জাগ গান – ‘জাগ গান’ বা ‘রঙ্গপুরের জাগের গান’ [ Jaag Gaan, Music Genre ]

জাগ গান কি? - ‘জাগ গান' বা 'রঙ্গপুরের জাগের গান'

জাগ গান কি?

জাগ গান কি? এই বিষয়টি সহজ কথায় বলতে গেলে – বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলে প্রচলিত একশ্রেণির পল্লীগানের নাম হচ্ছে ‘জাগ গান’ বা ‘রঙ্গপুরের জাগের গান’। সংগীত-গবেষকদের মতে, রাত্রি জেগে এই গান গাওয়া হয় বলে এর নামকরণ হয়েছে জাগ গান। সংগীতের মাধ্যমে লৌকিক আখ্যায়িকা পরিবেশন করাই জাগ গানের উদ্দেশ্য।

উত্তরবঙ্গে প্রচলিত জাগ গান সম্পর্কে কোনো কোনো সংগীতগুণীজন বলেন, এই অঞ্চলের একজন আধ্যাত্মিক মুসলমান দরবেশ সোনা পীর কিংবা মানিক পীরের গুণকীর্তন বর্ণিত হয় রংপুরের জাগের গানে।

উত্তরাঞ্চলের কৃষকসমাজ পৌষ মাসের প্রচণ্ড শীতে দলবেঁধে রাত জেগে আসর বসায় জাগ গানের। সিদ্ধপুরুষ এই সাধু বাবার মাহাত্ম্য-সংবলিত জাগ গান অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও বর্তমানে তা হারিয়ে যেতে বসেছে।

জিন্দা চার যুগে সার

মরিয়া জিলাতে পার      অপার মহিমা তোমার ॥

আবার ভিন্নমতানুসারী সংগীত-গবেষক ও গুণীজনেরা বলেন, রংপুর অঞ্চলের সাধারণ শ্রেণির মধ্যে প্রচলিত এবং অসম্ভব জনপ্রিয় যুগীর গান, ভাওয়াইয়া ও রঙ্গপুরের জাগের গান বা জাগ গান। এর মধ্যে উত্তর জনপদে প্রচলিত জাগ গান রংপুর অঞ্চলে সাধারণত রাত্রিবেলা পালাগানের মতো করে পরিবেশিত হয়ে থাকে।

নিদ্রা বা অচৈতন্য অবস্থা থেকে মানুষের মনে চৈতন্য বা জাগরণ আনতে গাওয়া হয় বলেই একে বলা হয় জাগ গান। প্রাচীনকাল থেকেই রংপুরের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের জাগ গান প্রচলিত বলে জানা যায়।

অধ্যাত্মবাদী সাধক সোনা পীর কিংবা মানিক পীরের পালা ব্যতীত কালী দেবী, বারাসে ঠাকুর, মনসা দেবী, রাধা-কৃষ্ণ, শীতলা দেবী, হরি ঠাকুর ইত্যাদি পালাও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

সনাতন ধর্ম অনুযায়ী চৈত্র মাসের শুল্কা ত্রয়োদশী তিথিতে কামদেবের পূজা করার ব্যবস্থা শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। শাস্ত্র মতে,

‘পুষ্পিত অশোকবৃক্ষের মূলে কামদেবের পূজা করিতে

ও তাহাকে চামর বা ব্যজন দ্বারা ব্যজন করিতে হয়।’

রংপুরে রাজবংশী জাতিভুক্ত ভদ্রলোকেরা নিজ গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে কোনো প্রান্তরে গিয়ে কামদেবের পূজা করেন। তারা দুই-তিনটি বংশখণ্ড প্রোথিত করেন এবং দুটি বা তিনটি দীর্ঘ বস্ত্রজড়িত বংশখণ্ডের অগ্রভাগে চামর দিয়ে সেই প্রোথিত বংশখণ্ডে আবদ্ধ করেন। এভাবেই কামদেবের পূজা করা হয় এবং সেই পূজা উপলক্ষে জাগ গান গাওয়া হয়ে থাকে।

রামায়ণ, কবি কঙ্কণ, পদ্মপুরাণ গানে যেমন মূল গায়ক চামর গ্রহণ করে গান করেন এবং দোয়ারেরা মন্দিরা বাজিয়ে ধুয়া ধরেন, জাগ গানেও মূল গায়ক ও উপগায়কবৃন্দ তেমনিই করে থাকেন। এই গায়কদের মধ্যে একজন উপস্থিত কবি থাকেন, যাকে বলে মতিহারী বা ডাকালিকোবা।

মতিহারীর এক হাতে একটি কাঠের হাতুড়ি এবং অন্য হাতে একটি স্থূল কাঠখণ্ড বা ডাকালি থাকে। গান গাওয়ার সময় মাঝে মাঝে মতিহারী এগিয়ে গিয়ে হাতের ডাকালিতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এবং সেই মুহূর্তে প্রস্তুত দুটি চরণের একটি কবিতা বলে।

কোনো কোনো দলে মূল গায়ক কিংবা মতিহারীর সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জন্য মেয়েমানুষের বেশধারী কয়েকজন পুরুষ শিল্পী থাকেন, যারা মতিহারীর সঙ্গে উপস্থিত কবি লড়াইয়ে অংশ নেন। এই গান দ্বারা কামদেবের পূজার পর কামকে জাগ্রত করা হয় বলে এর নাম জাগ গান বা জাগের গান হয়েছে বলে অনেকে ধারণা করেন।

জাগ গানকে ‘মোটা জাগ’ এবং ‘কানাই ধামালি’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। ‘মোটা জাগ’ গানের ভাষা বা চরণ অত্যন্ত অশ্লীল হওয়ায় বাড়ি থেকে দূরে প্রান্তরে এর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অপরদিকে ‘কানাই ধামালি’ গান তুলনামূলক অনেক সহনীয় ও শ্লীল বলে ভদ্রলোকের বাড়িতে এর অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে দেখা যায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামবাসী ‘কানাই ধামালি জাগ গান’ উপভোগ করেন।

রংপুরের কৃতী সন্তান পূর্ণেন্দুমোহন সেহানবীশ রংপুর অঞ্চলের জাগ গান সম্পর্কে বলেছেন,

*জাগের গান একটা বিরাট ব্যাপার। এই গানের সমুদয় অংশ একত্রে সংগৃহীত হইলে একখানি সুবৃহৎগ্রন্থ হইতে পারে। জাগের গান শ্রীকৃষ্ণের আদি রসাত্মক লীলাকাহিনী লইয়া রচিত। সমুদয় গান দুই ভাগে বিভক্ত। কতকগুলি অত্যন্ত অশ্লীলতা-কলুষ-পঙ্কিল, ইহা সাধারণ্যে প্রকাশযোগ্য নহে, সাধারণত সেগুলি মোটা জাগ নামে অভিহিত হইয়া থাকে।

অপরগুলি কানাই ধামালি বা লীলা জাগ নামে কথিত হয়। এগুলিও সম্পূর্ণ অশ্লীলতা দোষ বর্জিত না হইলেও কিয়ৎ পরিমাণে সংযত ভাষায় রচিত। এই কানাই ধামালি বা লীলা জাগ আবার অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পালায় বিভক্ত। এক একটি পালায় শ্রীকৃষ্ণেরও বিশেষ বিশেষ লীলার বর্ণনা আছে। বলা বাহুল্য, তৎসমুদয়ই আমাদের নিরক্ষর গ্রাম্য কবির স্বকপোলকল্পিত, একটিও পুরাণাবলম্বনে রচিত নহে’।

আবার হেমন্ত কুমার রায় বর্মা তাঁর কোচবিহারের ইতিহাস (১৯৭৫) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,

‘ফাল্গুনী পূর্ণিমার সময় মদনকাম পূজা হয়। তিন দিন ধরিয়া এই পূজা চলে । অনেকের বাড়িতে এ উপলক্ষ্যে জাগগান হয়। গ্রামের জনসাধারণ তিন দিন ধরিয়া এই গান শুনিয়া আনন্দ করেন। এই পূজাকে সাধারণত বাঁশ পূজা বলা হয়। লম্বা বাঁশ পরিষ্কার করিয়া ওইগুলি লালসালু কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয় ও বাশগুলির মাথায় চামর লাগান হয়।

তিন দিন ধরিয়া পূজার পর বাঁশগুলি কোন নদীতে লওয়া হয় এবং চামরগুলি নদীর জল স্পর্শ করানো হয়। পরে ঐগুলি কোন জাগগানের আসরে লওয়া হয়। ঐ সময় সারারাত জাগিয়া গান শোনা হয়। সেইজন্য এই গানের নাম জাগগান। মদনকাম পূজা প্রাচীন আর্য-উৎসব বসন্তোৎসব এর স্মৃতি বহন করিতেছে’।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ রঙ্গপুর শাখা থেকে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১৫ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত পঞ্চানন সরকার (১৮৬৬-১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ) সম্পাদিত সাহিত্য-পরিষৎ পত্রিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায় পণ্ডিতরাজ যাদবেশ্বর তর্করত্ন সংগৃহীত ‘রঙ্গপুরের জাগের গান’ প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে পত্রিকা সম্পাদক বলেছেন,

‘জাগগান শুধু রঙ্গপুরের নহে। রঙ্গপুর, ধুবড়ি,

কুচবিহার, জলপাইগুড়ি প্রভৃতিতে শোনা যায়।

সময়ের পরিক্রমায় একশ বছর পরে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে এসে ‘রঙ্গপুরের জাগের গান’ গ্রন্থের সম্পাদক সমর পাল বলেন,

রঙ্গপুর, কোচবিহার, আসাম ছাড়াও উত্তরবঙ্গ,

পূর্ববঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গে এ গানের প্রচলন লক্ষণীয় ।

বিশেষ করে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর অঞ্চলে

এবং যশোরে জাগগানের প্রাবল্য ছিল এককালে।’

তবে জাগ গানের রচয়িতা হিসেবে রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী গ্রামের বিখ্যাত রাজবংশী গায়েন কবি রতিরাম দাসের নাম ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। রাজবংশীদের মধ্যে দাস পদবি চালু ছিল ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত দাস পদবিধারীগণ রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় আন্দোলনের সময় তাদের পদবি বদল করে রায়, বর্মণ, সরকার, সিংহ ইত্যাদি পদবি গ্রহণ করেন।

জাগ গানের সংগ্রাহক পণ্ডিতরাজ যাদবেশ্বর তর্করত্নের (১৮৫০-১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ) গবেষণা থেকে জানা যায়, স্বভাবকবি রতিরাম দাসকে তিনি ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দের সমসাময়িক বলে মনে করেন। তৎকালীন সময়ের অন্য অঞ্চলগুলোর গুণীজন কর্তৃক রচিত জাগ গান সেভাবে পাওয়া না গেলেও রাজবংশী গায়েন কবি রতিরাম দাসের রচনায় (আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে) বেশ কটি জাগ গানের সন্ধান মিলেছে।

তাঁর রচনায় এসেছে সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে (১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) মুঘল সৈন্যদের আক্রমণে ফতেপুর চাকলার ভাঙনের ফলে সৃষ্ট পাঁচটি জমিদারি ১. ঘড়িয়ালডাঙ্গা, ২. পাঙ্গা, ৩. ফতেপুর, ৪ বামনডাঙ্গা (ব্রাহ্মণডাঙ্গা) এবং ৫. মন্থনার (পীরগাছা) কথা।

আরো এসেছে ১৭৭২-৭৭ খ্রিষ্টাব্দের পাঁচসালা বন্দোবস্তের বিষয়, দেবী সিংহের অত্যাচার, ডিমলার রাজা হররাম সেন, প্ৰজাবিদ্রোহ (১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) ইত্যাদি বিষয়। রতিরামের জাগ গানের বিষয়বস্তুতে রাধা-কৃষ্ণ লীলার প্রাধান্যও কোনো অংশে কম ছিল না।

তবে তিনি কেবলমাত্র আদিরসের কবি ছিলেন না বরং ছিলেন বীর এবং রুদ্ররসেরও কবি। কৃষ্ণের বড়শিতে মাছ ধরা, কৃষ্ণের ধোরে মাছ ধরা, রাধার শাক তোলা, রাস, ইটাকুমারীর প্রজাবিদ্রোহ ইত্যাদি তাঁর রচিত জনপ্রিয় জাগ গান।

এই শৈলীর গান পরিবেশনের পূর্বে প্রথমে ভণিতা অংশ গেয়ে তারপর মূল গানে প্রবেশের রীতি প্রচলিত ছিল। রাজবংশী গায়েন কবি রতিরাম দাস মূল জাগ গান পরিবেশনের পূর্বে যে ভণিতাংশ গাইতেন তা হুবহু উল্লেখ করা হলো : –

উত্তরে দক্ষিণে লম্বা ঠাকুরপাড়া খানি।

সক্কলি পণ্ডিত তার সক্কলি বিদ্যামণি ॥

দেখিতে সুন্দর তারা আগুনের মত রং।

দেবতার মত মূর্তি তাদের মুনির মত ঢং ॥

ভোরে স্নান সন্ধ্যা তৰ্পণ স্তব পূজা জপ ।

সমস্ত দিন পড়াশুনা সমস্ত দিন তপ ॥

সক্কলের আছে চৌপাড়ি পড়ুয়া কত পড়ে।

পড়ুয়া চলিলে যেন গ্রামখানি নড়ে ॥

শ্রীপঞ্চমীর সমে পড়ুয়ারা মেলে।

হর হর ধ্বনি করে গ্রাম যেন টলে ॥

নবদ্বীপে সরস্বতী আগে এক প্রহর।

বসতি করেন ইহা জানে সর্ব্বত্তর ॥

ইটাকুমারীতে থাকে আসি পহর বেলা।

মাইয়া লোকের সঙ্গে হয় সরস্বতীর খেলা।।

সেই ঠাকুর বংশের পদে করিয়া প্রণাম।

মদনকামের জাগ গায় দাস রতিরাম।।

এভাবে ভণিতা অংশ সম্পন্ন হবার পর গায়ক তাঁর জাগ গানের দলকে য়ে মূল পালা অর্থাৎ ‘জাগ গান’ পরিবেশন শুরু করেন। রতিরাম দাস রচিত জাগ গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ‘কানাই ধামালি জাগ গান’ উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হলো –

