র ও শিষ্য গোলাম নবী ওরফে শৌরি মিয়া পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকসংগীতের বিশেষ আকর্ষণীয় উপাদানগুলো গ্রহণ করে তাতে নিজস্ব সাধনার প্রতিফলন ঘটিয়ে সৃষ্টি করেন ‘টপ্পা’ গান।

লক্ষ্ণৌর নবাব আসাফউদ্দৌলার রাজদরবারে সভাসংগীতজ্ঞ থাকাকালীন তিনি এই শৈলীর গান প্রবর্তন, প্রচার ও জনপ্রিয় করে তোলেন। আবার কারো কারো মতে, শৌরি মিয়া পাঞ্জাবের উটচালকদের মুখে মুখে প্রচলিত আঞ্চলিক গান ডপাকে সুমার্জিতভাবে রূপায়িত করে সর্বসাধারণের কাছে ‘টপ্পা’ নামে উপহার দেন।

অন্য মতানুসারী সংগীতগুণীজনেরা মনে করেন, প্রাচীন ‘বেসরা’ সংগীতরীতি থেকে ‘টপ্পা’ গানের সৃষ্টি হয়েছে। সে সময় এই গানের ভাষায় আদিরসের প্রাধান্যের কারণে অনেক গুণীজন ও খ্যাতিমান শিল্পী টপ্পা গানকে নিচুস্তরের সংগীত সারিতে স্থান দিতেন। ফলে তাঁদের সংগীত পরিমণ্ডলে টপ্পা গান স্বাভাবিকভাবেই পরিত্যাগ করা হতো।

তারপরও সংক্ষিপ্ত অবয়ব এবং হালকা রসাত্মক হলেও এই গান কিন্তু মোটেও সহজসাধ্য নয়। বিশেষ ধরনের গিটকিরি যুক্ত করে প্রেমভিত্তিক ভাষায় ও বিশেষ কয়েকটি তালে এই গান গাওয়া হয়। ‘জমজমা’ নামের এক প্রকার বিশেষ দানাদার তান টপ্পা গানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই শৈলীর গানে দুটি বিভাগ স্থায়ী এবং অন্তরাতে বাণী নিতান্তই অল্প হওয়ায় এর আকৃতি সাধারণত ক্ষুদ্রই হয়ে থাকে।

খেয়াল বা প্রচলিত গান অপেক্ষা সম্পূর্ণ নিজস্ব আঙ্গিকে অল্প কয়েকটি স্বরের অবলম্বনে ছোট ছোট কুট বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তানযোগে টপ্পাশৈলীর গান কাফি, খাম্বাজ, পিলু, ভৈরব, ঝিঝিট ইত্যাদি রাগে সুরারোপিত হতে দেখা যায়। তবলা-বাঁয়া বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে মধ্যমান, দীপচন্দী, ত্রিতাল ইত্যাদিতে টপ্পা গান নিবদ্ধ করা হলেও ১৬ মাত্রা বিশিষ্ট টপ্পা তাল’ এই শৈলীর গানে যথোপযুক্ত।

বর্তমানে ‘টপ্পা’ গানের প্রচলন অনেক কমে গেলেও বাংলা ভাষাতে অজস্র টপ্পা গান রচিত হয়েছে। বাংলাভূমিতে টপ্পা গানের প্রচলন, প্রচার ও প্রসারে সংগীতজ্ঞ রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধু বাবু (১৭৪১-১৮৩৯) হয়ে আছেন চিরস্মরণীয় সংগীতপুরুষ। তার রচিত এই শৈলীর বাংলা গানগুলো নিধুবাবুর টপ্পা নামে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাতে টপ্পা গান রচনা, প্রচার ও প্রসারে আরেক বিদগ্ধ সংগীতসাধক রামপ্রসাদ সেন ওরফে সাধক রামপ্রসাদ নামটিও স্বমহিমায় হয়ে আছে। চিরউজ্জ্বল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানে টপ্পাশৈলীর প্রয়োগ করে এই গানের প্রতি নিজ পছন্দের বিষয়টি প্রকাশ করে গেছেন। প্রাচীন বাংলা গানগুলোতেও টপ্পা গানের শৈলী বহুল ব্যবহারের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। টপ্পা গানের রূপায়ণকর্তা গোলাম নবী ওরফে শৌরি মিয়া রচিত জনপ্রিয়

একটি টপ্পা বা টপ্পা গান [ Tappa ] উদাহরণস্বরূপ প্রদান করা হলো :

বেদরদি যার বে প্যারা
ব্যো নহি আঁদা জাদা শুন ভলা ॥

যার য়ারা দাকি করিয়ে
শোরি মুখড়া তাঁড়া অজব তেরেদা বসন চলা ॥

[রাগ : সিন্ধু, বাদীস্বর : ঋষভ (র), সমবাদী স্বর পঞ্চম (প), জাতি: খাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহীতে গান্ধারবর্জিত), বিকৃত স্বর গান্ধার (জ্ঞ) ও নিশাত (ণ) কোমল, গায়ন সময় রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর। রচয়িতা শৌরি মিয়া (গোলাম নবী), তাল: মধ্যমান (১৬ মাত্রা)।]

টপ্পা গান সম্পর্কে আরও পড়তে পারেন :

“টপ্পা বা টপ্পা গান – সঙ্গীত শৈলী [ Tappa, Music Genre ]”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন