কবিগানের শিল্পী [ Artists of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

কবিগানের শিল্পী [ কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি ] স্বরোচিষ সরকার

কবিগানের শিল্পী [ Artists of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ] : কবিগানের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী বা কবিগানের শিল্পীদের মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়: কণ্ঠশিল্পী এবং যন্ত্রশিল্পী। কণ্ঠশিল্পীদের নাম দোহার এবং যন্ত্রশিল্পীদের মধ্যে রয়েছে ঢুলি, জুরিদার, কাসিবাদক, বংশীবাদক, সরোদবাদক, বেহালাবাদক, হারমোনিয়ামবাদক প্রভৃতি।

কবিগানের শিল্পীদের মধ্যে  মূল শিল্পীর নাম কবিয়াল বা সরকার। কবিয়াল বা সরকার একাধারে সঙ্গীতরচয়িতা, কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী— সকল কিছু। অনেক সময়ে এক শ্রেণির সংগীতরচয়িতা কবিয়ালদের সহযোগিতা করে থাকেন, তাঁদের নাম বাধনদার। কবিগানের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পীদের কর্মপরিধি সম্পর্কে একে একে আলোচনা করা যাক।

কবিগানের শিল্পী  [ Artists of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

কবিগানের শিল্পী : কবিয়াল বা সরকার [ Kabial / Sarkar – Artists of Kavigan]

উনিশ শতকে কবিগানের দলনেতা পরিচিত ছিলেন কবিয়াল, কবিওয়ালা বা কবিতাওয়ালা নামে। বিশ শতক নাগাদ কবিয়ালদের নাম হয় সরকার। এই কবিয়াল বা সরকার হলেন কবিগানের শিল্পীদের মধ্যে কবিগানের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি। দলের যাবতীয় ক্রিয়াকাণ্ডের তিনি নিয়ন্ত্রক। তিনিই হলেন কবিগানের কবি।

কবিয়াল গান রচনা করেন, তাতে সুরারোপ করেন, স্বকণ্ঠে এবং দোহারদের মাধ্যমে তা পরিবেশন করেন, সর্বোপরি তাৎক্ষণিকভাবে ছন্দ, মিল, সুর ও তাল সহযোগে ছড়া কেটে কোনো বিশেষ বিষয়ে প্রশ্নোত্তর ও বিতর্ক চালিয়ে যান।

কবিগানের শিল্পীদের দলে কবিগান সংক্রান্ত এইসব দায়িত্ব পালন করাকে বলা হয় সরকারি করা। অসাধারণ সৃজনশীলতা, প্রখর যুক্তিশীলতা, প্রচুর পঠন-পাঠন, সুললিত কণ্ঠ, সুরবোধ, তালবোধ এবং দলব্যবস্থাপনায় দক্ষতার সমন্বয় যার মধ্যে যতো বেশি ঘটে, সরকারি পেশায় তিনি ততো যশ লাভ করে থাকেন।

কবিগানের শিল্পীদের দলে কখনো কখনো কবিয়ালদের গুরুদায়িত্বের এক বা একাধিক অংশ ভিন্ন কোনো ব্যক্তিকে পালন করতে দেখা যায়। যেমন ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় ছাতুবাবু ও লাতুবাবুরা কবিগানের দল গঠন করেছিলেন। কবিয়াল মহেশ কানা ছিলেন তাঁদের দলের একজন চাকুরে কবিয়াল। অর্থাৎ কবিয়ালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বটি ছাতুবাবু ও লাতুবাবু পালন করতেন আর বাকি কাজগুলো মহেশ কানাকে করতে হতো।

কবিগানের শিল্পীদের পরিবেশনা
কবিগানের শিল্পীদের পরিবেশনা

একইভাবে উনিশ শতকের শেষ দিকে ভাওয়ালের রাজা কালীনারায়ণেরও একটি কবির দল ছিলো, তাতে অনেক নামকরা কবিগানের শিল্পীরা ছিলেন। রামকুমার সরকার ছিলেন তাঁর দলের কবিয়াল। বিশ শতকের প্রথমার্ধে ঝালোকাঠিতে অধরমণি, রাঙা যামিনী, মনোমোহিনী, কালা যামিনী প্রমুখ নারী উদ্যোক্তা কবিগানের দল গঠন করেছিলেন। এই নারী উদ্যোক্তাগণ তাঁদের নিজ নিজ দলে দোহারের কাজ করতেন। এই কালপর্বের অনেক খ্যাতিমান কবিয়াল তাঁদের দলে কবিয়াল বা সরকার হিসেবে কাজ করেছেন।

কবিগানের শিল্পীদের ক্ষেত্রে ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রায় সকল সম্প্রদায় থেকে কবিয়ালদের আবির্ভাব ঘটে। এমনকি উনিশ শতকে একজন পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত ব্যক্তিও (অ্যান্টনি) কবিয়ালের পেশায় বিশেষ নাম করেছিলেন। আঠারো উনিশ শতকের কবিয়ালদের কুলপদবি দেখেও বোঝা যায়, কতো বিচিত্র বংশপেশার লোক কবিগানকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

বিশ শতক নাগাদ কবিয়ালদের একটি সাধারণ পদবি তৈরি হয়ে যায়। কবিয়ালের প্রতিশব্দ হিসেবে যে সরকার’ অভিধাটি তখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কবিয়ালগণ সেই ‘সরকার’ অভিধাকে তাঁদের কুলপদবির পরিবর্তে ব্যবহার করতে থাকেন। এর ফলে অনেক সময়ে কবিয়ালদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের বংশপেশা সম্পর্কে অবগত হওয়া কঠিন হয়।

একই প্রক্রিয়ায় অনেক মুসলমান কবিয়ালও সরকার পদবি ধারণ করতে শুরু করেন। এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যায় ব্রাহ্মণ কুলজাত কবিয়ালদের ক্ষেত্রে। সকল কালপর্বে শুধু এঁদেরই পূর্বপুরুষের কুলপদবি বজায় রাখতে দেখা যায়।

সরকার অভিধার সূচনা কিভাবে হলো, সে সম্পর্কে যতীন সরকারের অনুমানটি বিবেচনাযোগ্য। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ বিশ্বাস অনুযায়ী লেখাপড়া জানা লোকই সরকার। এমনকি ‘মহাজনের গদিতে হিসাবের খাতা কিংবা জমি বিক্রির দলিল লেখে যারা, তারাও সরকার।’

তাই ‘নানা শাস্ত্রে পারঙ্গম, পুরাণ কাহিনি ও ধর্মের নানা কথা তাঁরা প্রাঞ্জলভাবে বুঝিয়ে দিতে পারেন, আসরে উঠে তাৎক্ষণিক পদ্য ও গান রচনা করেন, উপস্থিত বুদ্ধির সাহায্যে প্রতিপক্ষকে বাকযুদ্ধে ঘায়েল করতে পারেন—এসবই গ্রামের লোকদের কবিয়ালদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে বলে কৌলিক পদবী নির্বিশেষে সকল কবিয়ালই “সরকার” আখ্যায় ভূষিত । [ ২৮ ]

‘কবিয়াল’ অভিধা নিয়ে অনেক কবিয়ালের এবং কবিগান-অনুরাগীর আপত্তি জানা যায়। তাঁরা মনে করেন, এই অভিধা দিয়ে কবিগান-গায়কের কবিত্বকে খাটো করা হয়ে থাকে। ‘কবিয়াল’ শব্দকে তাঁরা মনে করেন ‘কবিওয়ালা’ শব্দের অপভ্রংশ, যা ফেরিওয়ালা, ভিস্তিওয়ালা ইত্যাদির সঙ্গে তুলনীয়। বিকল্প হিসেবে তাঁরা ‘কবিগায়ক’, ‘লোককবি’, ‘চারণকবি’, ‘কবিরসরকার’ বা ‘সরকার প্রভৃতি অভিধা প্রস্তাব করেন।

বিশ শতকের শেষার্ধে অনেক জারিগায়ক মাঝে-মধ্যে কবির সরকারদের বিপক্ষে কবিগান পরিবেশন করতেন, কিন্তু সেই গান পরিবেশন করার সময়ে তাঁদের কবিয়াল বা সরকার বলা হতো না। কবিগান গাইলেও তাঁরা বয়াতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যেমন—খোরশেদ আলী বয়াতি, আসমত আলী বয়াতি, মোসলেম বয়াতি বা সাইদুর রহমান বয়াতি।

সম্ভবত এঁদের কথা ভেবেই সেলিম আল দীন এক সময়ে বলেছিলেন। যে, যারা কবিগান করেন, তাঁরা বয়াতি নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত তিনি আজহার বয়াতি এবং মফেজ বয়াতির কবির লড়াইয়ের উল্লেখ করেন এবং ১৯৯২ সালে তিনি তাঁদের গান শুনেছেন বলে জানান। [ ৩০ ]

কবিগানের শিল্পী : বাঁধনদার [ Badhondar – Artists of Kavigan]

কবিগানের শিল্পীদের ক্ষেত্রে এবার আলাপ করা যাক বাঁধনদার নিয়ে। উনিশ শতকে এমনকি বিশ শতকের প্রথমার্ধে কোনো কোনো কবির দলে বাঁধনদার নামে এক শ্রেণির লোক থাকতেন। এঁরা কবিগানের কোনো কোনো অংশে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিবেশিতব্য গান রচনার দায়িত্ব পালন করতেন। কবিগানের সখীসংবাদ, কবি, টপ্পা প্রভৃতি শ্রেণির গানে পূর্বরচিত চাপান পরিবেশনের সুযোগ থাকলেও, ঐ গানের কাটান বা জবাব গানটি আসরে বসেই কবিয়ালদের রচনা করতে হতো।

বাঁধনদারগণ কবিয়ালদের পক্ষে এই গুরুদায়িত্বটি পালন করে থাকতেন। বাঁধনদারের কাজ দিয়ে শুরু করলেও অনেকে পরবর্তী কালে কবিয়াল বা সরকারে পরিণত হয়ে কবিগানের দল গঠন করেছেন, এমন নজির আছে। এর বিপরীত নজিরও রয়েছে। যেমন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির বাঁধনদার ছিলেন গোরক্ষনাথ। কোনো কারণে গোরক্ষনাথের সঙ্গে অ্যান্টনির মতবিরোধ সৃষ্টি হলে অ্যান্টনি নিজেই কবিগান রচনা করতে শুরু করেছিলেন।

কবিগানের শিল্পী  [ Artists of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

 

কবিগানের শিল্পী : দোহার [ Dohar – Artists of Kavigan ]

কবিগানের শিল্পীদের ক্ষেত্রে এবার আলাপ করা যাক দোহার নিয়ে। কবিগানের সঙ্গীত সহযোগী কণ্ঠশিল্পীগণ দোহার নামে পরিচিত। সখীসংবাদ, কবি, টপ্পা প্রভৃতি অংশে কমবেশি চার জন দোহার আসরের চার দিকে মুখ করে দাঁড়ানোর নিয়ম। পেছন থেকে সরকার এক এক জনের পেছনে কানের কাছে গিয়ে গানের কলি বলে দেন, দোহারগণের কাজ হলো নির্ধারিত সুর আরোপ করে সেই কলিগুলোকে পরিবেশন করা।

এছাড়া কবিয়াল বা সরকার যখন ধুয়া গান পরিবেশন করেন, দোহারগণ তখন স্থায়ীর বিশেষ কলি সমস্বরে গাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। বিশ শতকের সূচনায় কোনো একটি দলের দোহারদের মধ্যে যিনি প্রধান থাকতেন, তাঁকে ধরতা দোহার বলা হতো। তিনি অন্য দোহারদের সঙ্গে নিয়ে বন্দনামূলক গান, যেমন ডাক, মালশি প্রভৃতি পরিবেশন করতেন।

বিশ শতকের শেষ দিক নাগাদ কবিগানের সখীসংবাদ ও কবি অংশ হ্রাস পেতে থাকলে দোহারদের কাজ কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে।

কবিগানের বিভিন্ন অংশের গানগুলোর সুর সম্পর্কে দোহারগণকে খুব সচেতন থাকতে হয়। এছাড়া দোহার হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো ভালো কণ্ঠের অধিকারী হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে কবিয়ালের কণ্ঠ থেকে দোহারদের কণ্ঠ শ্রুতিমধুর হতো। বিশ শতকের প্রথম দিকে তেমন ক্ষেত্রে কবিয়াল যদি চাকুরে হতেন, তাহলে ঐ জাতীয় দোহারের থেকে তাঁর বেতন খুব একটা বেশি হতো না।

কলকাতা এবং পূর্ববঙ্গের পর্বের বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ ছাড়া কবিগানের প্রায় সকল দোহার পুরুষ। তবে নারী দোহারদের নাম যেমন জানা যায়, সেই তুলনায় পুরুষ দোহারদের নাম জানা যায় না। কবিয়ালদের প্রতিপত্তির আড়ালে কবিগানের এইসব গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠশিল্পীগণ বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যান।

তা সত্ত্বেও দু-চারজন দোহারের নাম কোনো না কোনো সূত্রে পাওয়া যায়। যেমন তারকচন্দ্র সরকার এবং তাঁর পিতা কাশীনাথ সরকারের দলে যারা দোহারি করতেন, তাঁদের মধ্যে সূর্যনারায়ণ শিকদার, কাঙ্গালীচরণ, কালীচরণ, ভোলানাথ, মধুসূদন সরকার, নবীনচন্দ্র বসু প্রমুখের নাম জানা যায়। [২]

হরিচরণ আচার্যের দলের প্রখ্যাত দোহার ছিলেন মনোমোহন আচার্য, সুবল, বিহারী, গোবিন্দ সাহা, রাধাচরণ, মদন প্রমুখ।৩৩ রাজেন্দ্রনাথ সরকারের বিখ্যাত দোহার ছিলেন শশধর মাস্টার, হরি, মনা, মনোহর, সুধন্য প্রমুখ। [৩৪] নিশিকান্ত সরকারের দোহারদের মধ্যে খ্যাতিমান ছিলেন ওস্তাদ সতীশ শীল, দিঘিরজানের সতীশ মণ্ডল, হরিপাগলার ক্ষীরোদ মজুমদার, হরিপাগলার মনোহর বৈরাগী, বাবলার মহেন্দ্র মিস্ত্রি, বাবলার নিতাই মিস্ত্রি, শাখারীকাঠির মনোহর ভূঁইমালী প্রমুখ।

নিশিকান্ত সরকার পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসী হলে তাঁর শিষ্য স্বরূপেন্দু সরকারের দলে এঁরা কাজ করেছেন। বিজয়কৃষ্ণ সরকারের দলের বিখ্যাত দোহার ছিলেন নগেন মাস্টার, সদানন্দ মল্লিক, রসিক সানদার, ধীরেন্দ্রনাথ রায় প্রমুখ।

বিশ শতকের শেষ দিকে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় খগেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, বুধই বৈরাগী, মনীন্দ্রনাথ, ব্রজেন্দ্রনাথ, শক্তি বিশ্বাস, সুশীল, অমল মণ্ডল, অনন্ত মাস্টার, নিরঞ্জন মাস্টার, হরিদাস মাস্টার, প্রদীপ, আশুতোষ বাছাড়, শঙ্কর বাগচী, শ্যামল মজুমদার, অশোক মণ্ডল প্রমুখ দোহার বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

২০১০ সালে মাদারীপুরের একটি আসরে ছোটো নিশি সরকারের দল এবং স্বপন সরকারের দলে দীপ্তিশ্বর সরকার এবং নরোত্তম বাড়ই নামে দুজন শিক্ষার্থী কবিয়ালকেও দোহারের কাজ করতে দেখা গেছে। [৩৭]

উনিশ শতকের কলকাতায় এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধের পূর্ববঙ্গে অনেক কবির দলে মহিলা দোহার থাকতেন। মহিলা দোহার থাকার উপরে যেহেতু অনেক দলের নাম-ডাক নির্ভর করতো, সেহেতু মহিলা দোহারদের পারিশ্রমিক পুরুষ দোহারদের তুলনায় বেশি হতো। অনেক সময়ে কবিয়াল বা সরকারের থেকেও এইসব মহিলা দোহার বেশি পেতেন। বিষয়টি হরিচরণ আচার্য তাঁর একটি ডাক গানে স্বীকারও করেছেন। লিখেছেন:

“দেখি সরকারদিগের মাইনা, ত্রিশ টাকাও হয় না।

মেয়ের মাইনা হলো ষাট টাকা পর্যন্ত।”

হরিচরণ আচার্য তাঁর এই গানে ঢাকা অঞ্চলের স্বর্ণমণি, পরশমণি, বিধুকামিনী, আদরমণি প্রমুখ দোহারের নামোল্লেখ করেন।

ঝালোকাঠি অঞ্চলের দোহার প্রিয়বালাও এক সময়ে তাঁর দলে দোহারি করেছেন। এঁদের মধ্যে আদরমণি ছিলেন তাঁর দলের প্রধান দোহার। এই অতিমূল্য মহিলা দোহারদের অনেকের নামের শেষে বৈষ্ণৱী পদবি দেখে মনে হয়, এঁরা সাধারণ পরিবারের সদস্য ছিলেন না। অনেকে বারবনিতার অবস্থান থেকে উঠে এসেছিলেন বলে জানা যায়।

এই মহিলা দোহারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন পূর্ববঙ্গ পর্বের ঝালোকাঠি কেন্দ্রের কয়েকজন দোহার। এই দোহারদের মধ্যে বড়ো মনোমোহিনী, অধরমণি, কালা যামিনী, রাঙা যামিনী, সত্যভামা, ক্ষীরোদা খেমটাওয়ালি, রাধি, মানদা, শরৎবালা, প্রিয়বালা, সরলা, তরঙ্গিণী, কুমুদিনী, ছোটো গিরিবালা, সুভাষিণী প্রমুখ কয়েকজন দোহারের নাম দীনেশচন্দ্র সিংহ তাঁর ‘পূর্ববঙ্গের কবিয়াল কবি-সঙ্গীত’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

এছাড়া অন্যান্য সূত্র থেকে গোলোকমণি, কামিনী, সুরধুনী বা বোঁচা, হরিদাসী, কালা সুখদা, লাভি, অনন্তবালা, সাহেবগঞ্জের ক্ষীরোদা, লক্ষ্মী বৈষ্ণবী, রাধালক্ষ্মী, দক্ষবালা, মনোহরা, গৌরী, হিরণবালা প্রভৃতি নামের দোহারদের নামও জানা যায়। এইসব দোহারের অনেকে বিশেষ বিশেষ সরকারের রক্ষিতা হয়ে যেতেন।

যেমন প্রিয়বালা বা ঢেরা বোঁচা ছিলেন রাজেন্দ্রনাথ সরকারের এবং সরলা বা শেখ সরলা ছিলেন নকুলেশ্বর সরকারের। ঝালোকাঠি পর্বে কবিগানের দলের অধিকারী যামিনীকান্ত নটের কন্যা হিরণবালাও সাতচল্লিশের দেশভাগের পরে নকুলেশ্বর সরকারের সঙ্গিনী হয়েছিলেন।

দোহার হয়েও এঁদের অনেকে কবিগানের দলের মালিক হয়েছিলেন, যেমন মনোমোহিনী, অধরমণি, কালা যামিনী, রাঙা যামিনী। অনেক সরকার নিয়মিত বেতনের চুক্তিতে এই মহিলা দোহারদের অধীনে কাজ করতেন।

cropped Music Gurukul Logo কবিগানের শিল্পী [ Artists of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]

 

কবিগানের শিল্পী : যন্ত্রশিল্পী [ Supporting Musicians – Artists of Kavigan ]

কবিগানের শিল্পীদের ক্ষেত্রে এবার আলাপ করা যাক যন্ত্রশিল্পীদের নিয়ে। কবিগানের শিল্পীদের ক্ষেত্রে  দলে দোহারদের পরেই যন্ত্রশিল্পীদের অবস্থান। তবে যন্ত্রসঙ্গতকারী কবিগানের শিল্পীদের মধ্যে ঢুলির অবস্থান সবার উপরে। ঢুলিরা প্রায় ক্ষেত্রে দোহারদের থেকে অধিক পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এমনকি অনেক সময়ে তা প্রধান দোহারের থেকেও বেশি।

কলকাতা পর্বের কবিগানে ঢুলিদের কৃতিত্বের বিষয়টি বিশেষ আলোচনার বিষয় হতো। যেমন কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর ‘হুতোম প্যাচার নকশা’-য় (১৮৬২) কবিগানের শিল্পীদের মধ্যে বিশেষকরে ঢুলিদের বোলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন:

“এদিকে বারোইয়ারিতলায় জমিদারী কবি আরম্ভ হলো, ভালকোর জগা ও নিমতের রামা ঢোলে ‘মহিয়স্তব’ ‘গঙ্গাবন্দনা’ ও ‘ভেটকিমাছের তিনখানা কাটা’ ‘অগ্রগরদ্বীপের গোপীনাথ’ ‘যাবি তো যা ছুটে ছুটে যা’ প্রভৃতি বোল বাজাতে লাগলো; কবিওয়ালারা বিষমের ঘরে (পঞ্চমের চারগুণ উঁচু) গান ধল্লেন।”৪১ উনিশ শতকে হুগলির চন্দননগরে (ফরাসডাঙায়) বিখ্যাত ঢুলি ছিলেন রাম বাইতি এবং তাঁর পুত্র মোহন বাইতি। এঁরা নিত্যানন্দ বৈরাগীর দলে ঢোল বাজাতেন।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে বরিশাল অঞ্চলে যজ্ঞেশ্বর ঢুলি, বনমালী ঢুলি, বৈকুণ্ঠ ঢুলি, রজনী ঢুলি, হরিচরণ নট্ট, বসন্ত নষ্ট, অশ্বিনী নট্ট প্রমুখ বিশেষ নাম করেছিলেন। এছাড়া বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রাজেন্দ্রনাথ সরকারের দলের অক্ষয় ঢুলি, রমেশ শীলের দলের বিনয়বাশী জলদাস, বিজয় সরকারের দলের পরান ঢুলি, স্বরূপেন্দু সরকারের দলের শাস্তিরঞ্জন বিশ্বাস প্রমুখ সমকালে কবিগানের শিল্পীদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

এছাড়া কবিগানের শিল্পীদের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য খ্যাতিমান ঢুলিদের মধ্যে খুলনার ডুমুরিয়ার মধু ঢুলি, যশোর জেলার অভয়নগরের লেন্টু ওরফে শিবু ঢুলি, গোপালগঞ্জ জেলার গান্ধিয়াসুরের সুষেণ রায়, খুলনার বাজুয়া-ধোপাদির অমূল্য ঢুলি, কমল ঢুলি, খুলনার ডুমুরিয়ার নিরঞ্জন ঢুলি প্রমুখ একুশ শতকের সূচনায়ও কবিগানের সঙ্গত করেন। কবিগানের ঢুলিদের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিনয়বাশী জলদাসের ঢোলবাদন কিংবদন্তীতুল্য হয়ে আছে।

উনিশ শতকের কবিগানে হারমোনিয়মের দেখা পাওয়া না গেলেও বিশ শতকের পূর্ববঙ্গের কবিগানে তা অনেকটা অপরিহার্য যন্ত্রে পরিণত হয়। কবিগানের শিল্পীদের মধ্যে এখন হারমনিয়াম বাদকরাও একটা জায়গা করে নিয়েছেন। কবিগানের তাল রক্ষার জন্য ঢোলের সঙ্গে আরো এক বা একাধিক যন্ত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকে, এর মধ্যে কাঁসি এবং জুরির নাম সর্বাগ্রস্মরণীয়।

দলের গুরুত্ব ও সঙ্গতি অনুযায়ী শুষীর ও তত জাতীয় আরো অনেক যন্ত্রের ব্যবহার হয়, যেগুলোর মধ্যে জুড়ি বা করতাল, খঞ্জনি, নূপুর, দোতারা, সরোদ, বেহালা, সানাই, আড়বাশি, খিলবাশি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অনেকে শখ করেও কবিগানের দলে বাঁশি বাজাতেন। এমনই একজন ব্যক্তি হলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান।

কবিয়াল বিজয়কৃষ্ণ সরকারের বেশ কয়েকটি আসরে তিনি বাঁশি বাজিয়ে আসর মাতিয়েছিলেন। একুশ শতকের সূচনায় পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো আসরে প্রচলিত যন্ত্রাদির অতিরিক্ত হিসেবে সিন্থেসাইজার, ক্যাসিও, ব্যাঞ্জো প্রভৃতি যন্ত্রের ব্যবহারও দেখা যায়।

কবিগানের শিল্পী বিষয়ক সূত্র সমূহ :

[  ২৭. এইসব টপ্পার অনেকগুলো দীনেশচন্দ্র সিংহ তাঁর ‘পূর্ববঙ্গের কবিগান সংগ্রহ ও পর্যালোচনা’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন, কয়েকটি এই গ্রন্থের পরিশিষ্টে মুদ্রিত হয়েছে, কয়েকটির উল্লেখ পাওয়া যায় সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ সম্পাদিত রমেশ শীল রচনাবলী (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩) গ্রন্থের ভূমিকা অংশে।
২৮ যতীন সরকার, বাংলাদেশের কবিগান, পৃ. ৩৪

২৯ কবিগান-অনুরাগী গোপাল বিশ্বাস তাঁর একটি রচনায় লেখেন: “যে গানের নাম কবিগান তার রচয়িতা এবং গায়কদের নাম কবিয়াল বা কবিওয়ালা’। বাবুকৃষ্টির লোকসংস্কৃতিবিদগণ প্রদত্ত এই অভিধা আমাদের কাছে বড় বেদনার।” গোপাল বিশ্বাস, “বঙ্গের কবিগান পর্যালোচনা: ধর্ম-দর্শন-আধ্যাত্মিকতা,” বাংলার কবিগান ও লোককবি বিজয় সরকার, কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর ও গোপাল বিশ্বাস সম্পা (কলকাতা: চতুর্থ দুনিয়া, ২০০২), সূত্র : পৃ. ১৯৬।
৩০ সেলিম আল দীন, “আলোচনা,” বাংলা একাডেমী বৈশাখী লোক উৎসব প্রবন্ধ ১৪০০, স্বরোচিষ সরকার সম্পা (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩), পৃ. ৮৫।

৩১ প্রফুল্লচন্দ্র পাল, প্রাচীন কবিওয়ালার গান, পৃ. পঁচাশি। বিষ্ণুপদ বাগচী, তারকচন্দ্র সরকার (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৮), পৃ. ২৮ । 02
৩২ দীনেশচন্দ্র সিংহ, কবিয়াল কবিগান, পৃ. ২৭০। গবেষকের পিতা স্বরূপেন্দু সরকারের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্য।
৩৫ স্বরোচিষ সরকার, “বাগেরহাটের লোককবি স্বরূপেন্দু সরকারের কবিয়াল জীবন ও তাঁর গান,” স্থানীয় ইতিহাস, জুন ২০০৯, পৃ. ১৬০

৩৬ মহসিন হোসাইন, বিজয় সরকার (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৮), পৃ. ২৩।
৩৭ ক্ষেত্রসমীক্ষা: কদমবাড়ি, মাদারীপুর, তারিখ- ২০ জানুয়ারি ২০০৮।
৩৮ দীনেশচন্দ্র সিংহ, কবিয়াল কবিগান, পৃ. ১
৩৯ দীনেশ চন্দ্র সিংহ, পূর্ববঙ্গের কবিয়াল কবি-সঙ্গীত, পৃ. ২০২।
৪০ যেমন, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, “ভূমিকা,” হারামণি, ৭ম খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৬৪), পৃ. চুয়াত্তর–আটাত্তর।
৪১ কালীপ্রসন্ন সিংহ, হুতোম পাচার নকশা (পুনর্মুদ্রণ; কলকাতা: মনোমোহন প্রকাশনী, ১৯৮৩), পৃ. ৩৯ ।

লেখক :
স্বরোচিষ সরকার [ Shorochish Sarkar]
বিশিষ্ট আভিধানিক ও বৈয়াকরণ
অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
লেখক : কবিগানের স্বরূপ ও প্রকৃতি

 

এই বিষয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেলগুলো দেখুন :

এ বিষয়ে অন্যান্য লিংক:

You May Also Like

About the Author: নটরাজ

14 Comments to “কবিগানের শিল্পী [ Artists of Kavigan, Kobi Gaan, Kobi Lorai or Kabigan ]”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।