রাস

আশিন গেইছে কাত্তিকের আজ গেল আধেক দিন।

রাত্তিরকোনা একটুক্ বাড়ছে পাওয়া না যায় চিন ॥

গাদলা নাই ঝড়ি নাই কাশিয়ার ফুল ফুটে।

নাচিয়া বেড়ায় খঞ্জনগুলা ইত্তিউত্তি ছুটে ॥

নদীর জল টলটল দেখা যায় বালা।

মাথার উপর আকাশখানি খালি সব নীলা ॥

রাস্তায় ঘাটায় কাদো নাই খালি পায়ে যাও।

আনিতে হৈবে না জল ধুবার নাগে না পাও ॥

শীত গীরিষ কিছুই নাই বড় মজার দিন।

মাছি নাই মশা নাই করে না পিনপিন।।

সাঞ্জের বেলা পুরুব দিগে ঝলক দিয়া চান্দ।

আকাশের গায় ওঠে অই কেমন তার ছান্দ ॥

গাছের উপর পড়ে জোনাক রূপার গাছ করি।

পাতের উপর জোনাকের খাটে না কারিকুরি

নদীর জল জোনাক পায়া করে ঝকঝক।

বালুর চর কাশিয়ার ফুল জ্বলে চকচক ॥

জোনাকেতে ভরিয়া গেল সমস্ত পিথিমি।

আকাশোতে তারাগুলা করে রিমিঝিমি ॥

সিঙ্গাহারের ফুলে ফুলে ঢাকিল সব বন।

সুবাস পায়া ঘরে থাকির কারো না হয় মন ॥

সব ঠাই ছড়ায় বাস ফুরফুরা বায়।

লাখে লাখে ভ্রমরা উড়ে যুতি ফুলের গায় |

এমন সময় নদীর কূলে বাঁশিত দিল শান।

গলে মালা চিকন কালা করে রাধা রাধা গান ||

বাঁশির সুরে ভাসিয়া গেল আকাশ পাতাল মাটি।

জাতি কুল ধরম করম ভাসিল সব মাটি ॥

রূপসী যতেক ছিল ব্রজের বউড়ি।

সকলে বাহির হইল নাই কেউ বৈরী ॥

সকলি মিলিল আসি নিকুঞ্জের বনে।

ডালি ভরি তুলি ফুল আনে জনে জনে ॥

ফুলের কঙ্কণ পরে ফুলের নেপুর।

ফুলের হার ফুলের তাড় সবে ভরপুর ॥

কানে দিল ফুলের কুণ্ডল মাথায় ফুলের সিঁতি ।

ফুলসাজে সাজিল যতেক ব্রজের যুবতী।

সবে বলে দেখাব আজি কেমন চিকন কালা।

চিনিয়া নেউক কাঁঞ তার রাধা সেই রূপসী বালা ॥

চিনতে যদি নাই পারে মারমো ঠোকনা গালে।

এই কি তোমার ভালোবাসা যাও গরুর পালে |

যার জন্য ছাড়ি বন্ধু খাওয়া শোওয়া বইসা।

তারে এখন চিন না যে কেমন ভালোবাসা |

সেদিন যেমন দিনদুপুরে করচে বসন চুরি।

আজ তার কান ধরিয়া দেখাম চাতুরি ॥

বান্ধম তার হাত দুখানি দিয়া নীল শাড়ি।

সবার আগে ধরাচূড়া বাঁশি নিম কাড়ি ৷।

হাসিয়া হাসিয়া তবে দিমো করতালি।

নারীর হাটে নারীর হাতে কী করবেন বনমালী ॥

মাইয়া মানুষ দেখলে তার জিভার পড়ে নাল

এতেক যুবতীর সনে ধরুক দেখি তাল ॥

নীল শাড়ি চুরি করি বসিছিল ঠ্যালে।

আজ তার পত্তিশোধ দিমো রাত্তির কালে ॥

নীল মেঘের মত হয় কালিয়ার রং।

নীল শাড়ি করমো তারে করমো বড় রং ॥

সবাই পরমো তাকে ছিঁড়াছিঁড়ি করি।

দেখিমো কেমন করেন একেলা মুরারি ॥

এই যে কাঁচুলিগুলা বড় হইছে কশা।

একবার দিলে আর না যায় তাক খসা ।।

এগুলা ছিড়িয়া ফেলাও দুষ্ক কর দূর।

দেখিমো কালিয়া ছোঁড়ার কত বুক পুর ॥

কানুর হাতের তলা নাল পীঠির ভিতি নীল।

সুন্দর কাঁচুলি হৈবে না হইবে ঢিল ॥

দুইখানি কানুর হাত এতেক রমণী।

দেখিমো দেখিমো কেমন করেন নীলমণি ॥

একেবারে তুলমো সবে রসের তুফান।

ঝগড়া নাই ঝাঁটি নাই সকলি সমান ॥

গাছের আওড়ালে থাকি সব শুনিল কানু।

হাসতে হাসতে আসিল কানাই বাজাইয়া বেণু ॥

কানাই কয় মিলিছেন যতেক যুবতী।

আমার কারণে তোমরা কী করলেন যুকতি ॥

কাড়িয়া নিমেন পীতধরা সাবাস সাবাস।

পীত বরণ তোমার উরাত হৈবে পীতবাস ||

কানাইর কথা শুনি হাসিয়া আটখান।

এ পড়ে উহার গায়ে ছুটে রসের বান ॥

যতেক গোপিনী আছিল তত হৈল কানু।

নাচিতে লাগিল সবে ডগমগ তনু ॥

পায়ের নেপুর বাজে হাতের কঙ্কণ।

মধুর বাঁশরি বাজায় মদনমোহন ॥

নাচিতে নাচিতে ওঠে গানের তরঙ্গ।

গভীর শব্দে বাজে রসের মৃদঙ্গ ॥

ভুবন ভরিয়া গেল এ রসের গানে।

ভাঙ্গিল শিবের ধ্যান উঠে দেবী সনে ॥

পঞ্চমুখে গান গায় ডম্বরু বাজায়।

নাচে শিব ঠ্যাস দিয়া ভবানীর গায় ॥

যত দেবী যত দেবা এ রাস হেরিয়া।

রথের উপরে সবে পড়ে মুরছিয়া ।

নাচিছে গোপিনীগণ নাচার নাই শেষ।

খুলিল মাথার খোপা আউলাইল কেশ ॥

ছরমে সবার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

আপন অঞ্চলে তাহা মুছাইছে শাম ॥

নাচিতে নাচিতে সবার ছিড়িয়া গেল ডুরি।

খসিল কাঁচুলি তাদের খইসে যেন শাড়ি ॥

সৌগ ঠাই কাল জল কোন ঠাই নাই।

সমুদ্দুর হইছে আজ আপনি কানাই ॥

আদি নাই অন্ত নাই নাই কূলকিনার।

এ সমুদ্রে ঝাঁপ দিলে উঠে শক্তি কার ॥

গণিতে না পারি কত আসিছে কামিনী।

সগৃগুলি হইছে নদী যতেক গোপিনী ॥

কামের বাতাসে সবার উঠিছে হিল্লোল।

রাসের তরঙ্গে সবার বাড়িছে কল্লোল ॥

সকল নারীর শিরা কানাইর সাধা।

আপনি হইছে গঙ্গা তায় গৌরী রাধা |

শত শত গোপিনী গাঙেরে সঙ্গে করি।

ভাসেয়া ভুবন ধায় গঙ্গা হরি হরি ।

ঝম্প দিয়া পড়ি মিশে সেই কালা জলে।

রতিরাম দাস রাস গায় কুতূহলে ॥

কানাই ধামালি পালা এত দূরে সারা।

বৈষ্ণবেতে গাও হরি শাক্তে গাও তারা |

 

জাগ গান কি? - ‘জাগ গান' বা 'রঙ্গপুরের জাগের গান'
জাগ গান কি? – ‘জাগ গান’ বা ‘রঙ্গপুরের জাগের গান’

আরও পড়ুন :

 

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

2 Comments to “জাগ গান – ‘জাগ গান’ বা ‘রঙ্গপুরের জাগের গান’ [ Jaag Gaan, Music Genre ]”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।